রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসিয়ানের প্রতিবেদন ফাঁস!

পূর্ব এশিয়া লিড নিউজ

(নেপিদো, মিয়ানমার) রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসিয়ানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট টিম’-এর তৈরি করা একটি প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই ফাঁস হয়েছে। দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ানের এ প্রতিবেদনে প্রত্যাশা করা হচ্ছে, ৫ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী শীঘ্রই মিয়ানমারে ফিরে আসবে। তবে অত্যাচারিত মুসলিম সংখ্যালঘুদের নামও উল্লেখ করা হয়নি প্রতিবেদনটিতে। অথচ রাখাইন রাজ্যে চলমান গৃহযুদ্ধ। সেখানে চলছে ধর্মীয়-জাতিগত সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর অত্যাচার।

প্রতিবেদনটির বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, এটি তৈরি করেছে আসিয়ানের ‘ইমার্জেন্সি রেসপনস অ্যান্ড অ্যাসেসমেন্ট টিম’ যা আগামী যেকোনো দিন প্রকাশিত হতে পারে। আসিয়ানের প্রতিবেদনে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। এর পরিবর্তে সেখানে ‘মুসলমান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দাবি করা হয়, ম্যানুয়ালি কাজ করার পরিবর্তে অটোমেটিকভাবে কাজ করা হলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শেষ করতে ‘দুই বছরের মতো’ সময় লাগবে।

এর মাধ্যমে বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নেওয়া প্রায় ৭ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুকে ফাঁদে ফেলতে মিয়ানমারের প্রচেষ্টা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায় বলে এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এসব শরণার্থীদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ সাল থেকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া আরো প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর রাখাইনে পূর্ব-পরিকল্পিত ও কাঠামোবদ্ধ সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রায় সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। এদের সঙ্গে রয়েছেন ১৯৮২ সাল থেকে নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচার জন্যে বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া আরও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা।

সব মিলে বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। এএফপি তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিয়ানমার সরকারের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা ৫ লাখ, যা বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে অনেক কম।‘প্রিলিমিনারি নিডস অ্যাসেসমেন্ট ফর রিপেট্রিয়েশন ইন রাখাইন স্টেট, মিয়ানমার’ শিরোনামে প্রণীত প্রতিবেদনে ৫ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে কাজ করার কথা উঠে এসেছে।

প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে রোহিঙ্গারা রাখাইনে থাকলেও মিয়ানমার তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে না। উগ্র বৌদ্ধবাদকে ব্যবহার করে সেখানকার সেনাবাহিনী ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে স্থাপন করেছে সাম্প্রদায়িক অবিশ্বাসের চিহ্ন। ছড়িয়েছে বিদ্বেষ।

১৯৮২-তে প্রণীত নাগরিকত্ব আইনে পরিচয়হীনতার কাল শুরু হয় রোহিঙ্গাদের। এরপর কখনও মলিন হয়ে যাওয়া কোনও নিবন্ধনপত্র, কখনও নীলচে সবুজ রঙের রসিদ, কখনও ভোটার স্বীকৃতির হোয়াইট কার্ড, কখনও আবার ‘ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড’ কিংবা এনভিসি নামের রংবেরঙের পরিচয়পত্রে ধাপে ধাপে মলিন হয়েছে তাদের জাতিগত পরিচয়।

ক্রমশ তাদের রূপান্তরিত করা হয়েছে রাষ্ট্রহীন বেনাগরিকে। এএফপি জানিয়েছে, আসিয়ানের প্রতিবেদনেও মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের মতো করে ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়নি। তাদের পরিচয় হিসেবে সেখানে ‘মুসলমান’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে।

পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে গত বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। গত ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

তবে নানা জটিলতায় এখন পর্যন্ত প্রত্যাবাসন চুক্তির আওতায় একজন রোহিঙ্গাকেও ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের সঙ্গে চুক্তির পরও রাখাইনে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বুলডোজারে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধের নজির। খবর মিলেছে সেখানে আদর্শ বৌদ্ধ গ্রাম নির্মাণ চলমান থাকার। ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদলের মিয়ানমারে প্রবেশের কথা থাকলেও সে সময় ডি-ফ্যাক্টো সরকার এর অনুমতি দেয়নি।

পরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে প্রবেশাধিকার দিলেও মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছে, প্রত্যাবাসনের ভান করছে মিয়ানমার। তবে আসিয়ানের অবস্থান সম্পর্কে এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাদের প্রতিবেদনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের নেয়া পদক্ষেপকে ‘সহজ ও সুশৃঙ্খল’ আখ্যা দিয়ে এর প্রশংসা করা হয়েছে। নেপিডোর সুরে সুর মিলিয়ে এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের পেপারওয়ার্কজনিত দুর্বলতার কারণে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বিলম্বিত হচ্ছে।

এএফপির মতে, ‘প্রিলিমিনারি নিডস অ্যাসেসমেন্ট ফর রিপেট্রিয়েশন ইন রাখাইন স্টেট, মিয়ানমার’ ৫ লাখ রোহিঙ্গার প্রত্যাবাসন নিয়ে কাজ করছে। মিয়ানমার সরকারের কাছে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সংখ্যা ৫ লাখ যা বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের হিসাবের চেয়ে অনেক কম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *