পাক-ভারত সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে ইসরাইল: রবার্ট ফিস্ক

অন্যান্য লিড নিউজ

(লন্ডন, ব্রিটেন) ‘পাক-ভারত উত্তেজনার পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে ইসরাইল। নয়াদিল্লির ওপর ইহুদিবাদী ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের ফলেই সম্প্রতি পাক-ভারত উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে।’ এ কথাগুলো বলেছেন ব্রিটেনের খ্যাতনামা সাংবাদিক রবার্ট ফিস্ক। ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্টে বৃহস্পতির প্রকাশিত এক নিবন্ধে এ সব কথা বলেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘পাক-ভারত সাম্প্রতিক গোটা সংঘর্ষ জুড়ে ইসরাইলের প্রভাব নজরে পড়ছে।’

এই ব্রিটিশ সাংবাদিক বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধাভিযানের সংবাদ সংগ্রহ এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে তা পরিবেশনার জন্য। ফিস্ক আরও বলেন, ভারতের হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে বিরাজমান মুসলমান বিরোধী চেতনাকে পুঁজি করতে চাইছে ইসরাইল। নয়াদিল্লির কাছে আরো অস্ত্রশস্ত্র বিক্রির লক্ষ্য নিয়ে এমনটি চাইছে তেল আবিব। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর করতে এবং পাক-ভারত সম্পর্ককে আরো উত্তেজনার দিকে ঠেলে দিতেও তৎপর রয়েছে ইসরাইল।

মঙ্গলবার পাক ভূখণ্ডের ওপর চালানো হামলায় ইসরাইলের তৈরি স্পাইস-২০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথাও তুলে ধরেন ফিস্ক। তিনি বলেন, এ সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন দখলদার ইসরাইল যে লাভের অংক গুনছে এটি তার পরিষ্কার প্রমাণ।

২০১৭ সালে ইসরাইলি অস্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ভারত সে কথাও উল্লেখ করেছেন ফিস্ক। ইসরাইলি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনতে ভারত ব্যয় করেছে ৭০ কোটি ডলার। ফিলিস্তিন এবং সিরিয়ায় এ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করেছে ইসরাইল । আর এতে এ ব্যবস্থার ধ্বংস ক্ষমতা ভারত সরকারকে প্রদর্শন করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রবার্ট ফিস্কের পরিচয়

এই ব্রিটিশ সাংবাদিক বিশ্বজুড়ে খ্যাতি লাভ করেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন যুদ্ধাভিযানের সংবাদ সংগ্রহ এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে তা পরিবেশনার জন্য। ফিস্কের  সাংবাদিকতার যাত্রা শুরু হয় কৈশোরেই। মাত্র ১২ বছর বয়সেই তিনি রিপোর্টার হওয়ার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেন। ছাত্রজীবন থেকেই সাংবাদিকতা শুরু করেন ফিস্ক। প্রথমে ‘সানডে এঙ্প্রেস’র ডায়েরি কলামে লেখালেখি করতেন। পরবর্তীতে তিনি যোগ দেন ‘দ্য টাইমসে’।

রবার্ট ফিস্ক

১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত টাইমসের বেলফাস্ট প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন তিনি। এরপর পর্তুগালের কারনেশন (সাদা বা গোলাপি) বিপ্লব কভার করতে চলে যান। তারপর তাকে মধ্যপ্রাচ্য সংবাদদাতা নিয়োগ করা হয়। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন ফিস্ক। এরপর তার ঠিকানা হয় দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট পত্রিকায়। ১৯৮৯ সালের ২৮ এপ্রিল ইন্ডিপেনডেন্টে তার প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ পায়। তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘটনা ও বিষয় নিয়ে সংবাদ সরবরাহ করে খ্যাতি লাভ করেন।

যেসব যুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে তিনি বিশ্ববাসীর কাছে সম্মানের পাত্র হন তার মধ্যে রয়েছে লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন (১৯৭৮-৮২), ইরানের বিপ্লব (১৯৭৯), ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮), আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসন (১৯৮০), উপসাগরীয় যুদ্ধ (১৯৯১)। ২০০৮ খ্রিস্টাব্দ অবধি তিনি ৩২ বছরে কমপক্ষে ১১ যুদ্ধক্ষেত্র থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। একুশ শতাব্দীর প্রথম দশকে তিনি সাংবাদিক নিরপেক্ষতার প্রতীকে পরিণত হন।

নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও সাহসিকতার জন্যই তিনি সমধিক খ্যাত। তিনি বহুল আলোচিত ও বিতর্কিত ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন একাধিকবার। তিনিই একমাত্র বিদেশি সাংবাদিক যিনি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনবার ওসামা বিন লাদেনের সাক্ষাৎকার নিতে সক্ষম হন। তিনি যুদ্ধ সাংবাদিকতায় অসামান্য অবদান রাখায় পেয়েছেন অসংখ্য পুরস্কার। তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছেন।

অ্যাওয়ার্ড ও সম্মাননা

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ১৯৯৮ সালে দিয়েছে ওভার অল মিডিয়া অ্যাওয়ার্ড। সাতবার তাকে দেওয়া হয়েছে ব্রিটিশ ইন্টারন্যাশনাল জার্নালিস্ট অব দ্য ইয়ার অ্যাওয়ার্ড। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি জাতিসংঘ প্রেস অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার জন্য ১৯৯৬ সালে তাকে জন্স হপকিনস সিআইএএস-সিআই পুরস্কার দেওয়া হয়। যুদ্ধের নিউজ কভার করতে গিয়ে বহুবার হুমকির মুখে পড়েছেন ফিস্ক। আহতও হয়েছেন প্রথিতযশা এই সাংবাদিক।

ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় আর্টিলারির আঘাতে আহত হলে তার শ্রবণশক্তি অনেকাংশে নষ্ট হয়ে যায়। এ ছাড়া বিদেশি গুপ্তচর সন্দেহে দুবার অপহরণ চেষ্টার হাত থেকে বেঁচে যান তিনি। আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় পাকিস্তানে অবস্থানকালে আফগান শরণার্থীরা তাকে পিটিয়ে আহত করেছিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *