ব্রেক্সিট ইস্যুতে টালমাতাল ব্রিটিশ রাজনীতি ; ক্ষমতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জে তেরেসা মে

ইউরোপ লিড নিউজ

(লন্ডন, যুক্তরাজ্য) ব্রেক্সিট ইস্যুতে ক্রমশ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের প্রধানমন্ত্রীপদ। তিনি ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ব্রিটিশ বিভিন্ন গণমাধ্যম বলছে, তার মন্ত্রীপরিষদের ভিতরেই অসন্তোষ শুরু হয়েছে। তারা তাকে সরিয়ে দিয়ে নতুন কাউকে ক্ষমতায় আনতে চাইছেন। এক্ষেত্রে পছন্দের তালিকায় রয়েছেন তেরেসা মের ডেপুটি ডিভিড লিডিংটন এবং পরিবেশ বিষয়কমন্ত্রী মাইকেল গভ।

তবে আপাতত এ দু’জন এমন সম্ভাবনার কথা উড়িয়ে দিয়েছেন। তেরেসা মের প্রতি আস্থা প্রকাশ করেছেন মাইকেল গভ ও লিডিংটন। মাইকেল গভ বলেছেন, ‘জাহাজের ক্যাপ্টেনকে পরিবর্তনের সযোগ নেই’। অন্যদিকে ডেভিড লিডিংটন বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের প্রতি তার শতভাগ আস্থা রয়েছে। কিন্তু মিডিয়া যেসব খবর দিচ্ছে তাতে তেরেসা মের কপালে দুশ্চিন্তার ভাজ পড়ারই কথা।

অনলাইন স্কাই নিউজ লিখেছে, ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এমপিরা চাইছেন ব্রেক্সিট ইস্যুতে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের কাছে নিতে। এমন এক উত্তেজনাকর অবস্থায় কঠিন একটি সপ্তাহে যাত্রা শুরু করছে বৃটেন। রোববার বিকেলে তাই প্রধানমন্ত্রী উদ্ভুত সমস্যার বিষয়ে তার কান্ট্রি হাউজ বলে পরিচিত চেকারস-এ নিজ দল কনজার্ভেটিভের সদস্যদের নিয়ে বৈঠক করেছেন, যেন তারা তার ব্রেক্সিট চুক্তিকে স্বাগত জানান, সমর্থন দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ব্রেক্সিটপন্থি ব্যাকবেঞ্চার হিসেবে পরিচিত সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন, জ্যাকব রিস-মগ ও ডেভিড ডেভিস।

এই বৈঠকের সফলতা কতটুকু অর্থাৎ তিনি সদস্যদের কতটুকু আস্থায় আনতে পেরেছেন সে বিষয়ে তার অফিস থেকে কোনো ইঙ্গিত মেলে নি। তবে বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এমপিরা আলোচনা করেছেন, ব্রেক্সিট ইস্যুতে তেরেসা মে পার্লামেন্টে যে পরিকল্পনা তৃতীয়বার ভোটে আনবেন তাতে পর্যাপ্ত সমর্থন আছে কিনা তা নিয়ে। এর আগে তেরেসা মে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, যদি তিনি দেখেন তার তৃতীয় দফা পরিকল্পনায়ও পর্যাপ্ত সমর্থন পাবেন না তাহলে হয়তো তিনি তা পার্লামেন্টের সামনে উপস্থাপন নাও করতে পারেন।

রোববার পত্রিকাগুলো জানিয়েছে, মন্ত্রীপরিষদে একটি অভ্যুত্থান চেষ্টা চলমান। তাতে প্রধানমন্ত্রী কবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিচ্ছেন সে বিষয়ে চাপ প্রয়োগকারী এমপিদের সংখ্যা বাড়ছে বলে রিপোর্টে বলা হয়। এমন অবস্থায় তার ব্রেক্সিট চুক্তি যদি অনুমোদন না পায় পার্লামেন্টে, তাহলে তেরেসা মে আরো অবমাননার মুখে পড়বেন এবং তার ওপর চাপ আরো বৃদ্ধি পাবে।

এ সপ্তাহে ব্রেক্সিট চুক্তির বেশ কিছু সংশোধনীর ওপর ভোট দেয়ার কথা রয়েছে এমপিদের। এসব সংশোধনী অনুমোদন পেলে ব্রেক্সিট সম্পাদন সহজ হয়ে উঠতে পারে। তবে কনজার্ভেটিভ পার্টির সাবেক মন্ত্রী স্যার অলিভার লেটউইন ও ডোনিক গ্রিয়েভ, বিরোধী লেবার দলের হিলারি বেন মিলে একটি প্রস্তাব সামনে আনছেন। তার অধীনে সরকারের কাছ থেকে কেড়ে নেয়া হতে পারে পার্লামেন্টের নিয়ন্ত্রণ। এর ফলে ব্রেক্সিট সম্পাদনের কর্তৃত্বও সরকারের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে।

ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী স্টিভ বারক্লে এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেছেন, এমন উদ্যোগ নেয়া হলে তাতে সাংবিধানিক সঙ্কট দেখা দিতে পারে এবং একটি জাতীয় নির্বাচনের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাবে।  ইতিমধ্যে বরিস জনসন বলেছেন, তেরেসা মেকে সমর্থন দেয়ার আগে তাকে প্রমাণ দেখাতে হবে যে ব্রেক্সিট নিয়ে দর কষাকষির পরবর্তী ধাপগুলো হবে ভিন্ন।

এ বিষয়ে বরিস জনসন টেলিগ্রাফ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘যদি তিনি (তেরেসা মে) এমন পরিবর্তনের প্রমাণ দিতে না পারেন, তাহলে তার উচিত হবে এই চুক্তি থেকে সরে আসা এবং ব্রাসেলস ফিরে যাওয়া। তার আরও উচিত এমন কিছু শর্ত যোগ করা, ব্রেক্সিটপন্থী ও ব্রেক্সিটবিরোধী উভয় পক্ষই বিশ্বাস করে। তিনি আরও লিখেছেন, প্রয়োজন হলে বাস্তবায়নের সময়সীমা ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত বর্ধিত করুন। ব্যবহার করুন মুক্ত বাণিজ্য বিষয়ক সমঝোতা, ফি প্রদানের বিষয় দর কষাকষিতে।

ব্রেক্সিট বিষয়ক মন্ত্রী স্টিভ বারক্লে বলেছেন, যদি সরকার চায় না, এমন কোনো বিষয়ে ব্রেক্সিট ইস্যুতে এই সপ্তাহে এমপিরা ভোট দেন তাহলে নতুন নির্বাচন আসবে। বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে গত সপ্তাহে লিসবন চুক্তির ৫০ অনুচ্ছেদের অধীনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে সময়সীমা বৃদ্ধির আহ্বান জানাতে বাধ্য হন। একই সঙ্গে তিনি ব্রেক্সিট সম্পাদন বিলম্বের জন্য এমপিদের দায়ী করে তার সমলোচনা করেন।

এর আগে তিনি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ব্রেক্সিট নিয়ে দর কষাকষি করে দু’দফা এই প্রস্তাব বৃটিশ পার্লামেন্টের নি¤œকক্ষ হাউস অব কমন্সে উত্থাপন করেন। কিন্তু প্রতিবারই ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়েছেন তেরেসা মে। নতুন করে তিনি এই বিলটি আবার পার্লামেন্টে তুলতে পারেন। এ বিষয়ে তিনি এমপিদের কাছে লিখেছেন। তাতে বলেছেন, যদি তাকে পর্যাপ্ত সমর্থন দেয়া হয় তাহলেই তিনি এই প্রস্তাব উত্থাপন করবেন পার্লামেন্টে। 

এখন উত্তাল একটি সপ্তাহ তেরেসা মের সামনে। এখানে ব্রেক্সিট পক্রিয়ায় তিনি আরো পরাজিত হতে পারেন পার্লামেন্টে। এমন অবস্থায় তার সামনে ৬টি ভিন্ন পথ খোলা থাকতে পারে। তা হল ১. অনুচ্ছেত ৫০ বাতিল করা এবং ব্রেক্সিট প্রক্রিয়া বাতিল করে দেয়া। ২. আরেকটি গণভোটের ডাক দিতে পারেন। ৩. কানাডার স্টাইলে একটি মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি। ৪. কোনো চুক্তি ছাড়াই  ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাওয়া। ৫. প্রধানমন্ত্রীর চুক্তিতে যুক্ত হতে পারে একটি কাস্টমস ইউনিয়ন। ৬. যুক্ত হতে পারে কাস্টমস ইউনিয়ন ও একক বাজার সুবিধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *