মানুষের কর্মকাণ্ডে বিপন্ন প্রাণিজগতের ১০ লাখ প্রজাতি

বিশ্বজগৎ

(নিউইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র) নির্বিচার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রাণিজগতের ১০ লাখ প্রজাতিকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে মানুষ। বিশেষ করে বিশ শতকের ৭০-এর দশক থেকে খাদ্য-বস্ত্রসহ মানুষের নানা চাহিদার পরিসর বিস্তৃত হওয়ার কারণে লাখ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকির মুখে পড়েছে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন উঠে এসেছে এ তথ্য।

১৫ হাজার তথ্যসূত্র নিয়ে ৩ বছরের গবেষণা শেষে জাতিসংঘের ইন্টারগভার্নমেন্টাল সায়েন্স পলিসি প্ল্যাটফর্ম অন বায়োডাইভারসিটি অ্যান্ড ইকোসিস্টেম সার্ভিস ১৮০০ পৃষ্ঠার ওই প্রতিবেদন হাজির করেছে। সোমবার প্রকাশিত এর ৪০ পৃষ্ঠার সারমর্ম থেকে জানা গেছে, প্রাণিজগতের ২৫ ভাগ প্রজাতিই মানুষের কারণে বিপন্নতার মধ্যে রয়েছে।

সোমবার ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ‘সামারি ফর দ্য পলিসিমেকার’ শিরোনামে প্রকাশিত হয় জাতিসংঘের ওই প্রতিবেদনের সারমর্ম। ৪০ পৃষ্ঠার সেই সংক্ষেপ হাজির করতে গিয়ে বলা হয়েছে, মানবজাতি কিভাবে নিজেদের ‘একমাত্র বাড়ি’কে ধ্বংস করছে; এটাই তার সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল। প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, স্থল, জল কিংবা আকাশ; সবখানেই মানুষের কারণে বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে বিভিন্ন প্রজাতি।

দুনিয়াজুড়েই প্রকৃতির পরিবর্তনের ধারার বেগ অন্য যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি। আর এর সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, আমাদের খাবার ও জ্বালানির চাহিদা। কিন্তু চাইলে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব। তবে তার জন্য প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রত্যেকটি পরতে পরতে প্রয়োজন দার্শনিক, কৌশলগত ও বাস্তবিক পরিবর্তন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সৃষ্টিলগ্নের শুরু থেকেই মানবজাতির বিভিন্ন পদক্ষেপে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে প্রকৃতি। তবে গত ৫০ বছরের ক্ষতগুলোই সবচেয়ে গভীর। ১৯৭০ সালের পর থেকে বিশ্বের জনসংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে, বিশ্ব অর্থনীতির আকার বেড়েছে চারগুণ আর আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বেড়েছে ১০ গুণ।

বিশাল জনগোষ্ঠীকে খাদ্য, বস্ত্র ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে উদ্বেগজনক হারে ধ্বংস হচ্ছে বন,বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে। ১৯৮০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মাত্র ২০ বছরে পৃথিবীর মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ১০ কোটি হেক্টর উপকূলীয় বন। এর বেশিরভাগই দক্ষিণ আমেরিকায় গবাদি পশু চড়ানো এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় তেল উৎপাদনের কারণে হয়েছে।

উপকূলীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি আরও করুণ। ১৭০০ সালে যে পরিমাণ বন ছিল ২০০০ সালে এসে তার মাত্র ১৩ শতাংশের অস্তিত্ব টিকে ছিল। শহরের পরিধি বেড়েছে দ্রুত গতিতে। ১৯৯২ সাল থেকে এখনকার নগরায়ন প্রায় দ্বিগুণ। মানবজাতির এমন কর্মকাণ্ডে আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বিপুল গতিতে বিলুপ্ত হচ্ছে প্রাণিকূল।

বৈশ্বিক হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ২৫ শতাংশ প্রাণি ও উদ্ভিদ প্রজাতি এখন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পতঙ্গের ক্ষেত্রে সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। তবে বেশ কিছু এলাকায় তাদের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশ ভালোভাবেই নথিবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। সব নথিপত্র প্রমাণ করছে যে, এক দশকের মধ্যেই প্রায় ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। আর এই বিলুপ্ত হওয়ার হার গত ১ কোটি বছরের চেয়ে শতভাগ বেশি।

প্রধান গবেষক মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. কেট ব্রম্যান বলেন, ‘আমরা প্রকৃতির জীববৈচিত্র্যের অভূতপূর্ব পতন দেখতে পেয়েছি। মানবজাতির ইতিহাসে আমাদের দেখা ঝুঁকি কিংবা পরিবর্তনের হার সাপেক্ষে অন্য যে কোনও পরিস্থিতির চেয়ে এর তাৎপর্য আলাদা।’তিনি বলেন, আমরা যখন সব তথ্য একসঙ্গে করি, তখন এর ভয়াবহতা দেখে চমকে যাই। কী পরিমাণ প্রজাতি বিলুপ্ত হচ্ছে আর প্রকৃতি মানবজাতির জন্য কতটা করছে তার বাস্তবতায় আমরা বিস্মিত।’

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, মাটির ক্ষয় এখন আগের যে কোনও সময়ের চেয়ে বেশি। পৃথিবীর মাটির উর্বরতা আগের চেয়ে ২৩ শতাংশ কমে গেছে। আমাদের অনিবারণীয় ক্ষুধা যেন আবর্জনার এক পাহাড় তৈরি করছে। ১৯৮০ সালের সাপেক্ষে প্লাস্টিক দূষণ বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ। প্রতিবছর আমরা সাগরে ফেলছি ৩০-৪০ কোটি টন ভারী লোহা, বিষাক্ত রাসায়নিক ও আবর্জনা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *