যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় ইরানের পাশে রয়েছে বিশ্ব: আলজাজিরার বিশ্লেষণ

মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

(তেহরান, ইরান) ইরানের কঠোরতম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট। ট্রাম্প প্রশাসনের ঘোষণা অনুযায়ী সোমবার রাত ১২টা ১ মিনিট থেকে এ  নিষেধাজ্ঞা বলবৎ হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার অধীনে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অধিকাংশ বাণিজ্যিক সম্পর্ক অবৈধ বলে বিবেচিত হবে। ডলারে সব রকম আদান-প্রদান ও স্বর্ণসহ মূল্যবান খনিজ পদার্থে বাণিজ্য ছাড়াও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় ইরান থেকে কার্পেট বা শুকনো খাবার আমদানিও পড়বে। একইভাবে ইরানের কাছে কোনো বাণিজ্যিক বিমান বিক্রয়ের জন্য এর আগে দেয়া সব চুক্তি বাতিল করা হবে।

আলজাজিরা জানায়, এ নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় মনোবল হারাচ্ছে না তেহরান। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো তাদের পাশে রয়েছে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে ইতিমধ্যে অস্বীকৃতি জানিয়েছে চীন এবং রাশিয়া। একইসঙ্গে তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রাখার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে দেশ দু’টি। এক্ষেত্রে ইরানের তেল ক্রয় আরও বাড়াবে বলে জানিয়েছে বেইজিং।

তেহরানের ওপর ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল প্রসঙ্গে এক প্রতিক্রিয়ায় চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বুধবার এক বিবৃতিতে বলেছে, চীন সব সময় একতরফা নিষেধাজ্ঞার বিরোধীতা করে আসছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরানের সঙ্গে চীনের বাণিজ্যিক সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত রয়েছে এবং এ সহযোগিতা স্বচ্ছ, যৌক্তিক, আইনগত এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের নিয়ম নীতির মধ্যেই পরিচালিত হচ্ছে।

ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের একতরফা নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে ‘গভীর হতাশা’ প্রকাশ করে রাশিয়া বলেছে, মস্কো অবশ্যই ইরানের পরমাণু সমঝোতা বাস্তাবয়ন করবে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, তেহরানের ওপর একতরফা নিষেধাজ্ঞা দেয়ার মাধ্যমে আমেরিকা জাতিসংঘের ২২৩১ নম্বর প্রস্তাব সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং তাদের এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইন বিরোধী।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর আরোপ করা নতুন নিষেধাজ্ঞাকে ‘সব থেকে আগ্রাসী’ (মোস্ট বাইটিং এভার) বলে অভিহিত করেছেন। এক টুইটার বার্তায় তিনি লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে যে দেশ বাণিজ্য করবে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার কোনো বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকবে না’। আলজাজিরা সাংবাদিক কিম্বার্লি হালকেট হোয়াইট হাউস থেকে জানিয়েছেন, ট্রাম্প মূলত তার মিত্র দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করতে এ হুমকি দিয়েছেন। তবে এর বিপরীতে ইরানও বসে নেই। তারাও যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। একইসঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে একটা বার্তা দিতে চাচ্ছে যে ইরান একা নয়।

নিষেধাজ্ঞার মোকাবেলায় বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গেও স্বাভাবিক সম্পর্ক বজায় রাখছে তেহরান। সমপ্রতি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভেদ জারিফ উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী রি ইয়ং হোর সঙ্গে বৈঠক করেছেন। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়া বৈঠকের উভয় পক্ষই যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের শিকার। রি ইয়ং হো বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ একটি ভুল পদক্ষেপ। ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বুধবার তেহরানে প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। এ সময় তিনি বলেন, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অনেক ইস্যুতে ইরান এবং উত্তর কোরিয়া একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে।

রি ইয়ং হো বলেন, ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ও এককেন্দ্রিকতাবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার অন্যতম প্রধান নীতি। গত ১২ জুন সিঙ্গাপুরে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠক সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট রুহানিকে অবহিত করেন রি ইয়ং।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মোকাবেলায় ইরানের পাশে থাকার প্রত্যায় ব্যক্ত করেছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।নিষেধাজ্ঞার প্রতিক্রিয়ায় জ্যেষ্ঠ ইউরোপীয় কর্মকর্তারা এক কঠোর যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করেন। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার দ্বিতীয় স্তর ইউরোপের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। এই নিষেধাজ্ঞায় বলা হয়েছে,  শুধু মার্কিন প্রতিষ্ঠান নয়, যেসব বিদেশি কোম্পানি নিষেধাজ্ঞার অন্তর্ভুক্ত সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে লেনদেন করবে, তারাও নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। ইরানের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আছে যেসব ইউরোপিয়ান কোম্পানির তারাও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে  ইইউ।  এই পরিস্থিতি এড়াতে ইইউ পাল্টা পদক্ষেপ নিয়ে জানিয়েছে, এসব কোম্পানি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে। মার্কিন নিষেধাজ্ঞা যখন থেকে কার্যকর হবে ঠিক একই সময়েই ইইউর পাল্টা এই সুরক্ষামূলক আইন কার্যকর হবে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জারিফ বলেছেন, বিশ্ব এখন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডে বিরক্ত ও ক্লান্ত। কোনো দেশই আর ওই আবেগপ্রবণ টুইটকারীকে অনুসরণ করবে না। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া, চীন ও আমাদের সব বাণিজ্য সহযোগী দেশগুলোকে জিজ্ঞেস করে দেখুন। আন্তর্জাতিক সংকট গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজও একই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই অবরোধ আগের অবরোধগুলোর তুলনায় অনেক কম প্রভাব ফেলবে ইরানের ওপরে। অবরোধ তখনই কার্যকর হয় যখন আন্তর্জাতিকভাবে তা সবাই গ্রহণ করে। কিন্তু এবার সেরকম কিছু হচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্র মূলত বিশ্বকে তার সামনে মাথানত করতে তর্জন গর্জন করছে। বিশ্বে এখন চীন ও রাশিয়ার মতো অনেক দেশই আছে যারা যুক্তরাষ্ট্রের কথায় উঠবস করবে না। এ কারণেই গতবারের অবরোধের মতো এটি তেমন কার্যকর হবে।

এছাড়া এ অবরোধ প্রকৃতপক্ষে ফলপ্রসূ হওয়ার পথে আরও কিছু বাধা রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের এখনও সমঝোতা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া কেউই ইরান চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসেনি ও তাদের সবাই যুক্তরাষ্ট্রের এরকম আচরণে ক্ষুব্ধ। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণী বিভাগের প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি ইউরোপীয় কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে আরো বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে উৎসাহিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ইরান সমঝোতা অনুযায়ী তার পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করেছে।

তিনি বলেছেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নেরই এখন ঠিক করা উচিত তারা কার সঙ্গে ব্যবসা করবে।  আমরা ইরানকে চুক্তিতে ধরে রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ইরানের অর্থনীতি ও মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনার মতো একটা চুক্তি এটি। ইরান শুধু এ অঞ্চলে না, সমগ্র বিশ্বজুড়েই নিরাপত্তাজনক কারণে গুরুত্বপূর্ণ। বৃটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র সঠিক কাজটি করছে না। ইরান চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। শুধু এ অঞ্চলের জন্যই নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *