কলম্বিয়ার পার্লামেন্টে শপথ নিলেন ৮ ফার্ক বিদ্রোহী নেতা

আমেরিকা

(বোগোতা, কলম্বিয়া) লাতিন আমেরিকার দেশ কলম্বিয়ার পার্লামেন্টে সদস্য হিসাবে শপথ নিয়েছেন কট্টর বামপন্থী রিভোলুশনারী আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়া বা ফার্ক বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ৮ নেতা। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি ও সরকারের মধ্যকার এক শান্তিচুক্তির অংশ হিসাবে শুক্রবার কংগ্রেসে আসন গ্রহণ করেন  এ সাবেক বিদ্রোহী এ নেতারা। এ সময় তাদেরকে সাদর সম্ভাষণ জানান দেশটির বিদায়ী প্রেসিডেন্ট হুয়ান মানুয়েল সান্তোস। তবে শপথ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ফার্ক কমান্ডার ইভান মারকেজ। মাদক চোরাচালানে অভিযুক্ত অপর বিদ্রোহী নেতা জিসাস সেনট্রিচ কারাগারে রয়েছেন। খবর বিবিসির।

দীর্ঘ পাঁচ  দশকের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ২০১৬ সালের সেম্টেম্বর মাসে বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সরকারের মধ্যে এক  ঐতিহাসিক চুক্তি হয়। বিদ্রোহীদের সঙ্গে এ চুক্তি সম্ভব করেন প্রেসিডেন্ট সান্তোষ। এজন্য ওই বছরই শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। চুক্তির শর্তানুযায়ী রিভোলুশনারী অলটারনেটিভ কমন ফোর্স নামে রাজনৈতিক দল গঠন করে ফার্ক । নতুন গঠিত দলটিকে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেটে পাচটিঁ ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদে পাঁচটি আসন উপহার হিসাবে দেয়া হয়।

শুক্রবার কংগ্রেসের উদ্বোধনী অধিবেশনে সংরক্ষিত এ আসনেই শপথ গ্রহণ করেন ফার্কের বিদ্রোহী নেতারা। তাদেরকে স্বাগত জানিয়েছে সান্তোস বলেন, আজ খুশিতে আমার হৃদয় ভরে গেছে। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে যারা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন, তারা আজ দেশের সংবিধান ও আইনের শাসনের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন’। ব্রিদোহীদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রের এ মন্দিরে আপনাদের স্বাগত জানাই’। কলম্বিয়ার নতুন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট কনজারভেটিভ নেতা ইভান ডুকোকে বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে নিয়ে কলম্বিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান সান্তোষ। গত মাসের নির্বাচনে ৫৪ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গুস্তাভো পেত্রোকে হারিয়ে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ডুকো।

পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধের দীর্ঘতম সময়ের সংঘাত বলা হয় কলম্বিয়া সরকারের সঙ্গে ফার্ক গেরিলাদের যুদ্ধকে। ২০১৬ সালে একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে অবসান ঘটেছে এই যুদ্ধের। দীর্ঘ পাঁচ দশকের সংঘাতে দেশটিতে প্রাণ হারিয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ। গৃহহীন হয়েছে আরও কয়েক লাখ। কারা এই ফার্ক গেরিলা? কেনইবা তাদের দীর্ঘ পাঁচ দশকের এই সংঘাত? কলম্বিয়ার বৃহত্তম এই গেরিলা গোষ্ঠিটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৪ সালে। এরা মূলত সেখানকার কমিউনিস্ট পার্টির একটি অঙ্গ সংগঠন। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদে বিশ্বাসী তারা।

কলম্বিয়ায় ধনী-দরিদ্রের তীব্র বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়তে প্রথমে কয়েকজন কৃষক এবং ভূমি শ্রমিক মিলে প্রতিষ্ঠা করে ফার্ক। তখন গ্রাম পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করে তারা। পরবর্তীতে গ্রামীণ একটি গেরিলা সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ বিদ্রোহী গোষ্ঠী। কলম্বিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হিসাব অনুসারে, বিভিন্ন পদে ফার্কর সক্রিয় যোদ্ধার সংখ্যা ৬ থেকে ৭ হাজার। এছাড়া স্বশস্ত্র এই দলটির আছে আরও সাড়ে আট হাজার বেসামরিক সদস্য, যারা ফার্কদের সমর্থনে বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করে থাকে। ২০০২ সালের আগে সংগঠনটির মোট সদস্য ছিল ২০ হাজার। এরপর থেকে তাদের সদস্য কমতে শুরু করে।

ছোট ছোট বিভিন্ন কৌশলগত দলে সংগঠিত থাকত ফার্ক গেরিলারা। যোদ্ধাদের অঞ্চলভিত্তিক একেকটি দলকে বলা হয় ‘ব্লক’। এই দলগুলোকে পরিচালনা করে ফার্কের কার্যকরী পরিষদ। দলের প্রধান হন কার্যকরী পরিষদের প্রধান। তিনিই মূলত দলের কৌশল নির্ধারণ করেন।

একসময় কলম্বিয়ায় যেকোনো ধরনের সরকার বিরোধী কাজকে রাষ্ট্রদ্রোহ বলে আখ্যা দেয়া হত। বিরোধীদের ওপর চালানো হত নির্মম নির্যাতন। এমন পরিস্থিতেই জন্ম হয়েছিল ফার্কের। ঐতিহাসিকভাবেই কলম্বিয়ার মানুষ ভয়াবহ বৈষম্যের শিকার হয়ে আসছে। দেশটির বেশিরভাগ ভূমিই অল্প সংখ্যক এলিটদের দখলে।

উনিশ এবং বিশ শতকের দিকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে কলম্বিয়ার বিশাল অংশের ভূমি ব্যক্তিগত মালিকানায় বিক্রি করে দেয় সরকার। তখনই ধনীক শ্রেণি বিশাল অংশের এই ভূমির মালিক বনে যায়। ওই সময়ে কলম্বিয়ার মধ্য তলিমা প্রদেশের মারকুয়েতালিয়া অঞ্চলে কৃষিভিত্তিক একটি সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করে স্থানীয় কৃষকরা।

১৯৫০ সালে কিউবা বিপ্লব থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের আরও অধিকার এবং ভূমির ওপর অধিক নিয়ন্ত্রণ দাবি করে তারা। কমিউনিস্ট নেতাদের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করে সরকার এবং ভূমি মালিকরা। এই সময়ের মধ্যে মারকুয়েতালিয়ায় একটি স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ফার্ক সদস্যরা। এটা জানতে পেরে মারকুয়েতালিয়া রিপাবলিকের পতনে সেনাবাহিনী পাঠায় সরকার। এরপর থেকেই মূলত স্বশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে ফার্ক গেরিলারা।

ফার্ক প্রতিষ্ঠার আগেও শান্ত ছিল না কলম্বিয়া। টানা ১০ বছর গৃহযুদ্ধ হয়েছিল দেশটিতে। ‘লা ভায়োলেন্সিয়া’ নামে পরিচিত ওই ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে ২ থেকে ৩ লাখের মতো মানুষ প্রাণ হারায়। কলম্বিয়ার রাজনৈতিক দল লিবারেল পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জর্জ এলিসার গাইতানকে ১৯৪৮ সালে গুলি করে হত্যার পর শুরু হয়েছিল ১০ বছরের ওই ‍গৃহযুদ্ধ।

 

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *