বগুড়ায় আলুর কেজি এখন ৭ টাকা

বাংলাদেশ

(বগুড়া, বাংলাদেশ) ৭ টাকা কেজি দরে আলু পাওয়া যাচ্ছে এখন বগুড়ায়। তারপরও নেই ক্রেতা। দাম না মেলায় ক্ষেত থেকেই আলু তুলছেন না অনেক কৃষক। গত বৃহস্পতিবার খোলাবাজারে পাকড়ি (লাল) আলুর দাম কেজি প্রতি ১৫/১৬ টাকায় নেমে আসে। হাটে সেই আলু আরো কমে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা প্রতি মণ বিক্রি হয়েছে। আর সাদা হল্যান্ডার স্টিক বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৪৫০ টাকা। আর গ্রানোলা জাতের আলুর দাম ছিল প্রতি মণ মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সেই হিসেবে এই আলুর দাম পড়েছে মাত্র ৭ টাকা ৫০ পয়সা কেজি।

হাটের চিত্রের চেয়ে মাঠের চিত্র আরও খারাপ। মাঠের কৃষক আলুর দাম পাচ্ছে সর্বোচ্চ ১০ টাকা কেজি। এবার ফলন ভালো হওয়ার সুবাদে হাটে আলুর স্তুপ। কিন্তু একে তো দাম কম, তার ওপর ক্রেতার অভাবে ওই আলু বিক্রি করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় অনেক কৃষক ক্ষেত থেকেই আলু তুলছেন না। সপ্তাহ জুড়ে ঘুরে মিলেছে মাঠের এ চিত্র।

বগুড়ায় মোট সবজি আবাদের ৫০ শতাংশ এলাকা এখন আলুর দখলে। বগুড়ার চন্ডীহারার কৃষক আব্দুল মানিক, মোকামতলা বাজার এলাকার সবুর সওদাগর, নয়মাইল বাজারের মিনহাজ উদ্দিন ও শেরপুরের আকবর মিয়া জানান, বাজার পরিস্থিতি দেখে ক্ষেত থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছি। এখন আলু তুললে লসে বিক্রি করতে হবে। আবার দেরিতে তুললে পরবর্তী ফসল চাষ বিঘ্নিত হবে। যে কারণে আমরা পড়েছি উভয় সংকটে।

এদিকে, এখনও বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহ রয়েছে। কমছে না ঘন কুশায়াও। আবহাওয়া ক্রমেই চলে যাচ্ছে আলু চাষিদের প্রতিকূলে। জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে রোগবালাই। অথচ এখন মাঠে পড়ে রয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ আলু। কৃষি বিশেষজ্ঞ বজলুর রশিদ বলেন, গাছ শুকিয়ে যাওয়ার পর আলু না তুললেও অন্তত ১৫ দিন মাটিতে আলু ভালো থাকবে। ওই কয়েক দিনে বাজার কিছুটা চাঙা হতে পারে। বগুড়ার পাইকারি আলুর বাজার কত দিন এমন মন্দা থাকবে তা নিয়ে কৃষি ও কৃষি বিপণন দপ্তরের কর্মকর্তারা স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি।

কৃষকরা জানান, এ সময়ে মূলত পাকড়ি (লাল) প্রজাতির আলুর ফলন হয়। বৃহস্পতিবার মহাস্থান হাটে ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা মণ দরে ওই আলু বিক্রি হয়েছে। সাদা হলেন্ডার স্টিক বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৪৫০ টাকা। আর গ্রানোলা জাতের আলুর দাম ছিলো প্রতি মণ মাত্র ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। সেই হিসেবে এই আলুর কেজি হাটে পড়ে মাত্র ৭ টাকা ৫০ পয়সা কেজি।

যদিও এক কেজি পাকড়ি প্রজাতির আলুর উৎপাদন খরচ প্রায় ১০ টাকা। সঙ্গে আন্যান্য খরচ আরো ২ টাকা যোগ হবে। হাটের এই দামও যদি কৃষক পেত তাহলে লাভ হবার কথা। কিন্তু জমিতে ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা মণের বেশি দাম পাওয়া দুষ্কর।

বগুড়া, শিবগঞ্জ, মোকামতলা, শেরপুর, শাজাহানপুর ও কাহালু এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চারদিকে শুধু আলু আর আলু। তার পরও আলু চাষিরা হতাশ। তাদের চেহারায় শঙ্কার ছাপ। ভরা মৌসুমে বাজারে আলুর দাম নেই। খুচরা বাজারে যে আলুর কেজি ১৮ টাকা, সেই আলু ক্ষেতে বিক্রি হচ্ছে ৮ থেকে ১০ টাকা দরে। এর পরও হাটে ক্রেতা নেই। বোরো ধান লাগানোর আগে আলু চাষ করেছিলেন এ অঞ্চলের ৯৯ শতাংশ কৃষক। আশাতীত ফলনের পর এখন উৎপাদন খরচ ওঠা নিয়েই শঙ্কিত তারা।

মাটির গুণগত মানের কারণে উত্তরের অন্যান্য জেলার চেয়ে বগুড়ায় আলুর ফলন বেশি হয়। পুরো উত্তরাঞ্চল মিলে আলুর যা ফলন হয়, তার প্রায় দ্বিগুণ হয় বগুড়ায়। এ তথ্য কৃষি বিভাগের। পাশের জয়পুরহাটেও আলুর ফলন ভালো হয়। এ কারণে এ অঞ্চলে গড়ে উঠেছে অনেক হিমাগার। বগুড়া থেকে আলু কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যান পাইকাররা। অনেকে আলু কিনে পাশেই হিমাগারে সংরক্ষণ করেন পরবর্তী সময় বেশি দামে বিক্রির জন্য। মৌসুমী ব্যবসায়ীরাও আলু কিনে মজুত করেন এসব হিমাগারে।

বগুড়ার মোকামতলা এলাকায় কৃষক আব্দুর রহমান প্রতি বছর জমিতে আলু চাষ করেন। তার মতে, গত বছর বাজার ভালো ছিল। তাই এবার আলু চাষির সংখ্যা ও জমির পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু এবার শুরু থেকেই আলুর বাজার ঝুলে গেছে। এ কারণে এখন তাদের মাথায় হাত।

তিনি জানান, এক বিঘা জমিতে আলু চাষ করতে ১৫/১৬ হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুর দাম পড়েছে প্রায় ১০ টাকা। সেই আলু এখন বাজারে বিক্রি করতে হচ্ছে বিনা লাভে। এখন ইচ্ছা করলেই হিমাগারে আলু রাখারও উপায় নেই।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এবার উত্তরের ১৬ জেলায় তিন লাখ ৩৪ হাজার ৩৩ হেক্টর জমিতে আলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩২ লাখ ৯০ হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধু বগুড়ায় ৬০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৯ মেট্রিক টন। কিন্তু এ পরিমাণের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ আলু বেশি উৎপাদন হয়েছে। এত আলু আগে কখনো উৎপাদন হয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *