দেশে দেশে জনগণের ওপর বাড়ছে কতৃত্ববাদী সরকারগুলোর ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি

অন্যান্য লিড নিউজ

দেশে দেশে জনগণের ওপর বাড়ছে কতৃত্ববাদী সরকারগুলোর ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি। ভিন্নমত ও সরকারবিরোধী সমালোচনা থামিয়ে দিতে নতুন ধরনের এ গুপ্তচরবৃত্তির সহায়তা নেয়া হচ্ছে। এতে ব্যবহার করা অত্যাধুনিক ও উচ্চ প্রযুক্তি। এখানেই শেষ নয়। এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নজরদারিতে রেখে একসময় গুম কিম্বা হত্যা করা হচ্ছে। এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের বড় দৃষ্টান্ত ওয়াশিংটন পোস্টের সাংবাদিক সৌদি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক জামাল খাসোগি। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এসব তথ্য।   

দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্নমতের বিরুদ্ধে দমন অভিযান চলছে সৌদি আরবে। যাকে এই অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হয়, সে সৌদি সরকারের জন্য হুমকি এমন প্রত্যেক ব্যক্তির পেছনে গুপ্তচর নিযুক্ত করে। আর এজন্য সে একটি গোপন ইসরাইলি প্রযুক্তি কোম্পানির সহায়তা নেয়। গুপ্তচরবৃত্তির কাজে এই কোম্পানিটি তাদের প্রযুক্তি দিয়ে সৌদি আরবকে সহায়তা করে।

২০১৭ সালের শেষের দিকে সৌদি আরবের প্রভাবশালী যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সলামানের তৎকালীন শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা সৌদ আল কাহতানি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে অবস্থানরত সৌদি সরকারের সমালোচকদের অবস্থান শনাক্ত করেন। এটা ছিল তার সুবিস্তৃত নজরদারির অংশ। যার চুড়ান্ত ফল হিসেবে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সৌদি সরকারের সমালোচকদের ওপর এই নজরদারির কাজে কাহতানিকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেয় ইসরাইলের প্রযুক্তি কোম্পানি এনএসও গ্রুপ।

ওই কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তার সঙ্গে আল কাহতানির যোগাযোগ গড়ে ওঠে। তিনি এনএসও গ্রুপের প্রযুক্তি ব্যবহার করে তুরস্ক, কাতার, ফ্রান্স ও ব্রিটেনসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে দেশগুলোতে নজরদারি করার পরিকল্পনার কথা জানান। ইসরাইলি প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর সৌদি সরকারের এই নির্ভরতা বৈশ্বিক যুদ্ধবিগ্রহে একটি নতুন যুগের ইঙ্গিত দেয়। আর তা হচ্ছে ডিজিটাল যুদ্ধ। এর মূল উপকরণ প্রযুক্তি।

এই যুদ্ধে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ বা দক্ষ প্রযুক্তিবিদরাই যোদ্ধার ভূমিকা পালন করে। বর্তমান বিশ্বে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তি বা প্রযুক্তি ভাড়া দেয়ার এই বাজারের মূল্য প্রায় ১২০০ কোটি ডলার। আগে এই প্রযুক্তি পাওয়া কঠিন হলেও বর্তমানে  এগুলো বেশ সহজলভ্য হয়ে উঠেছে। এখন বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশটিও অর্থের বিনিময়ে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির সেবা কিনতে পারে। এর ফলে তারা টেলিফোনে আড়ি পাতাসহ বিভিন্ন অত্যাধুনিক গুপ্তচরবৃত্তির সক্ষমতা লাভ করে। এতদিন শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিদের হাতে ছিল।

নিউইয়র্ক টাইমস এই ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল যুদ্ধ নিয়ে মাসব্যাপী অনুসন্ধান করেছে। এতে ডিজিটাল যুদ্ধে বিভিন্ন গোষ্ঠীর গোপন লড়াই সামনে উঠে এসেছে। বর্তমানে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে শুধু সন্ত্রাসী ও মাদক চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত সংগঠনগুলোর তথ্য জানতে সহায়তা করছে এমন না। অনেক সময় এসব প্রতিষ্ঠানকে অসৎ উদ্দেশ্যেও ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকার এসব প্রযুক্তিকে বিভিন্ন অধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো থেকে প্রশিক্ষণ নেয়া হ্যাকাররা আমেরিকান ব্যবসায়ী ও মানবাধিকারকর্মীদেরকেই তাদের জালে আটকাচ্ছে।

এনএসও এবং এর আমিরাতী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠান ডার্ক ম্যাটার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ঘটনাবলী বিশ্বব্যাপী বেসরকারি গুপ্তচরবৃত্তির ব্যাপক বিস্তারের বিষয়টি ফুটে ওঠে। ডার্কম্যাটারের প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা সম্প্রতি খুবই সাধারণ একটি ‘বেবি মনিটর’কে গুপ্তচরবৃত্তির উপকরণে পরিণত করেছেন। সম্ভাব্য সাইবার অপরাধের আশঙ্কায় এই প্রতিষ্ঠানের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান এফবিআই।

তদন্ত প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত অন্তত চারজন ব্যক্তি এ তথ্য জানিয়েছেন। ডার্কম্যাটারে কর্মরত একজন মার্কিন হ্যাকার  তার প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। তিনি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইএর সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদেরকে ডার্কম্যাটারের কর্মকান্ডের বিষয়ে অবহিত করেন। এর পরেই ডার্কম্যাটারের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে এফবিআই। উল্লেখ্য, ওই কর্মকর্তা পূর্বে মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গোয়েন্দা সংস্থা এনএসএ তে কাজ করতেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তিতে এনএসও ও ডার্কম্যাটার পরস্পরের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তারা ইসরাইল, যুক্তরাষ্টসহ অন্যান্য দেশের শীর্ষ হ্যাকারদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে নিজেদের কাজে লাগায়। কখনো কখনো, এই দুই কোম্পানি একে অন্যের হ্যাকারকেও ভাড়া করে থাকে।

বেসরকারি বা ডিজিটাল গোয়েন্দাবৃত্তির অন্যতম কেন্দ্র হলো মধ্যপ্রাচ্য। ডার্ক ম্যাটার ও এনএসও ছাড়াও এই অঞ্চলে ব্ল্যাক কিউব নামের একটি বেসরকারি কোম্পানি রয়েছে। যা মোসাদ ও ইসরায়েলি সেনা গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত হয়। হলিউড মুঘল হার্ভে উইন্সটন এই ব্ল্যাক কিউবকে তার সমালোচনাকারীদের বিরুদ্ধে নিযুক্ত করেছিলেন। এর পরেই ব্ল্যাক কিউবের বিষয়টি আলোচনায় আসে।

সাই গ্রুপ নামের একটি ইসরায়েলি প্রযুক্তি কোম্পানি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এটি ২০১৬ সালে ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারণাসহ বিভিন্ন সময়ে রুশ সরকারের পক্ষে কাজ করেছে। গত বছর মার্কিন ধনকুবের ইলিয়ট ব্রয়ডি তার ব্যক্তিগত মেইল প্রকাশ করার দায়ে কাতার সরকার ও নিউইয়র্ক ভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবি করেন, ওই মেইল প্রকাশ করে কোম্পানিটি তার শর্ত লঙ্ঘণ করেছে।

ব্রয়ডি আরও বলেন, ভূ-রাজনৈতিক রাজনীতির অংশ হিসেবে তার ওই মেইল প্রকাশ করা হয়েছে। কেননা ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি কাতার-বিরোধী নীতি গ্রহণ করার জন্য হোয়াইট হাউজের ওপর চাপ দিয়েছিলেন। ওই সময়ে কাতারের প্রতিদ্বন্দ্বী আরব আমিরাত থেকে শতশত মিলিয়ন ডলারের কাজ পায় ব্রয়ডির প্রতিষ্ঠান। তবে বিচারক ব্রয়ডির অভিযোগ খারিজ করে দেন। এর পর কাতারের বিরুদ্ধে সন্দেহ আরো বাড়তে থাকে। ধারণা করা হয়, ওয়াশিংটনে নিযুক্ত আমিরাতের রাষ্ট্রদূত ইউসেফ আল ওতাইবার ইমেইল হ্যাক ও ফাস করার কাজে কাতারের হাত থাকতে পারে।

বিশ্বব্যাপী এই ডিজিটাল যুদ্ধের দ্রুত বিস্তার একটি বিপজ্জনক ও বিশৃঙ্খল ভবিষ্যতের সতর্কবার্তা দেয়। যেখানে সাইবার যোদ্ধারা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যাডলুমিন এর প্রতিষ্টাতা রবার্ট জনসন বলেন, এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে ছোট দেশটিও খুব কম অর্থ খরচ করে আক্রমণের সক্ষমতা অর্জন করে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অনলাইন যুদ্ধ শুরু করতে পারে। এখন কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এই যুদ্ধে পরস্পরকে ধাওয়া করছে। আর এই যুদ্ধ ক্রমেই খুব ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *