আসামের নাগরিক তালিকায় একই পরিবারের কারো নাম উঠেছে, কারো ওঠেনি

ভারত

(আসাম, ভারত) আসামে সদ্য প্রকাশিত জাতীয় নাগরিক তালিকায় (এনআরসি) একই পরিবারের কারো নাম উঠেছে, কারো ওঠেনি। দেখা গেছে একই পরিবারের সদস্য হলেও স্ত্রী-কন্যাকে বৈধ নাগরিক করা হয়েছে কিন্তু স্বামী বা বাবাকে অবৈধদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। ‘চূড়ান্ত নাগরিক তালিকা’ খসড়ার এই অনিয়মে বিস্ময় প্রকাশ করেছে আসাম রাজ্যের কয়েক লাখ পরিবার। ৪০ লক্ষাধিক বাংলাভাষী নাগরিককে ‘অবৈধ’ করে দ্বিতীয় ধাপে সোমবার প্রকাশ করা হয় ওই নাগরিক তালিকা। এর একদিন পর মঙ্গলবার এ খবর প্রকাশ করে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

নাগরিক তালিকার ক্ষেত্রে আসামের প্রায় সব জেলাতেই ঘটেছে এমন আজব কাণ্ড। কাছাড় জেলার শিলকুড়ি এলাকার বাসিন্দা নিরঞ্জন সূত্রধর বলেন,  ‘এটা কীভাবে সম্ভব যে, বাবা বা স্বামী হিসাবে আমি বৈধ নাগরিক হলাম না। অথচ স্ত্রী, কন্যা আর এক পুত্রের নাম নাগরিক পঞ্জিতে উঠল! আবার এক ছেলের নাম আছে, অন্যজন বাদ!’ ছয়জনের পরিবার নিরঞ্জনের। চারজনের নাম তিনি খুঁজে পেয়েছেন জাতীয় নাগরিক পঞ্জির চূড়ান্ত খসড়ায়। এক ছেলে আর তার নিজের নামও নেই।

অনেকটা একই কাহিনি পাশের জেলা হাইলাকান্দির বন্দুকমারা এলাকার বাসিন্দা মীনারা বেগমের। মীনারা বলেন, ‘আমার শ্বশুর আর বাবার দুজনেরই নামই ছিল ১৯৫১ সালের নাগরিক পঞ্জিতে। বাকি যা কাগজ দরকার, সব দিয়েছিলাম। কিন্তু সাতজনের পরিবারের তিনজনের নাম এসেছে, বাকি চারজনের নাম নেই। এক মেয়ের আর এক ছেলের নাম নেই, আমার নিজের নামও নেই। কিন্তু অন্য ছেলে-মেয়েদের নাম রয়েছে।’

সম্পূর্ণ খসড়া তালিকা থেকে বাদ পড়েছে ৪০ লাখ সাত হাজার ৭০৮ জনের নাম। যেসব মানুষের নাম বাদ পড়েছে, তাদের সিংহভাগই বাংলাভাষী মুসলমান বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এ নিয়ে নির্দিষ্ট তথ্য এখনও দেয়া হয়নি। বাদ পড়েছে অনেক বাঙালি হিন্দুর নামও। অন্যদিকে শিলচর শহরের মধুরবন্দ এলাকার মইনুল হাসানের মতো মানুষ, যারা পরিবারের সব সদস্যের নামই তালিকায় খুঁজে পেয়েছেন, তাদের সংখ্যাটা দুই কোটি ৮৯ লাখ।

মঈনুল হাসানের সঙ্গে যে জায়গায় কথা হচ্ছিল, সেখানেই ছিলেন যুবক হাবিবুর রহমান লস্কর। তিনি আবার পরিবারের সকলের নাম খুঁজে পেলেন না। একইভাবে কাছাড়ের পাশের জেলা হাইলাকান্দির বাঁশধারের বাসিন্দা উজ্জ্বল রায়ও পরিবারের সবার নাম খুঁজে পাননি। শৈলেশ আসাম ক্যাডারেরই অফিসার। তিনি আগে ছিলেন আসামের স্বরাষ্ট্র সচিব। নামের সঙ্গে কোনো পদবি ব্যবহার করেন না এই শীর্ষ কর্মকর্তা। শৈলেশ জানান, তিন কোটি ৩০ লাখ মানুষের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পরে দুই কোটি ৮৯ লাখ মানুষকে বৈধ ভারতীয় নাগরিকের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে কর্তৃপক্ষ বলছেন, যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের এখনই অবৈধ বিদেশি বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে না, তারা নিজেদের দাবি সপক্ষে প্রমাণ পেশ করার জন্যে আরও একবার সুযোগ পাবেন। হাইলাকান্দির বাঁশধারের বাসিন্দা উজ্জ্বল রায় জানান, পরিবারের ১৩ জন আবেদন করেছিলেন নাগরিকত্বের জন্য, দুজন তালিকায় ঠাঁই পাননি। উজ্জ্বল বলেন, ‘কেন যে দুজনের নাম বাদ গেল, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। একই নথি জমা দিলাম সবার জন্য, একজনের নাম থাকে, অন্যজনের নাম থাকে না! আবার আসতে বলছে যে কী কারণে নাম বাদ গেল, সেটা জানার জন্য।’

পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন আব্দুল মান্নান লস্কর নামের এক দিনমজুর। তিনি বলেন, ‘পরিবারের কয়েকজনের নাম বাদ পড়েছে। কেন যে তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ল, সেটা জানতে এক দিন কাজ কামাই করে আবারও আসতে হবে।’

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, যাদের নাম বাদ পড়ল, তাদের চিন্তার কারণ নেই। একমাসের মধ্যে আবারও দাবী পেশ করা যাবে তথ্য নথিসহ। আর যাদের নাম বাদ পড়েছে, তাদের এখনই অবৈধ বিদেশী বলে চিহ্নিতও করা হবে না বা বন্দী শিবিরে পাঠানো হবে না। আপাতত আসামের মানুষ সেই আশ্বাসেই ভরসা রাখছেন। কারণ যেভাবে নির্দেশ আসবে সরকারের, সেইভাবেই নথি জমা করে জাতীয় নাগরিক পঞ্জীতে নাম তোলার চেষ্টা করবেন এই ৪০ লক্ষ মানুষ।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *