ভারতে এবার গেরুয়া ঝড় উঠবে না: রয়টার্সের বিশ্লেষণ

ভারত লিড নিউজ

(নয়াদিল্লি, ভারত) লোকসভা নির্বাচনে এবার গেরুয়া ঝড় উঠবে না। এমন ইঙ্গিতই মিলছে নানা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে। বিশেষজ্ঞরা সংশয় প্রকাশ করেছেন উত্তরপ্রদেশে বিজেপির জয় নিয়ে। গতবার এ রাজ্যেই রেকর্ড সংখ্যক আসন পেয়েছিল দলটি। তবে দেশের বৃহত্তম এ রাজ্যে গেরুয়া শিবিরের অবস্থা যে বেশ টলমলে, তা আগেই অনুমান করা যাচ্ছে। বিজেপিকে কোণঠাসা করতে মহাজোট গেড়েছে আঞ্চলিক প্রধান তিনটি দল সমাজবাদী পার্টি (সপা), বহুজন সমাজ পার্টির (বসপা) ও রাষ্ট্রীয় লোকদল। লোকসভায় আসন সংখ্যার নিরিখে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য মহারাষ্ট্রের নামও সেই তালিকাভুক্ত হল।

রয়টার্স জানিয়েছে, কেন্দ্রের শাসক দল বিজেপি এবং তার জোট সঙ্গী শিবসেনা মহারাষ্ট্রে বড়সড় ধাক্কা খেতে চলেছে। গ্রামীণ এলাকার দারিদ্র-দুর্দশা, বেকারত্ব এবং খরা রোধে গাফিলতিই বিজেপিকে চাপে ফেলেছে। ফলে গ্রাম ভারতের ভোট এবার মোদি শিবিরের বিরুদ্ধে যাবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ দেশের ১৩০ কোটি মানুষের দুই-তৃতীয়াংশই মফস্বল এবং গ্রামের বাসিন্দা। তাই গ্রাম ভারত মুখ ফেরালে বিজেপিকে পর্যুদস্ত হতেই হবে।

মহারাষ্ট্রেও যার ব্যতিক্রম হবে না। বাণিজ্য নগরী মুম্বাইসহ মহারাষ্ট্রের সর্বত্রই বিজেপি বিরোধী হাওয়া চলছে- এমনই অভিমত বিশ্লেষকদের। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি-শিবসেনা জোট রাজ্যের ৪৮টি আসনের ৪১টিতে জয় পেয়েছিল। কিন্তু এই লোকসভা নির্বাচনে সেই আশা একেবারেই নেই।

গণহারে কৃষক আত্মহত্যা, ফসলের ন্যায্য দাম না পাওয়া ও কৃষকদের আয় কমে যাওয়া যার অন্যতম কারণ। সঙ্গে অবশ্যই বেকারত্ব। মহারাষ্ট্রের মারাঠওয়াড়া বারবার কৃষক আত্মহত্যার ঘটনায় শিরোনামে এসেছে। ঋণ মকুবের দাবিতে কৃষকরা পথে নেমেছেন। কিন্তু সরকার বরাবরই নীরব। বিদেশ সফরে ব্যস্ত থাকা প্রধানমন্ত্রী অবসরকালে দেশে ফিরলেও কৃষকদের, দেশের দরিদ্র মানুষদের দিকে তাকানোর সময় পান না। তাই পালটা জবাব দিতে এবার প্রস্তুত দুর্দশাগ্রস্ত সেইসব মানুষেরা।

পুলওয়ামায় সন্ত্রাসবাদী হামলায় জওয়ানদের মৃত্যু, পাকিস্তানের মাটিতে ভারতের বিমান হানায় সন্ত্রাসবাদী ঘাঁটি ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়ার দাবিতে মোদি এবং তার দোসররা ফের ভোটবাক্স ভরানোর চেষ্টা চালালেও কর্মসংস্থানের ঘাটতি, অনাহার, অপুষ্টির কাছে হার মানতে হবে তাকে, তেমনই মনে করা হচ্ছে।

মুম্বাইয়ের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ প্রতাপ আসবে বলেন, ‘এইসব ঘটনাকে ভিত্তি করে মার্চ মাসেও বিজেপি সামান্য এগিয়েছিল বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহে বিরোধীরা স্বর চড়িয়েছে বেকারত্ব, শস্যের দাম নিয়ে। যা ভোটারদের মধ্যে প্রভাব ফেলতে শুরু করে দিয়েছে।’ মার্চ-এপ্রিল দুই মাস মিলিয়ে মহারাষ্ট্রের ১১টি জেলায় ঘুরে ঘুরে ১৪৮জন কৃষকের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে ওই সংবাদসংস্থার পক্ষ থেকে। উল্লেখযোগ্যভাবে অধিকাংশই ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন, কীভাবে তাদের আয় কমে গিয়েছে।

শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্দিষ্ট না করায় এই অবস্থা তৈরি হওয়ার জন্য সরকারের দিকেই আঙুল তুলেছেন তারা। কৃষি সংকট মোকাবিলায় বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। প্রতিবাদ-আন্দোলন করেও হাঁপিয়ে উঠেছেন তারা। লঙ মার্চে হেঁটে কৃষকদের পায়ে দগদগে ফোসকা পড়লেও সরকার ভ্রুক্ষেপ করেনি। তাই সরকারের কাছ থেকে কোনো গুরুত্ব পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছেন গরিব মানুষ। লোকসভা নির্বাচনের পাশাপাশি অক্টোবরে বিধানসভা নির্বাচনেও এর প্রভাব ভালোমতোই পড়বে, বলছেন প্রতাপ আসবে।

কৃষকদের অভিযোগ, গোশালা খুলতেও সরকার অনিচ্ছুক। অন্তত গোশালা খুললে গবাদিপশুর খাবার আর পানীয় জল নিয়ে তাঁদের চিন্তা করতে হবে না। কিন্তু সেসবেরও কোনও বালাই নেই। নাসিকের আখচাষি মাধব পাওয়াসে অভিযোগ করেছেন, চিনি কারখানার মালিকরা আখের সরকার নির্ধারিত দাম তো দেয়ই না, এমনকী যে টাকা দেয় তা-ও মাসের পর মাস ধরে বকেয়া। সরকারের সেদিকেও তেমন কোনও নজর নেই।

মাধব ২০১৪ সালের নির্বাচনে শিবসেনাকে ভোট দিয়েছিলেন। এবার শিবসেনা-বিজেপি’কে তিনি ভোট দেবেন না, এমনই ইঙ্গিত মিলেছে তাঁর কথাতেও। মোদী সরকারের বিরুদ্ধে রাগে ফুঁসছে রাজ্যের যুব সম্প্রদায়। তাঁদেরই একজন আকাশ ফালকে স্পষ্ট জানিয়েছেন, ‘‘এখন আর রাজ্যে কোনও চাকরি নেই। আমরা এমন সরকার চাই, যারা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।’’ আকাশ একজন মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার। দু’বছর আগে পড়া শেষ হয়ে গেলেও চাকরি মেলেনি। হন্যে হয়ে ঘুরছেন। যে ভুয়ো আশ্বাসগুলি দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর আসনে নরেন্দ্র মোদী বসেছিলেন, তার অন্যতম ছিল বেকারত্ব দূরীকরণ।

এদিকে, দীর্ঘদিনের দূরত্ব ঘুচিয়ে লোক দেখিয়ে বিজেপি-শিবসেনা পরস্পরের হাত ধরলেও দুই দলের কর্মীরা ঠিক কতটা কাঁধে-কাঁধ দিয়ে ভোটের প্রচার করছেন, তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। প্রতাপ আসবের কথায়, ‘‘দুই দলেরই নিচু তলার কর্মীরা একে অপরের উপর অসন্তুষ্ট। একযোগে কখনওই কাজ করবেন না তাঁরা।’’ ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের হাজারো সমস্যা না মেটানো, অন্যদিকে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব গেরুয়া বাহিনী এবং তার জোটসঙ্গীর পরাজয়ের পথ প্রশস্তই করে দিয়েছে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *