ট্রাম্পের ইরান কৌশল ব্যর্থ হতে পারে যে কারণে

মধ্যপ্রাচ্য

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪১ সালে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ ভূমিকায় থাকার ঘোষণা দেয়। এরপরেও তৎকালীন বিশ্বের দুই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ব্রিটেন দেশটিতে হামলার হুমকি দেয়। সম্ভাব্য সংকটের গভীরতা উপলব্ধি করার পরেও সোভিয়েত ও ব্রিটিশ হুমকির কাছে নতি স্বীকার করতে অস্বীকৃতি জানায় ইরান। রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে অসহায় আত্মসমর্পণ করার চেয়ে প্রতিরোধ ও সামরিক পরাজয়কে বেশি যৌক্তিক মনে হয় দেশটির নেতারা।

সৈন্যের সংখ্যা ও সামরিক সরঞ্জামের বিচারে অনেক এগিয়ে থাকা সোভিয়েত-ব্রিটিশ শক্তির কাছে ইরানের সেনাবাহিনী খুব অল্প সময়েই পরাজিত হয়। কয়েক বছরের জন্য দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় বিজয়ী সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। যুদ্ধে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরেও তেহরান তাদের সার্বভৌমত্ব ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম চালিয়ে যায়। এবং বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার মাত্র এক বছরের মধ্যেই তারা অসামান্য বীরত্ব দেখিয়ে নিজেদের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধার করে। দখলদার সোভিয়েত ও বিটিশরা ইরান ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়।

এ ছাড়াও ইরানের ইতিহাসে আরও অনেক ঘটনা পাওয়া যায় যা আমাদেরকে বলে দেয় যে ইরানি রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি মৌলিক দিক হচ্ছে প্রতিরোধ সংগ্রাম। আর এটি ইরানের বৈদেশিক নীতি-নির্ধারণের ক্ষেত্রে মূল চালিকাশক্তির ভূমিকা পালন করে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক হুমকি ও শাস্তিমূলক পদক্ষেপের শিকার দেশটি।  সার্বভৌমত্ব নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এবারের সংকটেও তারা পূর্বের নীতির অনুসরণ করবে তা অনেকটাই স্পষ্ট।

গত এপ্রিলে ট্রাম্প প্রশাসন ঘোষণা দিয়েছে যে, ইরানী তেল ক্রয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকার যে সুবিধা ভোগ করছিল, যুক্তরাষ্ট্র ওই সুবিধা আর নবায়ন করবে না। একই সঙ্গে যেসব দেশ মার্কিন নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইরানী তেল কেনা চালিয়ে যাবে তাদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ারও হুঁশিয়ারি দেয় ট্রাম্প প্রশাসন। তখন থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে একের পর এক হুমকি ও বিদ্বেষী প্রচারণা চালিয়ে আসছে যুক্তরাষ্ট্র।

এক্ষেত্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের কৌশল হলো, হুমকি-ধামকির মাধ্যমে ইরানিদের দুর্বল করে ফেলা। অন্যদিকে দেশটির অর্থনীতিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিলে তা ইরানীদেরকে সরকারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে বাধ্য করবে। আর এমন টালমাটাল পরিস্থিতিতে দেশটির সরকার বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে। ওয়াশিংটনের আশা, তাদের এই কৌশল ইরানকে নাস্তানাবুদ করে ছাড়বে। একপর্যায়ে তারা যুক্তরাষ্ট্র্রের শর্ত মেনে নিয়ে সমঝোতায় উদ্যমী হবে।

ট্রাম্প প্রশাসন সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে ইরানের সামনে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতি স্বীকার ছাড়া আর কোন সুযোগ না রাখার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। কিন্তু বেশির ভাগ ইরানী নাগরিকদের মত হল, যা-ই ঘটুক না কেন ইরান তা প্রতিরোধ করবে। দেশটির নেতারা সাধারণ জনগণকে এটা বুঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের কোন কৌশলের কাছে নমনীয় মনোভাব দেখানো তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করারই নামান্তর। সে অনুসারে ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুমকি-পাল্টা হুমকি দিয়ে চলেছে। যা এখন পর্যন্ত ভালোই কাজে দিচ্ছে।

তীব্র অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই ইরানীদের সরকার-বিরোধী আন্দোলনে রাজপথে থাকার কথা ছিল। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের ‘সর্বোচ্চ বল-প্রয়োগের কৌশল’ ইরানীদেরকে এই সংকটকালীন সময়েও তাদের জাতীয় পতাকা ঘিরে সমাবেশ করতে বাধ্য করছে।

যে নেতা সবচেয়ে বেশি বিদেশী চাপ প্রতিরোধ করতে পারবে, ইরানী জনগণের কাছে তারা তত বেশি জনপ্রিয়তা পাবে। মার্কিন চাপের মুখে ইরানের অব্যাহত প্রতিরোধের পেছনে এটাও অন্যতম কারণ। দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে চলা এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ইরানের কোন রাজনৈতিক নেতা কখনোই বৈরি দেশের সঙ্গে সমোঝাতায় যাবে না, তা অনেকটাই নিশ্চিত।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত হুমকি ও চাপ-প্রয়োগের মুখে ইরানও নিষ্ক্রিয় থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ও এর মূল্য যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সবচেয়ে বেশি অগ্রাধিকার পায়। কোন সামরিক সংঘাতে না গিয়ে, কোন খরচ ছাড়াই ইরান মধ্যপ্রাচ্যে এই মার্কিন স্বার্থকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। যা চুড়ান্তভাবে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহে বিঘœ সৃষ্টি করবে।

যা হোক, যুক্তরাষ্ট্র যদি সর্বাত্মকভাবে ইরানের সঙ্গে কোন সংঘাতে লিপ্ত হয়, দেশটি ইরানকে তাদের কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য করতে পারবে এমনটি ভাবা কঠিন। বৈশ্বিক পরিমন্ডলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়া অনানুষ্ঠানিকভাবে হলেও ইরানের প্রতিরোধ-সংগ্রামে সমর্থন দেবে। কেননা এই দুই দেশই ট্রাম্পের এশিয়ানীতি ও সাম্প্রতিক বাণিজ্য যুদ্ধে চরমভাব বিরক্ত। ইরানের সঙ্গে মার্কিন সংঘাত বাধলে সেটিকে এই দুই শক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে শিক্ষা দেয়ার বড় সুযোগ হিসেবে নিতে পারে।

এটা সুস্পষ্ট যে, চীন বা রাশিয়া কোন দেশই সরাসরি ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামবে না। কিন্তু তাদের কৌশলগত সমর্থনের গুরুত্ব অনেক। ট্রাম্পকে থামানোর জন্য ও নিজেদের সীমান্তকে বিপদমুক্ত রাখার জন্য হলেও যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে এ দু’দেশের স্বার্থ রয়েছে। সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তার পাশাপাশি তারা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ইরানকে রাজনৈতিক সহায়তা দিতে পারে।

আর ট্রাম্প যদি চুড়ান্তভাবে কোন যুদ্ধে জড়িয়েই পড়েন, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তিনি আরো বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বেন। বিশ্ববাসী যখন অব্যাহতভাবে ট্রাম্পের আগ্রাসী পদক্ষেপগুলোর বিরোধিতা করছে, কৌশলগত ধৈর্য্য ও পারমাণবিক চুক্তির প্রতি একনিষ্ঠতা ধরে রাখার কারনে ইরান এখন পর্যন্ত নিজেদের নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ধরে রেখেছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সামরিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তার পুরনো অনেক মিত্রর সমর্থন না পাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ইরাক যুদ্ধের তুলনায় বিপর্যয়কর হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের পূর্ণ সামরিক ক্ষমতার বিষয়ে সচেতন না। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা অস্ত্র না পেয়ে ইরান নিজেই দেশের অভ্যন্তরে অস্ত্রের কারখানা গড়ে তুলেছে। যেসব অস্ত্রের ক্ষমতা বহির্বিশ্বের কাছে এখনও অজানাই রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হবে। যা নিশ্চিতভাবেই ইরানকে বাড়তি সুবিধা দেবে।

২০০৩ সালে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের সেনাবাহিনীকে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে গুড়িয়ে দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় দুর্বল হলেও তা সাদ্দাম হোসেনের ওই সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। ইরানের বাহিনী অনেক বেশি সংগঠিত ও আদর্শিকভাবে দায়বদ্ধ। পাশাপাশি ইরানের পর্বতময় ভূ-পৃষ্ঠ  যে কোন যুদ্ধে ইরানকেই এগিয়ে রাখবে।

আক্রান্ত হলে প্রতিবেশী দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে তাৎক্ষণিকভাবে হামলা চালানোর সক্ষমতা ইরানের ভালো মতোই আছে। একই সঙ্গে বহির্বিশ্বে তেল সরবরাহে বন্ধ করে দেয়া ইরানের জন্য সময়ের ব্যাপারমাত্র। সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের সঙ্গে কোন সংঘাতেই জড়িয়েই পড়ে, সে যুদ্ধ শেষ করার সক্ষমতা তাদের নেই।

(আল-জাজিরায় প্রকাশিত নিবন্ধের ভাবানুবাদ)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *