মুয়াম্মার গাদ্দাফির হত্যায় ফ্রান্সের হাত ছিল, নতুন নথি ফাঁস

আফ্রিকা মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

ত্রিপোলি, লিবিয়া- লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির সরকারের পতন ও তার হত্যায় ফ্রান্সের হাত ছিল। নতুন করে ফাঁস হওয়া বেশ কিছু নথিতে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে। লিবিয়ায় আগ্রাসনের সময় সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনের কাছে পাঠানো হয় তিন হাজার গোপন ইমেইল। সম্প্রতি এসব ইমেইল ফাঁস হয়ে গেছে। আরবি দৈনিক রাই আল-ইয়াওম এ তথ্য জানিয়েছে।

পত্রিকাটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই তিন হাজার ইমেইলের সারসংক্ষেপ হচ্ছে, আফ্রিকার মহাদেশের ওপর নিজের আধিপত্য বাজয় রাখা এবং লিবিয়ার তেল সম্পদের সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার করার লক্ষ্যে ফ্রান্স গাদ্দাফি সরকারের পতন ঘটানোর লক্ষ্যে ন্যাটো জোটের সামরিক শক্তিকে ব্যবহার করেছে। ওই তিন হাজার ইমেইল ২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিন্টনকে পাঠানো হয়েছিল।

২০১১ সালে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে গণঅভ্যুত্থান হয় এবং এর জের ধরে কয়েকটি দেশের সরকারের পতন ঘটে। উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর বেনগাজি থেকে গাদ্দাফি সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু হয়। গাদ্দাফি হত্যাকান্ডের আগে হঠাৎই ত্রিপোলিতে গিয়ে হাজির হন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন। সেখানে তিনি সবাইকে অবাক করে দিয়ে ঘোষণা করেন, আশা করছি, শিগগিরই তাকে ধরা যাবে এবং হত্যা করা হবে।

বুঝতে অসুবিধা হয় না, গাদ্দাফির মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়েই তিনি ত্রিপোলি যান এবং ওই সগর্ব ঘোষণা প্রদান করেন। এরপর আর বিলম্ব হয়নি। ন্যাটো বিমান গাদ্দাফির গাড়ি বহরের ওপর বোমা হামলা চালায়। বোমা হামলাতেই তার মৃত্যু হতে পারতো। অল্পের জন্য তিনি রেহাই পান। আশ্রয় নেন নর্দমার পাইপের ভেতর। সেখান থেকে তাকে টেনে-হিঁচড়ে বের করা হয় এবং অত্যন্ত অপমানজনকভাবে ও বর্বরোচিত পন্থায় হত্যা করা হয়। হিলারি ক্লিনটনের ঘোষিত দন্ডাদেশ কার্যকর করা হয়।

দৃশ্যত গণ অভ্যুত্থানে গাদ্দাফি সরকারের পতন হলেও এই ঘটনায় মূল অনুঘটকের কাজটি করে ন্যাটো জোট। জোটের নামে মূল হামলাটি চালিয়েছিল ফ্রান্সের সেনাবাহিনী।

হিলারি ক্লিন্টনের কাছে পাঠানো ইমেইলগুলোতে বলা হয়েছে, ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস সারকোজি পাঁচটি লক্ষ্যকে সামনে রেখে ন্যাটোর মাধ্যমে লিবিয়ায় হামলা চালিয়েছিলেন। লক্ষ্যগুলো হচ্ছে, লিবিয়ার তেল সম্পদের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা, উত্তর আফ্রিকার সাবেক উপনিবেশগুলোতে ফ্রান্সের প্রভাব ধরে রাখা, সারকোজির আঞ্চলিক সুনাম বাড়ানো, ফ্রান্সের সামরিক শক্তিমত্তা প্রদর্শন এবং পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে গাদ্দাফির প্রভাব ক্ষুণ্ন করা।

১৯৪২ সালে এক সাধারণ বেদুইন পরিবারে জন্মগ্রহণকারী গাদ্দাফি ছিলেন আগাগোড়া একজন দেশপ্রেমিক। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের কট্টর বিরোধী। একই সাথে তিনি ছিলেন অসীম সাহসী একজন লড়াকু সৈনিক। চিন্তা চেতনায় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ। বরাবরই তিনি ছিলেন ব্যতিক্রম চরিত্রের অধিকারী। লিবিয়ায় তখন চলছিল রাজা ইদ্রিসের শাসন। লিবিয়ার তেল-গ্যাস পশ্চিমারা লুটেপুটে খাচ্ছিল। লিবিয়া ছিল পশ্চিমাদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। ইদ্রিস ছিল পশ্চিমাদের পুতুল। তরুণ গাদ্দাফি এসব মেনে নিতে পারেননি।

১৯৬৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর তরুণ কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফি রক্তপাতহীন এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাজা ইদ্রিসকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন। সেই থেকে একটানা ৪২ বছর তিনি লিবিয়াকে শাসন করেছেন এবং পশ্চিমাদের হাতে জীবন দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *