সাংবাদিক খাসোগি হত্যা: যুবরাজ ঘনিষ্ঠরা খালাস, পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড

মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

রিয়াদ, সৌদি আরব- ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাসোগি হত্যা মামলায় অভিযুক্ত পাঁচজনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে সৌদি আরবের আদালত। অপর তিন জনকে ২৪ বছর কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। তবে খাসোগি হত্যার নেতৃত্ব দেয়া কিলিং স্কোয়াডের দুই প্রধান পরিকল্পনাকারীকে খালাস দেয়া হয়েছে। এ দু’জন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। প্রায় ১৫ মাস পর যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সৌদি সাংবাদিক খাসোগি খুনের এমন গা-বাঁচানো বিচার করল রিয়াদ। খবর বিবিসি ও এএফপির।

সৌদির সরকারি কৌঁসুলি শালান আল শালান সোমবার বলেন, খাসোগি হত্যায় ১১ জনের বিচার শুরু হয়েছিল। তাদের মধ্যে আটজনকে বিভিন্ন দণ্ড দেয়া হলেও হত্যায় অভিযুক্ত যুবরাজ সালমানের তৎকালীন উপদেষ্টা সৌদ আল কাহতানি ও গোয়েন্দা উপপ্রধান আহমেদ আল আসিরির বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি আরও বলেছেন, সৌদি আল কাহতানিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মতো কোনো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়নি বলে তাকে খালাস দেয়া হয়েছে। তবে কাদের সাজা দেয়া হয়েছে নির্দিষ্ট করে বলেননি শালান।

কাহতানি ছিলেন যুবরাজ সালমানের খুব ঘনিষ্ঠদের একজন। মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) তদন্তে জানতে পারে, খাসোগি হত্যায় সালমান নিজের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা কাহতানিকে ১১টি বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কাহতানি হত্যা মিশনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারীর দায়িত্বে ছিলেন। আর সৌদি গোয়েন্দা সংস্থার উপপ্রধান মেজর জেনারেল আহমেদ আল-আসিরি ১৫ জনের কিলিং স্কোয়াড গঠন করেন।

সিআইএ খাসোগি হত্যা তদন্তের উপসংহারে জানায়, যুবরাজ সালমানের নির্দেশেই খাসোগিকে হত্যা করা হয়েছে। তবে তদন্ত শেষে যুবরাজ সালমান ও তার উপদেষ্টা সৌদ আল কাহতানির মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান হওয়া মোট ১১টি বার্তায় কী লেখা ছিল, তা প্রকাশ করেনি সিআইএ। তারা জানায়, সরাসরি খাসোগিকে হত্যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন কিনা, সে তথ্য তাদের কাছে নেই।

খাসোগি খুনের ঘটনাটিকে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন জাতিসংঘের এক বিশেষজ্ঞ। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বিষয়ক জাতিসংঘ তদন্ত কর্মকর্তা অ্যাগনেস ক্যালামার এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যুবরাজকেও তদন্তের আওতায় আনতে বলেছিলেন। এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৮ জনকে আটক করে সৌদি আরব।

এছাড়া পাঁচ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়। তাদের মধ্যে কাহতানি ও আসিরি ছিলেন। বছরের শুরুতে ১১ জনের বিরুদ্ধে বিচার শুরু করে রিয়াদ। গত জুনে ক্যালামার বলেন, ফাহাদ শাবিব আলবালায়ি, তুর্কি মুসেরেফ আলশেহরি, ওয়ালিদ আবদুল্লাহ আলশেহরি, মাহের আবদুল আজিজ মুত্রেব এবং ফরেনসিক ডাক্তার সালাহ মোহাম্মদ তুবাইগি মৃত্যুদণ্ড দেয়া উচিত। বাকি ছয়জন হলেন, মানসুর ওসমান আবু হোসাইন, সাদ আলজাহরানি, মুস্তফা আলমাদানি, মুফলিহ শায়া আলমুসলিহ, কাহতানি এবং আসিরি।

ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক খাসোগি ছিলেন যুবরাজ সালমানের কট্টর সমালোচক। খাসোগি ২০১৮ সালের ২ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে অবস্থিত সৌদি কনসল্যুটে মর্মান্তিকভাবে খুন হন। পরে তদন্তে জানা যায় যুবরাজ সালমানের নির্দেশে ১৫ সদস্যের একটি কিলিং স্কোয়াড কনসল্যুটের ভেতরে তাকে হত্যা করতে দুটি বিমান নিয়ে তুরস্কে গিয়েছিল।

তুরস্কের একটি টেলিভিশনের প্রচারিত সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ওই ১৫ জন আততায়ী তুরস্ক বিমানবন্দরে প্রবেশের পর হোটেলে উঠছে। খাসোগি কনস্যুলেটে প্রবেশের ঘণ্টাখানেক আগে কিছু গাড়ি দূতাবাসে ঢুকতে দেখা গেছে। তারা খাসোগিকে হত্যার পর সেদিনই দুটি বিমানে করে সৌদি আরবে চলে যায়।প্রথমে অস্বীকার করলেও পরে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ঘটনার ১৭ দিন পর সৌদি আরব স্বীকার করে কনস্যুলেট ভবনের ভেতরে, ‘হাতাহাতির একপর্যায়ে খাসোগির মৃত্যু হয়েছে’।  

গত বছর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ক্ষমতা গ্রহণের পর রোষানলে পড়েন খাসোগি। তিনি দেশ ছেড়ে স্বেচ্ছানির্বাসনে চলে যান যুক্তরাষ্ট্রে। ওয়াশিংটন পোস্টে যুবরাজ মোহাম্মদের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে একের পর এক কলাম লেখেন। তাই অভিযোগ উঠে, যুবরাজের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় এ হত্যা সংঘটিত হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *