গোপনে মুক্তি দেয়া হল রোহিঙ্গা হত্যায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত সাত সেনাকে

পূর্ব এশিয়া লিড নিউজ

(নেপিদো, মিয়ানমার) রাখাইন রাজ্যে ১০ রোহিঙ্গাকে হত্যার ঘটনায় সাজাপ্রাপ্ত সাত সেনা সদস্যকে মুক্তি দিয়েছে মিয়ানমার। ১০ বছরের সাজা হলেও কারাবন্দি হওয়ার এক বছরেরও কম সময়ের মাথায় গোপনে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। সোমবার (২৭ মে) দুই কারা কর্মকর্তা, দুই সাবেক কারাবন্দি ও এক সেনা সদস্যকে উদ্ধৃত করে রয়টার্স খবরটি জানিয়েছে।

অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে সামরিক-বৌদ্ধতন্ত্রের প্রচারণায় রাখাইনে ছড়ানো হয়েছে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষ। ২০১৭ সালের আগস্টে অভিযান জোরদার করার আগের কয়েক মাসের সেনাপ্রচারণায় সেই বিদ্বেষ জোরালো হয়। এরপর শুরু হয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত রোহিঙ্গা নিধনযজ্ঞ। হত্যা-ধর্ষণ ও ঘরবাড়িতে আগুন দেওয়ার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের মাধ্যমে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করা হয় ৬ লাখ ৯২ হাজার মানুষকে। 

২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলীয় গ্রাম ইনদিনে সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীরা ১০ রোহিঙ্গাকে গুলি করে হত্যা করে। তাদের রাখা হয় গণকবরে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কর্তৃপক্ষ রয়টার্সকে জানায়,ঘটনার অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। সেই তদন্তের ভিত্তিতে গত বছরের এপ্রিলে দোষী সাব্যস্ত ৭ সেনাকে কারাদণ্ড দেয় মিয়ানমারের সেনাবাহিনী।

সোমবার (২৭ মে) সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্সে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সাজাপ্রাপ্ত ওই সেনা সদস্যরা আগাম মুক্তি পেয়ে গেছেন। ওই সেনা সদস্যদের সঙ্গে কারাগারে ছিলেন এমন সাবেক দুই বন্দি রয়টার্সকে জানান, দোষী সাব্যস্ত সেনা সদস্যরা গত বছরের নভেম্বরে মুক্তি পেয়েছেন। ১০ বছরের কারাদণ্ডের মধ্যে এক বছরেরও কম সময় সাজা ভোগ করেছেন তারা।

রাখাইনের সিত্তে কারাগারের প্রধান ওয়াড্রেন উইন নাইং এবং নেপিদোর এক জ্যেষ্ঠ কারা কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, ১০ রোহিঙ্গা হত্যায় দোষী সাব্যস্ত ওই সেনা সদস্যরা কয়েক মাস ধরে কারাগারে নেই।’নাম প্রকাশে অনিচ্ছা জানিয়ে নেপিদোর জ্যেষ্ঠ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘সেনাবাহিনী তাদের (সাজাপ্রাপ্ত সেনাদের) সাজার মেয়াদ কমিয়ে দিয়েছে।’

এ দুই কারা কর্মকর্তার কেউই বিস্তারিত বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। বলেছেন, ঠিক কত তারিখে দোষী সাব্যস্ত ওই সেনা সদস্যরা মুক্তি পেয়েছেন তা তারা জানেন না। সেনাবাহিনীর মুখপাত্র জ মিন তুন এবং তুন তুন নেয়ি এ ব্যাপারে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২৩ মে) রয়টার্সের পক্ষ থেকে জিন পাইং সোয়ে নামে এক ব্যক্তিকে ফোন করা হয়েছে। ওই ব্যক্তি নিশ্চিত করেছেন, তিনি সাত সেনা সদস্যেরই একজন এবং বর্তমানে মুক্ত আছেন। তবে এ ব্যাপারে আর কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ‘আমাদেরকে চুপ থাকতে বলা হয়েছে।’ বলেন, জিন পাইং।

সম্প্রতি সিত্তে কারাগার থেকে মুক্তি দুই বেসামরিক কারাবন্দি রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সেখানকার কারাবন্দিরা ওই সাত সেনা সদস্যকে ভালোভাবে চিনতো। সাবেক ওই দুই কারাবন্দির একজন অং থান ওয়াই। সিত্তের রাজনৈতিক অ্যাকভিস্ট তিনি। রাজ্যের এক কর্মকর্তার সমালোচনা এবং অনলাইনে তার ছবি পোস্ট করার পর মিয়ানমারের একটি গোপনীয়তা আইনের আওতায় প্রায় ছয় মাস কারাগারে কাটাতে হয়েছে তাকে। ডিসেম্বরে মুক্তি পান অং। সাত সেনা সদস্য সম্পর্কে রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘আমরা একই ভবনে ভিন্ন ভিন্ন কারা সেলে ছিলাম।’

অং জানান, ওই সেনাদের মুক্তির ব্যাপারে তিনি প্রকাশ্যে কথা বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কারণ ইন দিনের ওই হত্যার ঘটনায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত এক এথনিক রাখাইন বৌদ্ধ এখনও জেলে আছেন। তিনি আরও বলেন, সিত্তেতে দোষী সাব্যস্ত সেনাদেরকে বিয়ার ও সিগারেট সরবরাহ করা হতো যা অন্য কারাবন্দিদের ধারণারও বাইরে ছিল।

আরেক সাবেক কারাবন্দি নাম প্রকাশ না করে জানিয়েছেন, সেনা কর্মকর্তারা ওই সেনা সদস্যদের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে আসতেন। নভেম্বরে একটি সামরিক যানে করে ওই সাত সেনাকে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও জানান তিনি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *