৩৮ তম লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি, ইসরাইল -ফিলিস্তিন সংকট

পড়াশোনা মধ্যপ্রাচ্য

ভূমিকা:

গত বছর ফিলিস্তিন-ইসরাইল ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্য বিশ্ব সম্প্রদায়কে ভাবিয়ে তুলেছে। বিগত ১৫ ফেব্রুয়ারি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে এক বৈঠক শেষ সংবাদ সম্মেলনে দেশ দুটির মধ্যে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের সম্ভাবনা অনেকটা নাকচ করে দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইল  ও ফিলিস্তিন- দুটি পৃথক ও স্বাধীন রাষ্ট্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ওই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে কাজ করছে বিশ্ব শক্তিগুলো। ট্রাম্পের বক্তব্যে সেই নীতিতে পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যায়।ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পর বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধান না হয় তবে ছোট্ট এ আরব ভূখণ্ডটিতে সংঘাত আরও ঘনিভূত হতে।

সংকটের ইতিহাস:

ফিলিস্তিন-ইসরাইল  ভূখণ্ডগত সমস্যাটি বোঝার আগে সাম্প্রতিক অতীতের কিছু বিষয়ে নজর দেয়া আবশ্যক। মূলত একই ভূখণ্ডকে কেন্দ্র করে এবং একই সময়ে আরব জাতীয়তাবাদ ও ইহুদি জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটে। দুই জাতির লোকই বর্তমান বিরোধপূর্ণ ভূখণ্ডটি নিজেদের বলে দাবি করে। তখনই প্রশ্ন ওঠে একটি ন্যায্য সমাধানের। দুটি আলাদা রাষ্ট্র সৃষ্টির মাধ্যমেই সমাধান খুঁজতে শুরু করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।

এখন থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণার অনুসারে ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসরাইলের। ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নীলনকশা হিসেবে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের অনুমোদনে একটি ঘোষণা দেওয়া হয়। সেই সময়ের ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী আর্থার বেলফোর এ ঘোষণা দিয়েছেন বলে একে ‘বেলফোর ঘোষণা’ বলা হয়।

আর্থার বেলফোর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য একটি আবাসভূমি গড়ে তোলার পক্ষে ব্রিটিশ সরকারের সমর্থন জানিয়ে তৎকালীন ব্রিটেনে ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রভাবশালী নেতা ব্যারন রথসচাইল্ডের কাছে ১৯১৭ সালের ২ নভেম্বর একটি চিঠি দেন। জায়নিস্ট ফেডারেশন অব গ্রেট ব্রিটেন অ্যান্ড আয়ারল্যান্ডর কাছে চিঠিটি পৌঁছে দেওয়ার জন্য রথসচাইল্ডের হাতে তুলে দেয়া হয়। ওই চিঠির ভাষ্যই ইতিহাসে ‘বেলফোর ঘোষণা’ নামে পরিচিত।

বেলফোরের ঘোষণায় ফিলিস্তিনি মুসলিমদের নাম বলা হয়নি, বলা হয়েছে অ-ইহুদি সম্প্রদায়। যেখানে সেই সময়ে ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যার ১০ শতাংশেরও কম ছিল ইহুদিরা, সেখানে বাকি ৯০ শতাংশ মানুষকে অ-ইহুদি বলে তাদের নগণ্য দেখানো হয়েছে। এর পেছনে দূরভিসন্ধি ছিল ব্রিটিশ সরকারের, যার বাস্তবতা দেখা যায় ১৯৪৮ সালে, যখন ‘ফিলিস্তিনি জাতির বিরুদ্ধে নিধন’ চালানো হয়। হত্যা, গণহত্যা, নির্যাতন, নিপীড়নের মাধ্যমে কয়েক শত ফিলিস্তিনি গ্রাম খালি করে সেখানে ইহুদিদের বসতি তৈরি করা হয়। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের রক্তে ভেজা জমিনে জন্ম হয় ইসরায়েলের। ওই বছর ফিলিস্তিনের মাত্র ১০ ভাগ ভূখণ্ড নিয়ে ইহুদি রাষ্ট্রের গোড়াপত্তন করা হলেও এখন তাদের দখলেই চলে গেছে ৯০ শতাংশ। ৭০ বছরে শতাংশের হিসাব একেবারে উল্টে গেছে। ১৯৪৮ সালে ভূখণ্ডের হিসাব ছিল: ফিলিস্তিন ৯০ শতাংশ আর  ইসরাইল ১০ শতাংশ। ২০১৭ সালে হয়েছে: ফিলিস্তিন ১০ শতাংশ  ইসরাইল ৯০ শতাংশ।

১৯২১ সালে ফিলিস্তিন ভূখণ্ড থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা হয় ট্রান্সজর্ডান। এই ট্রান্সজর্ডানেরই বর্তমান নাম জর্ডান। আর তখন ফিলিস্তিন বলতে বুঝানো হতো বর্তমান ইসরাইল, পশ্চিমতীর এবং গাজা ভূখণ্ডকে। ১৯৪৭ সালে হঠাৎ করেই একটি প্রস্তাবনা পাস করে জাতিসংঘ। এতে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডকে দ্বিতীয়বার বিভাজনের কথা বলা হয়। জর্ডান নদীর পূর্ব ও পশ্চিম তীরকে কেন্দ্র করে এই বিভাজন পরিকল্পনা করা হয়।

প্রস্তাবনায় বলা হয়, দুই ভূখণ্ডের যে অংশে ইহুদিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে সেখানে তারা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করবে। আর যেখানে ফিলিস্তিনি আরবদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা সেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তবে তখন এই প্রস্তাবনা প্রত্যাখ্যান করে আরবরা। তাদের অভিযোগ ছিল, ইউরোপ থেকে ইহুদিদের এনে আরব ভূখণ্ডে পুনর্বাসিত করে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডের একটি অংশে তাদের সংখ্যাগরিষ্ঠে পরিণত করা হয়েছে।

এ নিয়ে ১৯৪৮ সালে হয় আরব-ইসরাইল যুদ্ধ। পশ্চিমতীর দখল করে নেয় জর্ডান এবং গাজার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় মিসরের হাতে। ১৯৬৭ সালে আরবদের সঙ্গে আরেকটি যুদ্ধ হয় ইহুদিদের। ছয়দিনের ওই যুদ্ধে পরাজিত হয়, জর্ডানের পরাজয় ঘটে এবং ইসরাইল পশ্চিমতীর দখল করে নেয়। গাজা উপত্যকার নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বাধ্য হয় মিসরও।

এ সময় ইসরেইলের বামপন্থিরা শান্তি রক্ষায় পশ্চিমতীরকে জর্ডানের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবি তোলে। এরই মধ্যে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ এবং মেনাখেম বেগিনের অধীনে ইসরাইলে কট্টরপন্থার উদ্ভব ঘটে। এক পক্ষের দাবি ছিল, বৃহত্তর ইসরাইল এবং অপরপক্ষের দাবি ছিল, বৃহত্তর ফিলিস্তিন। কেউই দুই রাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে ছিল না। পশ্চিমতীর ইসরাইলের অধীনে রাখার পক্ষে দেশটির কট্টরপন্থিদের যুক্তি ছিল জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় কারণ। ইহুদি ধর্মের ওপর ভিত্তি করে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেন তারা।

সমাধানের বিভিন্ন রূপ

দুই রাষ্ট্র সমাধানঃ

১৮৭৪ সাল থেকে অবশ্য দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের পথে হাঁটতে শুরু করেন ইয়াসির আরাফাত। ১৯৯৩ সালে ইসরাইলের সঙ্গে অসলো শান্তি চুক্তির পরে পশ্চিমতীর এবং গাজা উপত্যকায় ‘প্যালেস্টিনিয়ান অথরিটি’ (ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ) প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। পরবর্তী ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী- এহুদ বারাক, অ্যারিয়েল শ্যারন, এহুদ ওলমার্ট এবং বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু- সবাই ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাটি মেনে নিয়েছেন বলে জানান। তবে এই সময়ে ফিলিস্তিন ভূখণ্ডে ইহুদি বসতি স্থাপনের কাজও চলতে থাকে।

ইয়াসির আরাফাত এবং তার উত্তরসূরী মাহমুদ আব্বাস ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের কথা প্রচার করলেও কার্যত এটা কখনোই বাস্তব রূপ পায়নি। ২০০৯ সালে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন নেতানিয়াহু। কিন্তু আদর্শগত ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত কারণে কোনো ডানপন্থি ইসরাইলি সরকারই এ ধরনের একটি রাষ্ট্রের উত্থান মেনে নেবে না।

২০০৭ সালে গাজার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইসলামপন্থি সংগঠন হামাসের হাতে। স্থানীয় নির্বাচনে দলটির কাছে পরাজিত হয় ফাতাহ। এতে আবারো দুইভাগে ভাগ হয়ে পড়ে প্যালিস্টিনিয়ান অথরিটি। পশ্চিমতীরের নিয়ন্ত্রণ থেকে যায় জাতীয়তাবাদীদের হাতে আর গাজার নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ইসলামপন্থি হামাসের কাছে। ফিলিস্তিনের জাতীয়তাবাদীরা দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের ব্যাপারে রাজি হলেও এ ব্যাপারে ইসলামপন্থিদের কাছ থেকে সুস্পষ্ট কোনো বিবৃতি আসেনি। তবে তাদের আপত্তিকে ধর্মীয় বলেই মনে করা হয়। ভূমধ্যসাগর থেকে জর্দান নদী পর্যন্ত পুরো ভূখণ্ড ইসলামি শাসনের অধীনে থাকা উচিত বলে মনে করে ইসলামপন্থিরা।

এক রাষ্ট্র সমাধান:

বর্তমানে পশ্চিমতীরে বসবাসকারী ৪ লাখ ইহুদি- যারা পরে বসতি স্থাপন করেছে, তারা স্বেচ্ছায় ওই ভূখণ্ড ছেড়ে যেমন চলে যাবে না তেমনি তাদের জোর করে উচ্ছেদও সম্ভব নয়- এই নীতির ওপর ভিত্তি করে এক রাষ্ট্র সমাধানের কথা বলা হয়। ইসরাইলের কট্টর বামপন্থিরা এটাকে সবচে ভালো সমাধান বলে মনে করে। তবে ইসরায়েলি ডানপন্থিরা মনে করে, এটা হলে কয়েক বছরের মধ্যে পশ্চিমতীর এবং গাজায় ও ইসরাইলি ভূখণ্ডে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরবদের সংখ্যা ইহুদিদের ছাড়িয়ে যাবে।

রাষ্ট্রবিহীন এক ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ পান ইয়াসির আরাফাত:

আরবদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ইহুদিদের চেয়ে বেশি হওয়ায় এক সময় আরব ভোটার বেড়ে যাবে। আর এটা হওয়া মানে ইহুদিদের স্বায়ত্তশাসনের সমাপ্তি। তাছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুগোস্লাভিয়ার পতনের পর জাতীয়তাবাদের শক্তি আরো একবার প্রমাণিত হয়েছে। এজন্য অনেকে মনে করেন, এক রাষ্ট্র সমাধান শুধু তাত্ত্বিকভাবেই যৌক্তিক। শেষ পর্যন্ত ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিদের মধ্যে শত্রুতা একটি দুঃসহ অবস্থা সৃষ্টি করবে।

ত্রি-রাষ্ট্রীয় কনফেডারেশনঃ

১৯৪৮ সাল থেকেই ফিলিস্তিন, জর্দান এবং ইসরাইলের মধ্যে একটি কনফেডারেশনের বিতর্ক চলে আসছে। সাবেক ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বা এবান অনেকটা বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং লুক্সেমবার্গের আর্থ-রাজনৈতিক সংস্থা ‘বেনেলাক্স’র মতো একটি ইউনিয়ন দাঁড় করতে চেয়েছিলেন। ছয়দিনের যুদ্ধ শেষে দেশটির লেবার পার্টি সরকার ‘অ্যালন প্ল্যান’ নামের একটি পরিকল্পনা হাতে নেয়। এতে বলা হয়, পশ্চিমতীরকে ইসরাইল এবং জর্ডানের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে এবং বাকি অংশ ফিলিস্তিনিদের হাতে থাকবে। সত্তরের দশকে অবশ্য ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদের উত্থানে এই ধারণা পরিত্যক্ত হয়। তখন থেকে জর্ডান এবং মিসরও পশ্চিমতীর ও গাজার ব্যাপারে আগ্রহ আর দেখায়নি।

স্বায়ত্তশাসনঃ

১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় আসার পর সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী মেনাখেম বেগিন পশ্চিমতীর ও গাজার প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব করেন। এতে ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করবে ইসরাইল। অসলো শান্তি চুক্তিতেও সীমিত স্বায়ত্তশাসনের কথা বলা হয়েছে। তবে উভয়পক্ষই মনে করে, এটি একটি অন্তর্বর্তীকালীন সমাধান।

উপসংহারঃ

ফিলিস্তিন-ইসরাইল সমস্যা নিরসনে এ পর্যন্ত যত প্রস্তাবনাই দেয়া হয়েছে কোনোটাই কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনতে কী বিকল্প থাকতে পারে এ নিয়েও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত পরিকল্পনা দাঁড় করানো যায়নি। আপাতত বিষয়টি নিয়তির উপর ছেড়ে দেয়া ছাড়া কিছুই করার নেই নিরীহ নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *