জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাই মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নৃশংসতা বন্ধের একমাত্র পথ: জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি ইয়াংঘি লি

পূর্ব এশিয়া লিড নিউজ

অন্যান্য দিনের মতো সেদিনও মাঠে কাজ করছিল তিন রোহিঙ্গা নারী। আচমকা তাদের ঘিরে ধরে জনাকয়েক সেনা। তুলে নিয়ে যায় ব্যারাকে। তারপর সেই চিরপরিচিত বর্বর নির্যাতন গণধর্ষণ। এভাবে টানা চার দিন ধরে। এটা ২০১৭ সালের ঘটনা নয়, ২০০০ সালের।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর বর্বর অভিযান চালায় দেশটির সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর অমানবিক ও বর্বব এ নিধনযজ্ঞ ও গণহত্যার পর প্রায় ১০ মাস গত হয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য হারে নিন্দা ও উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি।

সহিংসতার জন্য প্রধান দায়ী সেনাবাহিনীকে বিচারের কাঠগড়ায় আনতে পারেনি বিশ্ব সম্প্রদায়। এক্ষেত্রে বরাবরের মতো এবারও পুরোপুরি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে তারা। বিশ্ব সম্প্রদায়ের এই বিস্মৃতি ও ব্যর্থতার কারণেই রোহিঙ্গাদের ওপর বাববার বর্বরতা ও নিষ্ঠুরতার সুযোগ ও সাহস পেয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনাই সহিংসতা বন্ধের একমাত্র পথ।

জাতিসংঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে,  রোহিঙ্গাদের ওপর অভিযানে তাদের ওপর গণহত্যা চালানো হয়েছে। অন্তত ৬ হাজার ৭০০ নারী, শিশু ও পুরুষকে হত্যা করা হয়েছে। ধর্ষণ ও  অন্যান্য যৌন নির্যাতন করা হয়েছে বহু নারীকে।

‘ক্লিয়ার‌্যান্স অপারেশন’ নামের এই অভিযানে রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম, হাজার হাজার একর ফসলি জমি, মসজিদ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আগুনে জ্বালিয়ে দেয়া হয়। প্রাণে বাঁচতে প্রায় ৭ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। কক্সবাজারের কয়েকটি শরণার্থী শিবিরে এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে তার। রাখাইনে আভ্যন্তরীনভাবে উদ্বাস্তু হয়েছে আরও অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার। মৌলিক অধিকার ছাড়াই প্রাদেশিক রাজধানী সিত্তের বিভিন্ন ক্যাম্পে অবস্থান করছে তারা।

মিয়ানমারে এসব নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৪৮ সালের গৃহযুদ্ধের সময় থেকেই চলে আসছে। হত্যা-খুন- ধর্ষণ-নির্যাতন নিয়মিত ঘটনা। চলছে শিশুদের কাঁধে অস্ত্র তুলে দিয়ে ‘শিশু সৈনিক’ হিসেবে যুদ্ধের ভয়াবহতায় ঠেলে দেয়া।

১৯৯০-এর দশকে কায়িন প্রদেশে নির্মম অভিযান চালায় সেনাবাহিনী। কয়েক লাখ গ্রামবাসী পালিয়ে পাশ্ববর্তী থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। ১৯৯৬-৯৮ টানা দুই বছর ধরে দেশটির শান রাজ্যে নৃশংসতা চালায় এই সশস্ত্র বাহিনী। তখনও তিন লাখের বেশি মানুষ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যায়।

তারপর ১৭ বছরের যুদ্ধবিরতি শেষে ২০১১ সালে আবারও তারা ঝাপিয়ে পড়ে শান ও কাচিন রাজ্যের গ্রামগুলোতে। ফের গ্রাম ছাড়ে এক লাখ। চলতি বছর মিয়ানমারের কাচিন প্রদেশে দেশটির কাচিন প্রদেশে কাচিন বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ওপর অভিযান শুরু করে সেনাবাহিনী। এতে নিহত হয়েছে কয়েকশ মানুষ। ঘরবাড়ি ছেড়ে বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ।

১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার পর থেকে এভাবে বারবার বিভিন্ন রাজ্যের ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর ওপর বর্বরতা চালিয়ে আসছে সেনাবাহিনী। কিন্তু কোনোবারই তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা যায়নি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যর্থতায় আজকের মিয়ানমার সেনাবাহিনীর সবচেয়ে ‘বড় সাহস’। সেনাবাহিনীর এই সহিংসতা ও বর্বরতা বন্ধ করতে হলে আমাদের অবশ্যই তাদেরকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।  দায়মুক্তির সংস্কৃতির ইতি টানতে হবে।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *