ইসরাইলের সেনাবাহিনীতে ইউরোপ-আমেরিকার হাজার হাজার নাগরিক

মধ্যপ্রাচ্য

তেলআবিব, ইসরাইল- ফিলিস্তিনে ইসরাইলের পক্ষে যুদ্ধ করছে ইউরোপ ও আমেরিকার অন্তত ৭ হাজার যোদ্ধা। মূলত বিভিন্ন দেশের ইহুদি পরিবারের তরুণ ছেলে-মেয়েরা ইসরাইল রাষ্ট্র ও এর নাগরিকদের সুরক্ষার জন্য দেশটির সেনাবাহিনীতে (আইডিএফ) স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে। তবে নিয়মিত সেনাদের চেয়ে এদের বেতন-ভাতা প্রায় দ্বিগুণ। এসব সেনাদের বেশিরভাগেরই ইসরাইলে কোনো পরিবার নেই। এজন্য তাদেরকে প্রায়ই ‘নিঃসঙ্গ সেনা’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

ইসরাইলের সংবাদ মাধ্যম হারেৎস জানিয়েছে, এদের থাকার জন্য ‘লোন সোলজার সেন্টার’ নামে আধুনিক ও উন্নত আবাসিক ব্যবস্থাও করা হয়েছে। বিদেশি সেনা নিয়োজের জন্য ‌লোন সোলজার প্রজেক্ট’ বলে একটি বিশেষ প্রক্রিয়াও রয়েছে। এই সেনারা ইসরাইলের জন্য উৎসর্গপ্রাণ হওয়ায় বেশিরভাগ সেনাকে সম্মুখ যুদ্ধে পারদর্শী ‘কমব্যাট ইউনিটে’ মোতায়েন করা হয়। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী-সব বিভাগেই রয়েছে তারা।

প্রায় প্রতিদিনই বিদেশ থেকে নতুন নতুন যোদ্ধা ইসরাইলে আসছে। সারা বছরই তাদের ভিড় লেগে থাকে বেন গুরিয়ান এয়ারপোর্টে। গত সপ্তাহেই এমন প্রায় ৩০০ তরুণ যোদ্ধার অভ্যার্থনার জন্য আয়োজন করা হয় জাকজমকপূর্ণ বিশাল অনুষ্ঠান। এদের বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ইহুদি পরিবার থেকে আসা। ‘গারিন জাবার’ (ইসরাইলের স্কাউট আন্দোলন) নামে এক নিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে তাদেরকে ইসরাইলে আনা হয়েছে। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে হবু সেনাদেরকে ‘সত্যিকার বীর’ হিসেবে সম্মাননা দেয়া হয়।

তরুণ যোদ্ধাদের শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেন, ‘ইসরাইলের প্রতি কতটা উৎসর্গপ্রাণ তোমরা! কতটা সংহতি! কতটা প্রতিশ্র“তিশীল! তোমাদের জন্য আমাদের অবিরাম ভালবাসা।’ তাদেরকে প্রশংসায় ভাসিয়ে প্রেসিডেন্ট রিউভেন রিভলিন বলেন, ‘তোমরাই সত্যিকারের জায়োনিস্ট তথা ইহুদি।’ এই তরুণদেরকে ‘ইহুদিবাদের প্রকৃত দৃষ্টান্ত বলে মন্তব্য করেন জিউইশ এজেন্সির চেয়ারম্যান আইসাক হেরজগ।

গাজায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ ইসরাইলের গণহত্যা চলছেই। হাজার হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হচ্ছে। হাজার হাজার আহত ও গৃহহারা। নির্বিচারে গ্রেফতার, বসতবাটি ধ্বংস এবং বর্ণবিদ্বেষী আচরণ চলছে ফিলিস্তিনিদের প্রতি। পশ্চিম তীর ও ইসরাইল রাষ্ট্রের ভেতরÑ দুই জায়গাতেই হচ্ছে এসব। তদুপরি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে রিক্রুট করে আনা বিদেশীরা এসব যুদ্ধাপরাধে সরাসরি মদদ যোগাচ্ছে।

ইউরোপিয়ান আর মার্কিনিদের ইসরাইলি সেনাবাহিনীতে কাজ করা নতুন কোনো ব্যাপার নয়। ইসরাইল রাষ্ট্রের জš§ হওয়ার আগেই ইহুদিবাদী আন্দোলনে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী রিক্রুট করা হয়েছিল পশ্চিমা দেশগুলো থেকে। এই প্রক্রিয়ার নাম ছিল ‘মাহাল’ বা বিদেশ থেকে স্বেচ্ছাকর্মী আনা। ব্রিটিশ আমলে ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী সামরিক অভিযানে অংশ নেয়ার জন্য এদের আনা হয়েছিল।

১৯৪৮ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও ইউরোপের চার হাজার এমন যোদ্ধা ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে অপারেশনে অংশ নিয়েছিল, যারা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খ্যাতিমান সৈনিক। গোলন্দাজ, নৌবাহিনী ও আকাশযোদ্ধাদের তৎপরতাসহ যুদ্ধের বিভিন্ন দিকে তাদের যে দক্ষতা ছিল, তা দিয়ে ইহুদিবাদী প্রকল্প বাস্তবায়নে তারা স্বেচ্ছাসেবা দিয়েছে।

ইসরাইল সৃষ্টির পরও বিদেশী ইহুদি যোদ্ধা সংগ্রহ শেষ হয়ে যায়নি। আজও তা রয়েছে অব্যাহত। ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবী ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর সব ক’টি শাখায় কাজ করার জন্য স্রোতের মতো আসছে। বিদেশী রিক্রুটের ঘোষিত লক্ষ্য, ইসরাইলকে ‘রক্ষা করা’ এবং ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর সাথে ওদের সম্পর্ক জোরদার করে তোলা।’

ইসরাইলের নাগরিক না হলেও ইহুদিরা ১৮ মাস ইসরাইলি সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য হিসেবে কাজ করতে পারে। অধিকৃত ফিলিস্তিনি এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ইসরাইলের যারা বাধ্যতামূলকভাবে সামরিক দায়িত্ব পালন করছে তাদের মতোই এই বিদেশীরাও যুদ্ধক্ষেত্রে একেবারে সামনের সারিতে লড়াই করতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *