বিশ্বে ‌’জরুরি জলবায়ু সংকট’ ঘোষণা ১১ হাজার বিজ্ঞানীর

লিড নিউজ লিড্স অব দ্যা ওয়ার্ল্ড

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে পুরো বিশ্ব এখন জরুরি অবস্থার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। সুদূরপ্রসারী ও স্থায়ী কোন পদক্ষেপ না নিলে ‘অবর্ণনীয় মানব ভোগান্তি’ নেমে আসবে। বিশ্বের ১৫৩টি দেশের প্রায় ১১ হাজার বিজ্ঞানী এমন হুশিয়ারি দিয়েছেন। বিভিন্ন ক্ষেত্রের ৪০ বছরের তথ্য-উপাত্ত নিয়ে করা এক গবেষণায় এমন হুশিয়ারি দেন তারা। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘বায়ো-সায়েন্সে’ মঙ্গলবার প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনটির পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন ওই ১১ হাজার বিজ্ঞানী।

ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, জেনেভায় ১৯৭৯ সালে হওয়া বিশ্বের প্রথম জলবায়ু সম্মেলনের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যে এটি প্রকাশ করা হয়েছে। বিজ্ঞানীদের ভাষ্য, বর্তমানে বিশ্বনেতারা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সংকট চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা জানান, বিশ্ববাসীকে এ সংকটের হুমকির পরিধি সম্পর্কে জানানো তাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।

বিবিসি বলছে, সংকট মোকাবেলায় আমূল ও টেকসই পরিবর্তন ছাড়া বিশ্ব ‘অবর্ণনীয় দুর্ভোগের’ পথেই এগিয়ে যাচ্ছে বলে এ গবেষনায় সতর্ক করা হয়েছে। গবেষকরা বলছেন, নৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণেই তারা এ ভয়াবহ হুমকির মাত্রা নিয়ে সতর্ক করছেন।

উপগ্রহের তথ্যানাসুরে, রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে গত মাসই (অক্টোবর) ছিল বিশ্বের সবচেয়ে উষ্ণতম। নতুন ওই গবেষণায় বলা হয়, কেবল ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা থেকেই বৈশ্বিক উষ্ণতার সত্যিকারের বিপদের মাত্রা বোঝা যায় না। সংকটের প্রকৃত স্বরূপ দেখাতে তারা বিভিন্ন ক্ষেত্রের তথ্য-উপাত্তও হাজির করেছেন, যা গত ৪০ বছরের জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নগুলোর সচিত্র সংকলন।

গবেষকদের দেয়া এ সূচকগুলোর মধ্যে আছে, মানুষ ও প্রাণীকূলের সংখ্যা বৃদ্ধি, মাথাপিছু মাংস খাওয়া ও উৎপাদন বৃদ্ধি, বিশ্বজুড়ে বনাঞ্চল হ্রাস এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ইত্যাদি। গবেষণা প্রতিবেদনে গত কয়েক দশকে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধির ইতিবাচক দিকের কথাও এসেছে। বলা হয়েছে, প্রতি দশকে বায়ু ও সৌর ব্যবস্থাপনা ৩৭৩ শতাংশ হারে বাড়লেও ২০১৮ সালেও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার এগুলোর চেয়ে ২৮ গুণ বেশি ছিল।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বেশিরভাগ গুরুত্বপূর্ণ সূচকের ক্ষেত্রেই বিশ্ব এখন বিপরীত দিকে হাঁটছে, যার ফলশ্রুতিতে সৃষ্টি হয়েছে জলবায়ু নিয়ে জরুরি পরিস্থিতি। গবেষণার প্রধান লেখক সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. থমাস নিউসাম বলেন, ‘জরুরি অবস্থার অর্থ হচ্ছে যদি আমরা কার্বন নিঃসরণ না কমাই, গবাদিপশু উৎপাদন না কমাই, ভূমির বিনাশ ও জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার না কমাই, তাহলে পরিস্থিতি এখনকার চেয়েও ভয়াবহ আকার নেবে।’

সংকট মোকাবেলায় বিজ্ঞানীরা এখনই জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে উচ্চহারে কার্বন ফি নির্ধারণ, জীবাশ্ম জ্বালানি নিয়ে কাজ করা কোম্পানিগুলোকে ভর্তুকি দেয়া বন্ধ, তেল ও গ্যাসের স্থানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি করতে বলেছেন। মিথেন, হাইড্রোফ্লুরোকার্বনের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে।

জমি ধ্বংস ঠেকানো, বন, তৃণভূমি ও ম্যানগ্রোভ বন (এগুলো বিপুল পরিমান কার্বন শোষণ করে) পুনরুদ্ধার করা এবং এর পরিমাণ বাড়াতে হবে। মানুষের খাদ্যভ্যাস বদলে ফেলতে হবে- বিশেষ করে মাংসে আসক্তি কমানো, খাদ্য অপচয় কমানো। পাশাপাশি কার্বন নিঃসৃত জ্বালানি নির্ভর অর্থনীতি ও প্রবৃদ্ধি থেকে সরে আসা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো সংকট মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নিলেও বিশ্বজুড়ে জলবায়ুকেন্দ্রীক নানা আন্দোলনে আশার আলো দেখা যাচ্ছে বলেও গবেষণা প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে। ড. নিউসাম বলেন, ‘আমরা কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বাড়িয়েছি, তাপমাত্রা বাড়িয়েছি। ৪০ বছর ধরে আমরা এটি জানি এবং ঠেকানোরও কোনো ব্যবস্থাও নিচ্ছি না। আমরা যে ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে যাচ্ছি তা বুঝতে রকেট বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন নেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *