সিনেমা রিভিউ: ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ সময়ের এক দুর্দান্ত সাক্ষী হয়ে থাকবে…

সাহিত্য

(শাহনেওয়াজ আরেফিন, ঢাকা) ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’র ব্যাপারে উচ্ছ্বসিত ছিলাম। সত্যি বলতে দেখতে যাবার আগে থেকেই ব্যান্ড পিটানো শুরু করছি। সিঙ্গাপুর ফিল্ম ফেস্টের অ্যাওয়ার্ড, দিস ইজ নট আ জোক, এটা পরিচয়ের সংস্কৃতি! এবং মুভিটা দেখে আমার উচ্ছ্বাস জানলো, এটা ‘লাইফ’ ফ্রম ঢাকা বই অন্য কিছু নয়।

নির্মাতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সা’দ এর প্রধান চরিত্র ‘সাজ্জাদ’ খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। তার প্রতি পদক্ষেপে হতাশা আর পলায়নপরতা। অবশ্য শেয়ারবাজারে ধরা খাওয়া আর এক পা পঙ্গু  হওয়া প্রায় সমার্থক। ধ’রে নেয়া যেতে পারে এটা তারই প্রতীকায়ন।

সেই সাজ্জাদ যদিও দাবি করেন তার ধৈর্য্যের লেভেলটা নবী-রাসুলদের মতো নয়; তারপরও আমরা দেখি শত আঘাতেও কী দারুণ যুদ্ধটা ক’রে যাচ্ছেন তিনি। সেই খোঁড়া পা নিয়ে প্রতি মূহুর্তে যিনি সম্ভাব্য কিছু সাফল্যের সুড়ঙ্গ খোড়েন। ভেতরের ক্রমাগত ভাঙচুর সত্ত্বেও কী চমৎকার ব্যাক্তিত্ত্বের পরিচয়টা দিচ্ছেন অসাধারণ লাগা সাধারণ এক সাজ্জাদ!

রিহ্যাব খাটা ছোটভাই মাইকেলকে শিশুর মতো স্বার্থপর জ্ঞান করেন তিনি। নিজেকে এই ভেবে প্রবোধ দেন, যা করছেন তা মা-বাবার প্রমিজ রক্ষার জন্য আর ছোটভাই-গার্লফ্রেন্ডসহ এক সুন্দর ভবিষ্যতেরই সংগ্রাম। কিন্তু ড্রাগ-অ্যাডিক্ট মাইকেল তাকে ধরিয়ে দেয়, সো কল্ড স্বাভাবিক আপন-পরিজন যা করেন সেটা স্বার্থহীনতার/পরার্থপরতার অভিনয় মাত্র এবং অ্যাডিক্ট হলেও সে ঐ স্বাভাবিকদের মতো কপট নয়।

শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির সেই ট্র্যাজিক রিয়েলিটির যারা ভিক্টিম সা’দ ভাইয়ের সাজ্জাদ চরিত্র তারই প্রতিচ্ছবি। আবার [অনুমান হিসেবে] ফ্রয়েডের ‘উনবেবুস্তা’ বা ‘ দি আনকনশাস’ ধ’রে ব্যাখ্যা করলে, কে জানে..হয়ত শিল্পী সা’দই এখানে সাজ্জাদ হ’য়ে উঠতে চান!

হ্যা, শেয়ারবাজার ও তার অদৃশ্য দরবেশরা সাজ্জাদের প্রায় সর্বস্ব কেড়ে নেয়। যে গার্লফ্রেন্ড রেহানার জন্য তিনি দায়িত্বশীল হইতে চান, সেই রেহানার চোখেই ক্রমশঃ তিনি হ’য়ে ওঠেন আনরিলাইয়েবল; সন্দেহের বাতিকগ্রস্থ একটা অসহ্যকর! তাই শুধু নয়; প্রচণ্ড মানসিক চাপে সাজ্জাদের হ্যালুসিনেশান হয়। কিন্তু একজন স্বনির্ভর শিক্ষিত ছেলের মতোই তিনি সেটাকে ওভারকাম করেন।

প্রায় সব টাকা হারাবার পর অন্ধের যষ্ঠী প্রাইভেট কারটাও তাকে খোয়াতে হয়। সামাজিক অস্থিরতার কোনো এক বিক্ষুব্ধ রাতে না জেনে সেই গাড়ি পুড়িয়ে দেয় তারই এক ঢাবিয়ান কাজিন। আমরা যেমন ভ্রাতৃত্ব ভুলে নিজেরা নিজেদের ঘরে আগুন লাগাই।

এ সিনেমার অন্যতম সুন্দর তিনটা দিক হলো প্রিসিশান, ভঙচঙমুক্ত সাদাকালো স্ক্রিন এবং ঢাকাইয়া শহুরে ভাষা। লেখক/চিত্রনাট্যকার ঠিক যে সমাজের গল্পটা বলতে চান সেটাকে সাবলীল,স্বতঃস্ফূর্তভাবে তুলে আনাই তো কাজ। প্রমিত ভাষার কাঠমোল্লারা হয়ত এতে রাগ করবেন, কিন্তু শিল্প শিল্পের মতোই আগাবে। তাহাকে ধরাবাধা ছাঁচে ধ’রে রাখা যাবে না।

সাথে প্রচলিত মুখ খারাপ ছিলো আরেকটা বিউটিফুল ব্যাপার। মারজুক রাসেল যেমনটা বলেন, গালিই ভাষার গয়না… আর এসবের মধ্য দিয়েই কিন্তু আমরা ‘আমরা’ হ’য়ে উঠি! তবে বসুন্ধরা সিনেপ্লেক্সে এই শো এর অন্যতম ত্রুটি ছিলো সাবটাইটেল না থাকা। আমার ঠিক সামনের সারিতে দু’জন ফরেনারের অস্বস্তি দেখে খুব খারাপ লাগছিলো।

এনিওয়ে, আমরা তথাকথিত ভালোরা আরও সবল হবার জন্য দুর্বলের কাটা ঘায়ে আঘাত করি, ফায়দা নেই। সাজ্জাদের পাওনাদাররাও তেমনি তার খোঁড়া পায়ে আঘাত করে। ইন ফ্যাক্ট, সুদাসল না পাইলে এই অভিশপ্ত বিশ্বটা মানুষকে পথে বসাইতে কার্পণ্য করে না।

ওদিকে বস্তিঘরে প্যাথখোর মাইকেলের মৃত্যুটাও একটা দারুণ মেসেজ দেয়। মূলত শিল্পী এবং মাদকাসক্তরাই সমাজের কষ্টকে ধারণ করে। সাপোজ, কড়াইল বস্তি ঢাকার দুঃখ হ’য়ে থাকলে এর নেশাগ্রস্থ মানুষগুলো একইসাথে তার উৎসর্গ ও উদযাপন। দুঃখই সর্বাধিক উদযাপিত ব্যাপার।

একেতো বিশ্বব্যাংক আমাদের স্বনির্ভর ব্যবসাগুলি খেয়ে দিতে চায়, আমাদের খুঁটি উপড়ে ফেলে সুদৃঢ় করতে চায় কর্পোরেট শাসন, তারউপর খোদ অভিভাবক রাষ্ট্র যখন তার শেয়ারবাজার/কোনো যন্ত্রসমেত রীতিমতো সৎ পিতা/মাতার ভূমিকায় নামে, তখন সাজ্জাদের মতো বিদেশ পালানো ছাড়া উপায় থাকে না। সেসময় প্রিয়তমার গর্ভে থাকা শিশু, বাপ-মায়ের ভিটাসহ সমস্ত পিছুটানের গিঁট ঢিলা হতে বাধ্য।

সামনে থাকে স্রেফ অভিমানি অনিশ্চিত এক যাত্রা…কোনো সন্দেহ নাই, ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ সময়ের এক দুর্দান্ত সাক্ষী হ’য়ে থাকবে…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *