নাবালিকার সঙ্গে যৌনতার অভিযোগ অস্বীকার ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রুর

আমেরিকা ইউরোপ

(লন্ডন, ব্রিটেন) তিনি প্রভাবশালী ধনকুবের। নাবালিকাদের সঙ্গে যৌন সম্পর্ক, মেয়ে পাচার ও নারীঘটিত অন্যান্য অপরাধ ছিল তার জীবনের নিত্যসঙ্গী। এর মধ্যে শিশু–কিশোরী পাচার ও জোর করে যৌনদাসীর কাজ করানোর মতো গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনে সঙ্গে মেলামেশার অভিযোগ। এসব নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে মুখ খুলেছেন ব্রিটেনের প্রিন্স অ্যান্ড্রু। ডিউক অব ইয়র্ক স্বীকার করে নিয়েছেন, যা করেছেন তা উচিত হয়নি। তার আচরণ রাজপরিবারের মুখ পুড়িয়েছে। তবে অল্পবয়স্কা এক নাবালিকার সঙ্গে যৌনতায় মিলিত হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তিনি।

২০১৫ সালে ফ্লরিডার আদালতে এপস্টাইনের বিরুদ্ধে চলা একটি মামলার সূত্রে অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে যৌন হেনস্থার অভিযোগ এনেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার ভার্জিনিয়া রবার্টস নামে এক নারী। অভিযোগে তিনি জানান, ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সালের মধ্যে তাকে তিন-তিন বার জোর করে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে বাধ্য করা হয়। একবার লন্ডনে, একবার নিউইয়র্কে ও আরেকবার এপস্টেইনের ব্যক্তিগত একটি ক্যারিবীয় দ্বীপে।

ফ্লোরিডার আইন অনুযায়ী সেই সময়ে ভার্জিনিয়া ছিলেন নাবালিকা। অভিযোগ, মার্কিন পুঁজিপতি এপস্টেইন দেশ-বিদেশের প্রভাবশালীদের হাতে রাখতে এ ভাবেই ‘যৌনদাসী’ জোগান দিতেন। ভার্জিনিয়ার কোমর জড়িয়ে অ্যান্ড্রুর ছবি প্রকাশ্যে আসায় সেই অভিযোগ আরও পোক্ত হয়। এপস্টাইনের ম্যানহাটনের বাড়ির দরজায় দাঁড়িয়ে  অ্যান্ড্রুর এক তরুণীর দিকে হাত নাড়ার ছবিও সেই সময়ে প্রকাশ হয়েছিল।

সবকিছু মিলিয়ে ব্রিটিশ রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের তৃতীয় সন্তানের বিরুদ্ধে তথ্য-প্রমাণের অভাব ছিল না কখনও। ২০১০ সালে নিউইয়র্ক সেন্ট্রাল পার্কে এপস্টেইনের সঙ্গে তোলা অ্যান্ড্রুর একটি ছবি প্রকাশিত হয়। আর তার দেই বছর আগেই এক নাবালিকাকে প্রকাশ্যে পতিতাবৃত্তিতে নামার প্রস্তাব দেয়ার অভিযোগে জেল খেটেছেন এপস্টেইন। এমন কুখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে প্রিন্সের ঘনিষ্ঠতা কোনও দিন স্বীকার করেনি পরিবার। অবশেষে এপস্টেইনের মৃত্যুর তিন মাস পর নীরবতা ভাঙলেন অ্যান্ড্রু নিজেই।

অগস্টে নিউইয়র্কের একটি জেলে উদ্ধার হয় ৬৬ বছরের এপস্টাইনের লাশ। তদন্তে দাবি করা হয়, বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে আত্মঘাতী হন তিনি। কিন্তু আত্মহত্যা নাকি খুন সে ব্যাপারে বিতর্ক রয়েছে বিভিন্ন মহলে। এর পর-পরই ফের এপস্টেইন-অ্যান্ড্রু সম্পর্ক নিয়ে খোঁড়াখুঁড়ি শুরু হয়। ব্রিটিশ চ্যানেলের নেয়া সাক্ষাৎকারে এপস্টাইনের সঙ্গে তার মেলামেশার কথা স্বীকার করেন প্রিন্স। রানির অনুমতি নিয়ে বাকিংহাম প্যালেসে বসেই নেওয়া হয় এই সাক্ষাৎকার। যদিও এত কিছুর পরেও ভার্জিনিয়ার ‘কথা’ মনেই করতে পারলেন না তিনি।

ভার্জিনিয়ার দাবি অনুযায়ী, ২০০১ সালে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে নৈশাহার সেরে তারই এক বন্ধুর বাড়িতে রাত কাটিয়েছিলেন দুজনে। সাক্ষাৎকারে সেই প্রসঙ্গ ওঠায় অ্যান্ড্রু বলেন, ‘‘এই নারীর সঙ্গে কখনও, কোথাও দেখা হওয়ার কথা মনে করতে পারছি না।’ অ্যান্ড্রু বলেন, ‘আপনি যদি পুরুষ হয়ে থাকেন, তাহলে কারও সঙ্গে সেক্স করাটা একটি ইতিবাচক কাজ। আর কোনো ইতিবাচক কাজ ভুলে যাওয়াটা খুব কঠিন। কিন্তু এমন কিছু আমার মনে পড়ছে না।’গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সাক্ষাৎকারে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর কণ্ঠ বার বার কাঁপছিল। এমনকি তোতলাচ্ছিলেন।

তাহলে ‘এপস্টেইনের ‘কুকর্মের’ কথা জানার পরেও কেন তার সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছিলেন’ এমন প্রশ্নের জবাবে অ্যান্ড্রু বলেন, ‘এই কাজের জন্য রোজ নিজেকে দোষারোপ করেছি। রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে ওই কাজ ঠিক হয়নি। ব্রিটিশ রাজপরিবার যে উচ্চ মান ও আচরণ বজায় রাখে, তার মর্যাদাহানি ঘটিয়েছি।’ এপস্টাইনের মতো দাগি যৌন হেনস্থাকারীর বাড়িতে থাকার প্রসঙ্গেও মুখ খোলেন অ্যান্ড্রু। বলেন, ‘‘তখন ওটাই সুবিধাজনক মনে হয়েছিল। পরে বোধোদয় হওয়ার পরে বুঝি, আমি নিঃসন্দেহে ভুল করেছি।’

ভার্জিনিয়া রবার্টসের অভিযোগ, লন্ডনে ২০০১ সালের ১০ই মার্চ একটি নাইটক্লাবে পার্টি শেষে অ্যান্ড্রুর এক বন্ধু ম্যাক্সওয়েলের বাড়িতে তার সঙ্গে সেক্স করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রিন্স বলেন, ‘সে রাতে আমি শিশুদের সঙ্গে ছিলাম। আমি বিয়েট্রিসকে নিয়ে পিজ্জা এক্সপ্রেসে একটি পার্টিতে যাই সম্ভবত বিকেলে। তখন সারাহ (স্ত্রী) বাড়িতে ছিল না। আর পরিবারের মধ্যে এই নিয়ম ছিল যে, যদি একজন বাইরে থাকে, তাহলে আরেকজন বাড়িতে থাকবেন।’

ভার্জিনিয়া সঙ্গে অ্যান্ড্রুর জড়িয়ে ধরা একটি ছবি সম্পর্কে প্রিন্স বলেন, এ ধরণের ছবির বিষয়ে তার কিছুই স্মরণে নেই। তিনি বলেন, ছবিটি দেখে মনে হচ্ছে এটি সম্ভবত ম্যাক্সওয়েলের (ওই বন্ধু) বাসার উপরের তলায় তোলা হয়েছে। তিনি নিজের বক্তব্যের স্বপক্ষে বলেন, রাজপরিবারের অংশ হিসেবে তিনি কাউকে জড়িয়ে ধরা বা এ ধরণের কাজ করেন না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই টুইটারে অ্যান্ড্রুর সঙ্গে বহু নারীর জড়িয়ে ধরার ছবি অনেকে শেয়ার করতে থাকেন।

শনিবার ওই সাক্ষাৎকার শেষে ভার্জিনিয়া এ ব্যাপারে টুইট করেন। তিনি বলেন, প্রিন্স অ্যান্ড্রুর ওই সাক্ষাৎকার মূলত নিজের সুনামকে রক্ষার জন্যই। কিন্তু এতে করে আরও অনেক প্রশ্ন হাজির হয়েছে।

সাক্ষাৎকারে প্রিন্স নিশ্চিত করে বলেছেন যে, নিজের রাজকীয় বাড়িতে এপস্টেইনকে তিনি আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। এমনকি ২০০৬ সালের মে মাসে এক অল্পবয়স্কা মেয়েকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে কারাগারে গিয়ে মুক্তি পাওয়ার পর তা উদযাপনে এপস্টেইন পার্টি করলে, সেখানে থাকার কথাও নিশ্চিত করেন প্রিন্স। এছাড়া প্রিন্স বিয়েট্রিসের ১৮তম জন্মদিনেও এপস্টেইনকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন প্রিন্স অ্যান্ড্রু। তবে তিনি দাবি করেন, এপস্টেইনের বিরুদ্ধে অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট জারির বিষয়ে তিনি অবগত ছিলেন না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *