অ্যাসাঞ্জের কণ্ঠ থামিয়ে দিতে চায় ক্ষমতাবানরা: নোয়াম চমস্কি

আমেরিকা

(ওয়াশিংটন, যুক্তরাষ্ট্র) সাড়া জাগানো বিকল্প সংবাদমাধ্যম উইকিলিকসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারকে কলঙ্কজনক আখ্যা দিয়েছেন মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক ও রাজনীতি বিশ্লেষক নোয়াম চমস্কি। তিনি বলেছেন, সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধ করতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে নেয়া পদক্ষেপকে ইতালির ফ্যাসিবাদী মুসোলিনি সরকার কর্তৃক বিশ শতকের অন্যতম প্রধান মার্কসবাদী চিন্তাবিদ অ্যান্তোনিও গ্রামসিকে কারাগারে নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি। বলেছেন, তাকে চুপ করিয়ে দেয়াটা ক্ষমতাশালীদের জন্য জরুরি ছিল। এ ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের জোরালো সমালোচনা করেছেন চমস্কি।  ডেমোক্রেসি নাউ এক প্রতিবেদনে এ কথা জানিয়েছে।

জুলিয়ান আসাঞ্জের নাম সর্বসমক্ষে আসে ২০১০ সালে। উইকিলিকস তখন হাজার হাজার কূটনৈতিক কেবল ও সামরিক তথ্য প্রকাশ করেছিল। সেসব নথি তাদের সরবরাহ করেছিলেন মার্কিন সেনাকর্মী চেলসি ম্যানিং। ফাঁস হওয়া নথির মধ্যে ছিল হাড় হিম করা একটি ভিডিও-ও, যাতে দেখা গিয়েছিল মার্কিন আপাচে হেলিকপ্টার ইরাকে রয়টার্সের দুই সাংবাদিক সহ ১২ জনকে গুলি করে মারছে।

এরপরই তাকে ধরতে শুরু হয় নানা রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্র। ওই বছরই সুইডেন ঘোষণা করে যে তারা একটি ধর্ষণ ও নিগ্রহের ঘটনায় আসাঞ্জের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে। দুই নারী এ ব্যাপারে অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানায় তারা। ব্রিটেনের কাছে আসাঞ্জের বিরুদ্ধে প্রত্যর্পণের পরোয়ানা জারিরও চেষ্টা করে সুইডেন। সুইডিশ পরোওয়ানার বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের জন্য ২০১১ সালে ব্রিটিশ আদালতের শরণাপন্ন হন আসাঞ্জ।আদালতের সিদ্ধান্ত তাঁর বিপক্ষে যায় এবং ২০১২ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টে আপিল মামলাতেও হেরে যান তিনি।

২০১২ সালের জুন থেকে লন্ডনের ইকুয়েডর দূতাবাসে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন উইকিলিকস প্রতিষ্ঠাতা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ। ৪ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) উইকিলিকসের টুইটে বলা হয়, ইকুয়েডর সরকারের উচ্চপর্যায়ের দু’টি সূত্র থেকে তারা নিশ্চিত হয়েছে, কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিনের মধ্যে অ্যাসাঞ্জকে দূতাবাস থেকে তাড়ানো হতে পারে। সেই ধারাবাহিকতায় রাজনৈতিক আশ্রয় প্রত্যাহার করে বৃহস্পতিবার তাকে ব্রিটিশ পুলিশের হাতে তুলে দেয় ইকুয়েডর। পরে সেই ধারাবাহিকতায় অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে পুরনো বিতর্কিত ধর্ষণ মামলা পুনঃতদন্তের ইঙ্গিত দেয় সুইডেন।

অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে চলমান ধারাবাহিক আইনি পদক্ষেপের বিরুদ্ধে বরাবরই সোচ্চার বিশ্বজুড়ে ক্ষমতাশালীদের নষ্টামোর বিপরীতে ন্যায় ও সমতার পক্ষের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর চমস্কি। ‘মুক্তিপথের সমাজতন্ত্র’-এ বিশ্বাসী চমস্কি ডেমোক্র্যাসি নাউকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতার কয়েকটি দিক থেকে কলঙ্কজনক। এর একটি হলো বিভিন্ন সরকারের পদক্ষেপ। কেবল যুক্তরাষ্ট্র সরকার নয়, রয়েছে যুক্তরাজ্যও। নিশ্চিতভাবে ইকুয়েডরও রয়েছে। সুইডেন অতীতে সহায়তা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ হলো এক সাংবাদিককে চুপ করিয়ে দেওয়ার।’

চমস্কি মনে করেন, সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ক্ষমতাশালীরা যা গোপন করতে চায়, উইকিলিকস সেসব নথিই প্রকাশ করেছে। সে কারণেই তাকে চুপ করানোর দরকার পড়লো। একে তিনি মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকার কর্তৃক কমিউনিস্ট চিন্তাবিদ আন্তোনিও গ্রামসিকে কারাগারে ঢোকানোর সঙ্গে তুলনা করেন। সেই সময়ের ইতিহাসকে সামনে এনে চমস্কি বলেন, ‘প্রসিকিউটররা বলেছিলেন ২০ বছর ধরে এই কণ্ঠকে থামানোর দরকার ছিল। একে বলতে দেওয়া চলে না।’ তার মতে, অ্যাসাঞ্জের বাস্তবতাও একই রকমের।

অ্যাসাঞ্জের গ্রেফতারের নেপথ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার কথা আর কারও অজানা নয়। অভিযোগ উঠেছে, ঋণ মওকুফের শর্তে ইকুয়েডর সরকার তার বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে রাজি হয়েছে। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষও স্বীকার করেছে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যপর্ণের অনুরোধ সাপেক্ষেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বহির্বিশ্বের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন হস্তক্ষেপকে ‘জঘন্য’ আখ্যা দিয়ে চমস্কি বলেন, ‘কেন যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনও রাষ্ট্র এটা করতে পারবে? কেন বিশ্বের যে কোনও স্থানের ঘটনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রের থাকবে? আমি বলতে চাই, এটা একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি। সব সময়ই এটা হয়ে আসছে। আমরা এটা খেয়ালই করি না।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *