মুভি রিভিউ: যে ছবি দেখে কান্না চলে আসে ‘বারান’ তেমনই একটি ছবি

অন্যান্য

(হিমালয় মাসুদ, ঢাকা) সিনেমা শুধু বিনোদনের মাধ্যমই নয়। বরং কিছু কিছু সিনেমা সমাজের নির্মম বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটায় এবং আমাদেরকে অনেক বার্তা দিয়ে যায়। প্রতিটা দেশের সিনেমারই কিছু নিজস্ব ধাঁচ আছে। এক্ষেত্রে ইরানি সিনেমাগুলো বরাবরই বাস্তবসম্মত এবং শিশুতোষ সিনেমার জন্য বিখ্যাত। ইরানি সিনেমাগুলো হলিউড-বিলউডের বানিজ্যিক সিনেমাগুলোর মত নাচ গানে পরিপূর্ণ নয়।তারপরেও শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অদ্ভুত এক সম্মোহনী মায়া দিয়ে সিনেমাগুলো দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখে। জীবনের ছোঁয়া থাকে ষোল আনা। কোনো একটা ঘটনা বা আবেগঘন মুহূর্ত হঠাৎ করেই আপনাকে নিয়ে যাবে আপনার শৈশবে বা মনে করিয়ে দেবে কৈশোরের কোন স্মৃতি।

যে ছবি দেখে কান্না করা যায় বা কান্না চলে আসে, ‘বারান’ তেমনই একটি ছবি। সিনেমাটি আমাদের কিশোর বয়সের অকৃত্রিম ভালবাসার কথা মনে করিয়ে দেবে। ইরানি এ ছবিটি পরিচালনা করেছেন সে দেশের বিখ্যাত পরিচালক মাজিদ মাজিদি। ছবিটি না দেখলে বোঝানো যাবে না কত সুন্দর ব্যাথা অনুভব করা যায় বুকের মধ্যে। ছবিটির Cinematography (দৃশ্যায়ন), Acting (অভিনয়), Direction (নির্দেশনা) বলার অপেক্ষা রাখে না অসাধারণ।

প্রথমেই একটি কথা স্বীকার করে নিই, ছবিটা শুরু হওয়ার আগেই আমি এটাকে পছন্দ করেছিলাম। ইরানী শব্দ ’বারান’ এর অর্থ বৃষ্টি। যে ছবির নামের সাথেই বৃষ্টি শব্দটি জুড়ে আছে, তাকে ভালো না বেসে উপায় কি! ১৭ বছর বয়সী লতিফ ইরানের এক কন্সট্রাকশন সাইটে কাজ করে। চা বানানো, ফুট-ফরমাস খাটাই তার কাজ।

তার সাথে প্রায়ই ওখানকার শ্রমিকদের সাথে ঝগড়া হয় । এর মধ্যেই সেই কন্সট্রাকশন সাইটে রাহমাত নামে আরেকটি ছোট্ট বালক আসে কাজের জন্য। কিন্তু একদিন সিমেন্টের ভারী বস্তা বহন করে উপরে নিয়ে যাওয়ার সময় সে দুর্ঘটনা ঘটায়। এরপর তাকে ওসব কাজ থেকে সরিয়ে দেয়া। লতিফকে রাহমাতের কাজে লাগানো হয়। এতে লতিফ রাহমাতের উপর ক্ষিপ্ত হয়। কারন এখন তাকে অনেক কাজ করতে হবে। এজন্য সে বিভিন্ন সময় রাহমাতকে আক্রমণ করার চেষ্টা করে এবং সারাক্ষণ তার পেছনে লেগে থাকে ।

এদিকে রাহমাতের রান্না এবং কাজে সবাই সন্তুষ্টি প্রকাশ করতে থাকে । এটা লতিফকে আরও ক্ষুব্ধ করে তোলে । কিন্তু একদিন হঠাত করেই লতিফ আবিস্কার করে রাহমাত আসলে কোনো ছেলে নয় সে একজন মেয়ে । মেয়েটির নাম বারান । এরপর থেকে লতিফের মধ্যে অনেক পরিবর্তন দেখা দেয় এবং বিভিন্নভাবে সে বারানকে বিপদ থেকে রক্ষা করার চেস্টা করে।

এভাবে লতিফ একদিন বারানের প্রেমে পড়ে গেল। কিন্তু সবে ১৪ পার হওয়া বারানের জীবনে প্রেমের জন্য সময় ও সুযোগ কোনোটাই নেই। একে তো সে আফগান শরণার্থী, যাদের ইরানে কাজের অনুমতি নেই। তার উপর বারানের পরিবারে সে-ই একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার আগেই বারানের সাথে লতিফের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। স্মৃতি হিসেবে লতিফের কাছে রয়ে গেল বারানের চুলের একটি ক্লিপ। নিজের অসীম ভালোবাসা আর সেই চুলের ক্লিপ নিয়ে বারানের সন্ধানে নামল লতিফ।

ভাগ্যচক্রে একসময় বারানকে খুঁজেও পেলো। জানতে পারল, অভাব-অনটনে কোণঠাসা বারানের পরিবার আফগান মুলুকে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু দেশে ফেরার মতো পর্যাপ্ত অর্থ তাদের কাছে নেই। ত্রাণকর্তার ভূমিকায় এগিয়ে এল লতিফ। নিজের চেষ্টায় নিজের সবচেয়ে ভালোবাসার মানুষটিকে দূরে পাঠানোর ব্যবস্হা করল সে। এক বৃষ্টি ভেজা সকালে ইরান ছেড়ে নিজ দেশের পথে যাত্রা করলো বারান। ফেলে গেলো লতিফ আর তার সমস্ত স্মৃতিকে। যদি কখনো কাঁদতে মন চায় বা ইচ্ছে করে তাখন এই সিনেমাটা দেখা যেতে পারে।

এক নজরে বারান

নির্মাণ: ২০০১

পরিচালক এবং লেখক: মাজিদ মাজীদি

অভিনয়ে: হুসাইন আবেদিনি, যাহ্রা বাহরামী , মোহাম্মাদ আমির নাজি, আব্বাস রাহিমি এবং আরও অনেকে

পুরস্কার ও স্বীকৃতি: সিনেমাটি মন্ট্রিল ওয়ার্ল্ড ফিল্ম পুরস্কার, গিজন আন্তর্জাতিক পুরস্কার, শিকাগো আন্তর্জাতিক পুরস্কারসহ মোট ১৩ টি আন্তর্জাতিক এবং জাতীয় পুরস্কার জয় করেছে । এছাড়াও আরও ৫ টি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে ।

 

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *