ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে কাশ্মীরের পর্যটন শিল্প

ভারত লিড নিউজ

জম্মু-কাশ্মীর, ভারত- ভারত অধিকৃত জম্মু-কাশ্মীরের শ্রীনগরের ডাল লেকের পাড়ের শৈল্পিক কারুকাজে সুশোভিত হাউসবোটগুলো বছরের এই সময়টাতে স্বাভাবিকভাবেই পর্যটকে ঠাসা থাকত। কিন্তু ভ‚-স্বর্গখ্যাত এই উপত্যকার স্বায়ত্বশাসন ও বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেয়ার পর গত তিন সপ্তাহ ধরে একেবারেই খালি। কিছুদিন আগেও যেসব রাস্তাঘাট স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকের পদভারে গমগম করত সেই একই জায়গা এখন মরুভূমির মতো পড়ে আছে।

মোড়ে মোড়ে কাঁটাতারের বেড়া, নিরাপত্তা বাহিনীর তল­াশি চৌকি আর লাখ লাখ সেনা-পুলিশের অবিরাম টহল। নেমে এসেছে স্থবিরতা। পরিণাম ধ্বংসের মুখে এক সময়ের সমৃদ্ধ পর্যটন শিল্প। বিপর্যস্ত কাশ্মীরের অর্থনীতি। পর্যটক সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নেমে আসায় বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা।

জম্মু-কাশ্মীরকে যেন প্রকৃতি সাজিয়েছে তার নিজের মতো করে। সুন্দর এ রাজ্য সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ভ্রমণের জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় স্থান। শুধু ভারতের মুকুট হিসেবেই নয়, সারা বিশ্বের মানুষের কাছে ভ‚-স্বর্গ হিসেবে পরিচিত জম্মু-কাশ্মীর। অঞ্চলটির পাহাড়, ঝরনা ও তুষারপাতের জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় হলেও অন্যান্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যও বিমোহিত করে তাদের।

অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে প্রতি বছর দেশ-বিদেশের লাখ লাখ পর্যটক এখানে ছুটে আসেন। পর্যটকদের ভিড় সামলাতে রীতিমত হিমসিম খেতে হত কাশ্মীরবাসীর। কিন্তু হঠাৎই জম্মু-কাশ্মীরের ৩৭০ ধারা বাতিলের ঘোষণা। তার আগেই ‘সন্ত্রাসী হামলা’র হুশিয়ারি দিয়ে অ্যাডভাইজরি জারি করে তৎক্ষনাৎ পর্যটকদের উপত্যকা ছাড়ার নির্দেশ দেয়া হয়। এরপরই গণহারে ভ‚-স্বর্গ ছাড়ে পর্যটকেরা।

ডাল লেকের এক হাউসবোটের মালিক ইয়াকুব বলেন, প্রতিটি হাউসবোট, ‘হোটেল এমনকি রাস্তা থেকে একটা একটা করে পর্যটক বের করে দিয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। এখনও কেউ রয়ে গেছে কিনা চেক করতে হোটেলে হোটেলে তল­াশি চালানো হচ্ছে।’ রাস্তাঘাট, ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্কসহ সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেয় কর্তৃপক্ষ। ফলে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন ও অসম্ভব হয়ে পড়ে পর্যটকদের জন্য। কর্তৃপক্ষের অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্তে বিরক্তি প্রকাশ করে তাইওয়ানের এক পর্যটক দম্পতি বলেন, আমরা এমনটা প্রত্যাশা করিনি। প্রায় এক বছর আগে থেকে পরিকল্পনা করে কাশ্মীর আসি আমরা।’

ব্রিটিশ আমল থেকে কাশ্মীর একটা আন্তর্জাতিক পর্যটন কেন্দ্র। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর এর জনপ্রিয়তা আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কাশ্মীরে ভারতের কঠোর দমনপীড়নের প্রেক্ষিত্রে ১৯৮৯ সালে সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন শুরু হওয়ার থেকে ধীরে ধীরে পর্যটনে ভাটা পড়তে থাকে। এরপরও এক হিসাবে ২০১২ সালে ‘প্রাচ্যের সুইজারল্যান্ড’ খ্যাত কাশ্মীরে ১৩ লাখ পর্যটক ছিল। সংঘাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমতে কমতে ২০১৮ সালে ৮ লাখ ৫০ হাজারে এসে ঠেকে। কিন্তু চলতি বছর পর্যটক বাড়ার সম্ভাবনা ছিল। রেল ও উড়ানের টিকিট বিক্রির বহরে এবার অনেকটাই এগিয়ে ছিল ভূস্বর্গ। গতবছরের তুলনায় ৩৫ শতাংশ বেশি ব্যবসার আশাও ছিল।

বছরের প্রথম সাত মাসেই প্রায় ছয় লাখ পর্যটক পায় উপত্যকা। গত মাসেও নতুন করে এসে পৌছায় আরও দেড় লাখ। জুলাই মাস পর্যন্ত ছিল তিন লাখ ৪০ হাজার তীর্থযাত্রী। কিন্তু সন্ত্রাসী হামলার ভয় দেখিয়ে আগস্টের প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই তাদের সবাইকেই বের হয়ে যেতে বলা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই একেবারে নীরব হয়ে যায় উপত্যকা। ৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫০ জন বিদেশি কাশ্মীর ভ্রমণ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে লাটে উঠেছে কাশ্মীরের পর্যটন শিল্প। ফি বছর ৫০ কোটি ডলারের শিল্প এক ধাক্কায় শুন্যের কোঠায় চলে এসেছে। বেকার হয়ে পড়েছে এ খাতের অন্তত এক লাখ মানুষ। উপত্যকার এই নাজুক পরিস্থিতিতে দার্জিলিং, সিকিমের মত পাহাড়ি জায়গায় পর্যটক বাড়বে বলে আশাবাদী ভ্রমণ সংস্থাগুলো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *