ভারতের লোকসভা নির্বাচনে খরচ হবে ৩০০০ কোটি ডলার!

ভারত

(নয়াদিলি­, ভারত) ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশই নয়। দেশটির লোকসভা নির্বাচন বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনও বটে। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না। বরং খরচের দিক দিয়ে আগের সব রেকর্ড ভেঙে যাবে। খরচের বেশিরভাগটাই হবে প্রচার ও প্রচারণা খাতে।

হাড্ডাহাড্ডি লড়াই যাকে বলে তাই হবে এবারের নির্বাচনে। তাই খরচের হাত খাটো করবে না কোনো দলই। নির্বাচন কমিশনের তথ্য মতে, মোট ৭০০ কোটি ডলার (৫ হাজার কোটি রুপি) খরচ করবে দলগুলো। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি র‌্যালি-সমাবেশ, পরিবহন ও ভোট কেনার খরচ ধরা হয় প্রকৃত অংকটা প্রায় ৩০০০ কোটি ডলার ছোবে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যেখানে খরচ হয়েছিল ৬৫০ কোটি ডলার।

খরচের এ হিসাব কখনোই প্রকাশ্যে আসে না। দেশটির আইনে প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়সীমা থাকলেও দলগুলোর প্রচার ব্যয়ে লাগাম টানার উপায় নেই। ভারতের ২০১৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছিল। দিলি­ভিত্তিক গণমাধ্যম বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর মিডিয়া স্টাডিজের মতে, এবার তার তুলনায় খরচ ৪০ শতাংশ বাড়ছে। এর ফলে ভোটারপ্রতি খরচ হবে প্রায় ৮ ডলার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির ৬০ শতাংশ লোকই দিনে ৩ ডলার আয় করে।

সিএমএসের চেয়ারম্যান এন ভাস্কর রাও বলেছেন, ‘বাড়তি খরচের বেশিরভাগই হবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভ্রমণ ও বিজ্ঞাপনে।’ রাও জানান, নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয়ের পরিমাণে নাটকীয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে। ২০১৪ সালে এ খাতে আড়াইশ কোটি রুপি খরচ হলেও এবার সেখানে ৫ হাজার কোটি রুপি খরচ হতে পারে।

মাঠ পর্যায়ের সাক্ষাৎকার, সরকারি তথ্য, বিভিন্ন চুক্তি ও অন্যান্য গবেষণা থেকে এবার হেলিকপ্টার, বাস ও অন্যান্য যানবাহনে প্রার্থী ও দলীয় কর্মীদের ভ্রমণ ব্যয় বাড়বে। ভারতের নির্বাচন পর্যবেক্ষক কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সাইমন চৌচার্ডের মতে, সংসদীয় আসনের আকার ও প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ায় খরচ আগের তুলনায় বাড়ছে।

ভোট পেতে নগদ অর্থ ও উপহার সামগ্রী প্রদান
এবার ৫৪৫ টি আসনের বিপরীতে লড়ছেন ৮ হাজারের বেশি প্রার্থী। ভোটারদের মন জয়েও তাই চরম প্রতিযোগিতা। গোপনে নগদ অর্থের পাশাপাশি উপহার সামগ্রী প্রদানের ব্যাপক চল রয়েছে। বার্কলের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক জেনিফার বাসেলের গবেষণায় ভারতের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের ৯০ শতাংশ রাজনীতিক বলেছেন, ভোটারদের টাকা, মদ ও অন্যান্য জিনিসপত্র ঘুষ হিসেবে দেয়ার প্রবল চাপ অনুভব করেন।

ভোটে জিততে কোনো কোনো এলাকার প্রার্থীরা ভোটারদেরকে টাকার পাশাপাশি ব্লেন্ডার, টেলিভিশন এমনকি কখনো কখনো ছাগলও ঘুষ দেয়। গত বছর কর্নাটকে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সময় ভারতের নির্বাচন কমিশন বিপুল পরিমাণ নগদ রুপি, মদ ও মাদক উদ্ধার হয়েছিল।

নেতা-কর্মী-সমর্থকদের বিরিয়ানি খাওয়ানো
নির্বাচনের সময় যত ভাল করে সম্ভব প্রচারণা সমাবেশ করায় ব্যাপক আগ্রহ থাকে প্রার্থীদের। সমাবেশে লোক টানতে বিরিয়ানি কিংবা চিকেনকারিসহ দামি খাবার দেয়া হয়। সমাবেশে লোকজনকে আনা নেওয়া, নিরাপত্তা, মাইক্রোফোন, চেয়ার ও আতশবাজীর জন্য যে বিপুল পরিমাণ খরচ করতে হয় তাও বলার অপেক্ষা রাখে না।

ডামি প্রার্থীর পেছনে ব্যয়
ভারতের নির্বাচনে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে অনেক সময়ই বিরোধী প্রার্থীরা জনপ্রিয় প্রার্থীদের বিপক্ষে একই নামধারী ‘ডামি প্রার্থী’ দাঁড় করিয়ে দেয়। ২০১৪ সালের নির্বাচনেও উত্তর প্রদেশে জনপ্রিয় অভিনেত্রী হেমা মালিনীর বিরুদ্ধে আরও দুই হেমা মালিনীকে দাঁড় করানো হয়েছিল। এ ধরনের ‘ডামি প্রার্থী’ দেয়ার ক্ষেত্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যয় ১২ কোটি রুপি পর্যন্ত হয় বলেও ২০১৬ সালে ইন্ডিয়া টুডে ম্যাগাজিনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল।

প্রার্থীর ব্রান্ড তৈরিতে ব্যয়
নির্বাচনে প্রধান দুই দলের কেবল গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন বাবদই দুই হাজার ছয়শ কোটি রুপি খরচ হবে বলে অনুমান করছে টেলিভিশন ও সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের স্লট বরাদ্দ দেওয়া প্রতিষ্ঠান জেনিথ ইন্ডিয়া। আগের নির্বাচনে এ ব্যয় ছিল অর্ধেকেরও কম, মাত্র এক হাজার দুইশ কোটি রুপি। ফেব্রুয়ারিতে কেবল ফেইসবুকেই রাজনৈতিক বিজ্ঞাপন বাবদ ভারতীয় দল ও প্রার্থীদের ৪ কোটি রুপির বেশি খরচ হয়েছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিষ্ঠানটির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *