বাবরি মসজিদের জায়গায় হবে মন্দির, বিকল্প জমি পাবে মুসলিমরা: ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়

ভারত লিড নিউজ

(নয়াদিল্লি, ভারত) বাবরি মসজিদ মামলার চূড়ান্ত রায় দিয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। অযোধ্যার বিতর্কিত ওই ভূমিতে মন্দির নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ আদালত। সেই সঙ্গে ওই জমির পরিবর্তে অযোধ্যার অন্য কোনো স্থানে মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলিমদের ৫ একর ভূমি দেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় মামলার রায় ঘোষণা শুরু করেন সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈর নেতৃত্বাধীন পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ।

১৯৯২ সালের ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদ গুড়িয়ে দেয় কট্টর হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো। পরে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। দীর্ঘ শুনানির পর ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের তিন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত প্যানেল বাবরি মসজিদের ভূমি তিন ভাগে ভাগ করে বণ্টনের আদেশ দেয়। আদালত মুসলিম ওয়াকফ বোর্ড, নির্মোহী আখড়া আর রামনালা পার্টিকে সেখানকার ২.৭ একর জমি সমানভাগে ভাগ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম দুই পক্ষই সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ করে আপিল করে।

শনিবার দেয়া এই রায়ে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত ওয়াকফ বোর্ডের আর্জি এবং নির্মোহী আখড়া উভয় পক্ষের দাবি খারিজ করে দেন। আদালতের নির্দেশনায় বলা হয়, পৌনে ৩ একরের ওই স্থানে মন্দির হবে, তবে তা হবে একটি ট্রাস্টের অধীনে। আর মসজিদের জন্য কাছাকাছি অন্য স্থানে ৫ একর জমি দিতে হবে সরকারকে।

এর মধ্য দিয়ে বিতর্কিত ওই জমির ওপর বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কর্তৃত্বও খর্ব হল, যারা মন্দির নির্মাণের জন্য মসজিদটি ভেঙেছিল। জমিটি এখন ট্রাস্টের অধীনে চলে যাবে এবং ট্রাস্টি বোর্ড মন্দির নির্মাণসহ সেটির দেখভালের দায়িত্বে থাকবে।

রায় অনুযায়ী, আগামী তিন মাসের মধ্যে একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করবে সরকার। পরে সেখানে মন্দির প্রাঙ্গণ নির্মাণ করবে তারা। পরিবর্তে মুসলিমরা অযোধ্যার অন্য স্থান থেকে মসজিদ নির্মাণের জন্য ৫ একর জমি পাবে।

রায় ঘোষণার একপর্যায়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, হিন্দুরা বিশ্বাস করেন এখানেই রামের জন্মভূমি ছিল। তবে কারও বিশ্বাস যেন অন্যের অধিকার না হরণ করে। আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়ার (এএসআই) খননের ফলে যেসব জিনিসপত্র পাওয়া গেছে, তাতে স্পষ্ট যে সেগুলো ইসলামিক নয়। তবে এএসআই একথাও বলেনি যে, তার নিচে মন্দিরই ছিল। রায়ে প্রধান বিচারপতি বলেছেন, বাবরের সহযোগী মির বাকি মসজিদ তৈরি করেছিলেন, তবে কবে মসজিদ তৈরি হয়েছিল, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

অযোধ্যায় মোগল আমলে তৈরি বাবরি মসজিদটি ভেঙে ফেলার পর ভারতে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গায় কমবেশি দুই হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়। মসজিদটির জমির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেটি গুঁড়িয়ে দেয় কট্টরপন্থী হিন্দুরা। তাদের দাবি, বাবরি মসজিদের জায়গাতেই ভগবান রামের জন্ম হয়েছিল। রামমন্দির ভেঙে সেখানে মসজিদ তৈরি করা হয়েছিল। তবে মুসলিমরা বলছেন, মন্দির ভেঙে মসজিদ তৈরির কোনো প্রমাণ নেই। তাদের দাবি, বলপূর্বক ঐতিহাসিক মসজিদটি ভেঙে দেয় উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা। তাই সেখানে মসজিদটি পুনঃস্থাপনই যৌক্তিক।

রায় ঘোষণার আগ দিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশের সব রাজ্যে নিরাপত্তা জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছে। উত্তর প্রদেশের অযোধ্যা শহর এখন নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়েছে। গত ২০ অক্টোবর থেকে অযোধ্যা শহরে জারি রয়েছে ১৪৪ ধারা। ১০ নভেম্বর থেকে এই শহরে জারি হচ্ছে কারফিউ। এই সান্ধ্য আইন অযোধ্যা মামলার রায় ঘোষণার পর চারদিন পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

অযোধ্যার নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে প্রায় চার হাজার আধা সামরিক সেনা। উত্তর প্রদেশের ধর্মীয় স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া ভারতজুড়ে ব্যাপক ধরপাকড় করা হয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, পাঁচশ’র বেশি লোককে গ্রেফতার করা হয়েছে। নজরদারি বাড়ানো হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *