গুগলের মতো ছিলেন মহাভারতের নারদ!

ভারত লিড নিউজ

(গুজরাট, ভারত) মহাভারতের যুগেই ভারতে যে ইন্টারনেট ছিল, তা প্রমাণে উঠেপড়ে লেগেছেন বিজেপি নেতারা। ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব দেবের পর এবার নতুন যুক্তি নিয়ে হাজির হলেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রুপানি। আরএসএস-এর সহযোগী সংস্থা বিশ্ব সংবাদ কেন্দ্র আয়োজিত ‘দেবর্ষী নারদ জয়ন্তী’ অনুষ্ঠানে রূপানি বলেছেন, ‘নারদের কাছে সব বিষয়ের তথ্য থাকত। সারা বিশ্বের খবর নিতে পারতেন এবং সেই অনুযায়ী কাজ করতেন। মানবজাতির উন্নতির স্বার্থে তথ্য সংগ্রহই তার ধর্ম ছিল। বিশ্বে কোথায় কী হচ্ছে, সেটা জানতেন তিনি। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আজকের দিনেও এটা প্রাসঙ্গিক। গুগলও নারদের মতোই তথ্যের সূত্র।‘

হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী মতে, নারদ ব্রহ্মার মানসপুত্র। নারদ ত্রিকালজ্ঞ, বেদজ্ঞ ও তপস্বী। নার শব্দের অর্থ জল।তিনি সবসময় তর্পণের জন্য জলদান করতেন বলে তার নাম হয় নারদ। ভগবত মতে- ইনি জনৈক ব্রাহ্মণের এক দাসীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তার মায়ের আদেশে সবসময় যোগীদের সেবা করতেন এবং এই যোগীদের উচ্ছিষ্ট খাবার খেয়ে ধর্মপরায়ণ হয়ে উঠেন।

এর আগে গত সপ্তাহে ত্রিপুরার মুখমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেছিলেন, মহাভারতের যুগেও ইন্টারনেট ছিল। ইন্টানেটের সুবাদেই ধৃতরাষ্ট্রকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা দিতে পেরেছিলেন সঞ্জয়। এর আগে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সদ্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব বলেন, ‘সেই মহাভারতের যুগেও ভারতে ইন্টারনেট ছিল’। সম্প্রতি আগরতলা শহরে একটি কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, ‘মহাভারতে সঞ্জয় যেভাবে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বহুদূরে অবস্থান করেও ধৃতরাষ্ট্রকে যুদ্ধের বর্ণনা দিয়েছেন, তা থেকেই বোঝা যায় সেই যুগেও ইন্টারনেট ছিল, স্যাটেলাইট ছিল। না হলে চোখ দিয়ে তিনি অতদূর দেখতে পেতেন কী করে!’

ভারতীয় জনতা পার্টি ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের নেতা বিপ্লবের কথা ধরলে, আশির দশকে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব আবিষ্কৃত হয়নি। যদিও ষাটের দশক থেকেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কম্পিউটারগুলোর সংযুক্তিকরণের জন্য ওয়াইড এরিয়া নেটওয়ার্ক নিয়ে চিন্তাভাবনা বা গবেষণা শুরু হয়। তার মতে, ‘খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে, যে সময়ে মহাভারত রচিত হয়েছিল, সেই সময়েও ইন্টারনেট ছিল। মাঝখানের সময়কালে অনেক কিছুই বদলে গেছে। বিদেশিরা দাবী করছে, যে ইন্টারনেট বা স্যাটেলাইট তাদের আবিষ্কার।’

ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী বিপ্লব কুমার দেব আরও দাবি করেন, ‘ভারত সেই দেশ, যেখানে লাখো বছর আগে থেকেই বিজ্ঞান আর প্রকৌশল রয়েছে’। শুধু বিপ্লবই নন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে তার সরকারের মন্ত্রী বা রাজ্যের বিজেপি নেতারা গত কয়েক বছরে এমন অনেক অবিশ্বাস্য তথ্য দিয়েছেন। এগুলো সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে বৈজ্ঞানিক মহলে হাসির খোরাক যুগিয়েছে। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের অক্টোবরে বলেন, ’নিশ্চয়ই সেই যুগে এমন কোনো প্লাস্টিক সার্জন ছিলেন, যিনি হাতির মাথা গণেশের শরীরে লাগিয়েছিলেন’।

কেন্দ্রীয় কৃষিমন্ত্রী রাধা মোহন সিং ২০১৫ সালে ‘যোগভিত্তিক কৃষিকাজ’ কী, তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন যে, ’ওই পদ্ধতিতে বীজের মধ্যে ধনাত্মক শক্তি প্রবেশ করানো হবে। যেন পরমাত্মা শক্তির মাধ্যমে বীজগুলিকে উজ্জীবিত করা যায়’। একটি বইয়ের মুখবন্ধে মোদি লিখেছেন, ’ভারতীয় ঋষিরা যোগবিদ্যা সাধনার ফলে ‘দিব্যদৃষ্টি’অর্জন করতেন। সেটাই টেলিভিশন আবিষ্কারের গোঁড়ার কথ’। উত্তরখণ্ড রাজ্যের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও বিজেপি নেতা রমেশ পোখরিয়াল নিশাঙ্কর বলেছেন, ‘ লাখো বছর আগেই কণাদ ঋষি পারমাণবিক বিস্ফোরণের পরীক্ষা করেছিলেন’।

রাজস্থানের মন্ত্রী বাসুদেব দেভনানী মন্তব্য করেছিলেন গরুই হচ্ছে একমাত্র প্রাণী, যারা নিশ্বাস নেয়ার সময়েও অক্সিজেন নেয় এবং প্রশ্বাসের সময়েও অক্সিজেনই ছাড়ে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সত্যপাল সিং এ বছর জানুয়ারিতে মন্তব্য করেন, ডারউইনের বিবর্তনবাদ বা থিওরি অফ ইভোলিউশন একটি ভুল মতবাদ। সেটা স্কুল কলেজে পড়ানোই উচিত নয়। হিন্দুত্ববাদী নেতা-মন্ত্রীদের এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক কথা বলার কারণ বিশ্লেষণে ভারতীয় বিজ্ঞান লেখক পথিক গুহ বলেন, ‘জনগণকে মিথ্যা জ্ঞান বিতরণ করার অধিকারেরই আরেক নাম ক্ষমতা। মানুষ সেইজন্যই ক্ষমতা পেতে চায়’।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *