জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড: ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের নৃশংশতম ঘটনার শতবর্ষ

পড়াশোনা

জালিয়ানওয়ালা বাগ হত্যাকাণ্ড ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটেনের ঘৃণ্য ঔপনিবেশিক শাসনের নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম ঘটনা। শনিবার ছিল এ হত্যাকাণ্ডের একশ বছর। ১৯১৯ সালের এই দিন বিকেলে তৎকালীন পাঞ্জাব অঞ্চলের (বর্তমান পাঞ্জাব রাজ্য) অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগে গণ-জমায়েতে বিনা নোটিশে নির্বিচারে গুলি চালায় ব্রিটিশ সেনারা। এই হত্যাকাণ্ডের নেতৃত্বে ছিলেন ব্রিগেডিয়ার রেগিনাল্ড এডওয়ার্ড হ্যারি ডায়ার। তিনি তখন পাঞ্জাবের সামরিক শাসক। ইংরেজবিরোধী আন্দোলন থামাতে পাঞ্জাবে সামরিক শাসন জারি করে ব্রিটিশ শাসক।

জমায়েতের স্থানটি তিন দিক থেকে উঁচু পাঁচিলে ঘেরা ছিল। সেনারা উন্মুক্ত ফটক বন্ধ করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল। ডায়ারের ওপর পাঞ্জাবে ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা’র দায়িত্ব দিয়েছিল। এটি ছিল তার শান্তি প্রতিষ্ঠার বর্বরতম প্রয়াস। জনগণের অপরাধ তারা ‘রাওলাট আ্যাক্ট’-এর বিরুদ্ধে মহাত্মা গান্ধীর ডাকে একদিনের ধর্মঘটে পাঞ্জাবে অনুষ্ঠিত মিছিলে সেনাদের গুলিবর্ষণ ও গণহত্যার প্রতিবাদ জানাতে জালিয়ানওয়ালাবাগের সমাবেশে যোগ দিয়েছিল।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় (১৯১৪-১৮) ব্রিটিশ সরকার ভারতীয়দের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড রোধে অনেকগুলো দমনমূলক জরুরি আইন প্রণয়ন করেছিল। যুদ্ধশেষে ভারতের জনসাধারণ আশা করেছিল যে, প্রবর্তিত নিপীড়নমূলক আইন তুলে নিয়ে জনগণকে অধিকতর রাজনৈতিক স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। ১৯১৮ সালে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ‘মন্টেগু-চেমসফোর্ড রিপোর্ট’এ ভারতে সীমিতভাবে স্থানীয় স্ব-শাসিত সরকার পরিচালনার অধিকার প্রদানের সুপারিশ করা হয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালের প্রথমে ‘রাওলাট অ্যাক্ট’আইন প্রবর্তন করে।

এই আইনে বিনা পরোয়ানায় যাকে ইচ্ছা গ্রেপ্তার ও কারাবন্দি করার ক্ষমতা দেয়া হয়। এ আইনের বিরুদ্ধে সারা ভারতে প্রতিবাদের আগুন জ্বলতে থাকে। ঝলসে ওঠে পাঞ্জাব অঞ্চলও। এর বিরুদ্ধে সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে বিরোধিতা করেন ভারতের স্বাধীনতার জনক মহাত্মা গান্ধী। সেই সময গ্রেফতার করা হয়েছিল মহাত্মা গান্ধীর দুই বিশ্বস্ত সহচর ডাঃ সৈফুদ্দিন কিচলু ও ডাঃ সতপালকে।কিন্তু তাদের কোথায় রাখা হয়েছিল সেটা কেউই জানতেন না।

অমৃতসরে খবর এসে পৌঁছায় যে ভারতের স্বনামধন্য রাজনীতিবিদদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁদের গুম করা হয়েছে। এই সংবাদে অমৃতসরের জনগণ ক্ষোভে ফেটে পড়ে। ১০ এপ্রিল পথে নেমে আসে তারা। সেনারা গুলি বর্ষণ করে। মানুষ মারা যায়। সেনারা শহরের বিল্ডিংসমূহে লুট করে ও আগুন ধরিয়ে তাণ্ডব সৃষ্টি করে। ক্রুদ্ধ জনতা কয়েকজন বিদেশিকে হত্যা করে। এরপর জেনারেল ডায়ার গণ-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

এর বিরুদ্ধে ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালা বাগে ডাকা হয় প্রতিবাদ সমাবেশ।সেদিন উপস্থিত হয়েছিল কয়েক হাজার মানুষ। এদের বেশিরভাগই এসেছিলেন শহরের বাইরে থেকে বৈশাখি উৎসব উপলক্ষে। সামরিক নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কে বিন্দুমাত্র অবহিত ছিলেন না তারা। সমাবেশে আগে থেকে সতর্ক করে না দিয়ে, নিরস্ত্র জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় ব্রিটিশ বাহিনী।


বাহিনীতে ছিল ১০০ জন গুর্খা সৈন্য আর ২টি সাজোয়া গাড়ি। ১০ মিনিটে ১৬৫০ রাউন্ড গুলিতে নিহত হয় প্রায় ২০০০ মানুষ। এই নৃশংসতার বিরুদ্ধে চরম ধিক্কার ও ঘৃণা বোধ থেকে প্রকৃত শিল্পীর প্রতিবাদস্বরূপ রবীন্দ্রনাথ ব্রিটিশ সরকার প্রদত্ত নাইটহুড উপাধি ত্যাগ করেন। তৎকালীঢন ভাইসরয় লর্ড চেমসফোর্ডকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, ‘আমাদের বহু কোটি যে ভারতীয় প্রজা অদ্য আকস্মিক আতংকে নির্বাক হইয়াছে, তাহাদের আপত্তিকে বাণী দান করিবার সমস্ত দায়িত্ব এই পত্রযোগে আমি নিজে গ্রহণ করিব।’

আন্দোলনের চাপে সংঘটিত অপরাধ তদন্তে ‘হান্টার কমিশন’ গঠনে বাধ্য হয় ব্রিটিশ সরকার। হান্টার কমিশনের প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী জেনারেল ডায়ারকে ভর্ৎসনা করা হয় এবং সেনাবাহিনি থেকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। স্যার উইনস্টন চার্চিলসহ ‘হাউস অব কমন্স’-এর অনেকে নিন্দা জানান।

কিন্তু ‘হাউস অব লর্ডস’ ডায়ার্সের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করে তার প্রশংসা করেন। তাদেরই উত্তরসূরি বেশ কজন মন্ত্রী জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষে বর্তমান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেকে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনার অনুরোধ জানালেও তেরেসা কেবল দুঃখ প্রকাশ করেন। ক্ষমা চাননি। ব্রিটেনের মহারানি এলিজাবেথ জালিয়ানওয়ালাবাগ স্মৃতিসৌধ পরিদর্শন শেষে দুঃখও প্রকাশ করেননি।

এই ঘটনা উপমহাদেশের জনগণকে নাড়িয়ে দেয়। জনগণ বুঝতে পারে ব্রিটিশের শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করার আন্দোলনে সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হবে। পাঞ্জাবের জনগণের আত্মবলিদান বৃথা যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *