জেনারেল কাশেম সুলাইমানির পরিচয়-১

মধ্যপ্রাচ্য লিড্স অব দ্যা ওয়ার্ল্ড

রাত তখন একটার কাছাকাছি। বাগদাদ এয়ারপোর্টের কার্গো এরিয়া দিয়ে রাতের আঁধার ভেদ করে শাঁ শাঁ করে ছুটে যাচ্ছে দুটি গাড়ি। মাথার উপর চক্কর দিচ্ছে ক্যালিফফোর্নিয়ার জেনারেল এটমিকসের তৈরি একটি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন। গাড়ির আরোহীরা হয়ত নতুন কোন কৌশল (স্ট্রাটেজি) নিয়ে আলাপ করছিলেন। কিন্তু তাদের মাথার উপরেই ১১ মিটার দৈর্ঘ্যের ড্রোনটি সব স্ট্রাটেজির সমাপনী নিয়ে ঘুরঘুর করছিল তাদের অজান্তেই।

কিছুক্ষণ পর প্রথম গাড়িটি লক্ষ্য করে পরপর দুটি লেজার গাইডেড হেলফায়ার মিসাইল ছোঁড়া হয়, দ্বিতীয় গাড়িটি লক্ষ্য করে ছোঁড়া হয় আরেকটি। দুই গাড়ির ছোট্ট কনভয়টি দুমড়ে মোচড়ে যায় আরোহী সমেত। ড্রোনটি উড়ে এসেছিল কাতারস্থ আমেরিকান সেন্ট্রাল কমান্ড হেডকোয়ার্টার থেকে।

এই আক্রমণটি বিবেচিত হচ্ছে একুশ শতকের সবচেয়ে ঝঞ্ঝাবহুল হত্যাকাণ্ড হিশেবে। অনেকেই একে তুলনা করছেন ১৯১৪ তে নিহত হাঙ্গেরির প্রিন্স ফার্দিন্যান্ডের হত্যাকান্ডের সাথে, যার ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বেঁধে গিয়েছিল।

কনভয়ের আরোহীদের মাঝে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম জাদরেল সমরবিদ ও ইরানের সেনাবাহিনীর রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের সবচেয়ে চৌকস শাখা কুদস ফোর্সের কমান্ডার মেজর জেনারেল কাসেম সোলাইমানি ও তার সহযাত্রী ইরাকি শিয়া নেতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিস (মুহান্দিস তার পেশাগত উপাধি, আরবি এই শব্দটির অর্থ ইঞ্জিনিয়ার)। তিনি কাতায়েব হিযবুল্লাহ নামক ইরাকি শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপের নেতা। পাশাপাশি হাশদ আল শাবি বা পপুলার মবিলাইজেশন (পিএম) এর নেতাও।

পিএম হচ্ছে ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের একটি প্লাটফর্ম। পিএমের সদস্যরা বর্তমান ইরাক আর্মড ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত। সেই সাথে পিএম মূলধারার রাজনীতিতেও সক্রিয়। প্রায় চল্লিশটি শিয়া মিলিশিয়া গ্রুপ নিয়ে গঠিত। সদস্য সংখ্যা দেড়লাখের মত। এরা ইরাকের বাইরেও সক্রিয়। সিরিয়ার কুখ্যাত আলেপ্পো/হালব এবং বাঘুজের যুদ্ধে এরা আসাদের পক্ষে লড়াই করেছে।

এই পয়েন্টটি বেশকিছু কারণে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আবু মাহদি ইরাকের সামরিক বাহিনির একাংশের নেতা। ইরাকি পার্লামেন্টারিয়ানরা যে এই আক্রমণকে ইরাকি সার্ভভৌমত্বের লঙ্ঘন হিশেবে দেখছে তার পিছনে অন্যতম কারণ এটিও। পাশাপাশি সুলাইমানি ডিলেমার ক্ষেত্রেও এটি বিবেচ্য। কারণ আবু মাহদির কাতায়েব হিযবুল্লাহ (কাতায়েব অর্থ ব্রিগেড) ইরানি জেনারেল সুলাইমানির দিকনির্দেশনায় চলত, আবার মাহদির পিএম ইরাক আর্মড ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত। একই সাথে দেশের ও দেশের বাইরের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত।

এদ্বারা সুলাইমাইনির গুরুত্বও বুঝা যায়। সে শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন শিয়া মিলিশিয়াদের নেতাই ছিল না, বরং রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলোতেও তার সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছিল, তাও ভিন্ন রাষ্ট্রের।

রেভ্যুলেশনারি গার্ড:

১৯৭৯ তে রেজা শাহ পাহলভিকে হটিয়ে ক্ষমতায় আসে ইসলামি রেভ্যুলুশনারিরা। পাহলভি ছিল পুরোমাত্রায় সেনাবাহিনিনির্ভর। তাই ইসলামি বিপ্লবিরা পূর্বের গতানুগতিক সেনাবাহিনির উপর আস্থা রাখতে পারে নি। তারা বিপ্লবের সমর্থক ও রক্ষক আলাদা বাহিনি গঠন করে, যার নাম সিপাহ-এ-পাসদারানে ইনকিলাবে ইসলামি। ইংরেজিতে রেভ্যুলুশনারি গার্ড, পুরো নাম-ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোপস।

ইরানের মূল সেনাবাহিনির নাম আরতেশ জমহুরিইয়া ইসলামি ইরান বা ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান আর্মি। রেভ্যুলুশনারি গার্ড মূল সেনাবাহিনি থেকে সম্পূর্ণ আলাদা প্রতিষ্ঠান। এদের সদস্য প্রায় এক লাখ বিশ হাজারের মত। এদের আলাদা গ্রাউন্ডফোর্স, নেভি, এয়ারফোর্স ও ইন্টেলিজেন্স রয়েছে। এমনকি দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় এরা দাঙ্গা দমন ও রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষার কাজও করে। এই কাজটি মূলত করে থাকে বাসিজ মিলিশিয়ার মাধ্যমে।

বাসিজ মিলিশিয়া:

বাসিজ্ মিলিশিয়া ইরানের একটি স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন, যারা দাতব্য কাজ করে থাকে এবং বিপ্লবের লাঠিয়াল হিশেবে কাজ করে, অনেকটা ছাত্রলীগের মত আরকি। এদের সোলজার প্রায় নব্বই হাজার, রিজার্ভ রয়েছে তিন লাখ। রেভ্যুলুশনারি গার্ড এই গ্রুপটি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এখানে একটি তথ্য প্রাসঙ্গিক- কিছুদিন আগে ইরানে যে সরকার বিরোধি আন্দোলন হয়েছে, তাতে এই বাসিজ মিলিশিয়া সরকারের পক্ষে মিছিল করেছে এবং আন্দোলনকারীদেরকে নির্বিচারে হত্যাকরার জন্য সরকারকে আহবান জানিয়েছে।

কুদস ফোর্স:

এর পাশাপাশি রেভুলুশনারি গার্ডের আন্তর্জাতিক ফোর্সও রয়েছে, যার নাম কুদস ফোর্স। এরা ইরানের বাইরে ইরানের স্বার্থে লড়াই করে। এদের মাধ্যমেই মূলত ইরান আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার করে। এরা সরাসরি সিরিয়া, ইয়ামেন, লেবাননের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছে। হামাস, ইসলামিক জিহাদ সহ অসংখ্য গেরিলা দলকে সামরিক সহায়তা, প্রশিক্ষন ও অস্ত্রশস্ত্র প্রদান করে। জেনারেল কাশেম সুলাইমানি ছিলেন এই কুদস ফোর্সের প্রধান।

আঞ্চলিক খেলোয়াড়। এজন্যই মূলত সে এত লাইমলাইটে। কারণ তার কর্মস্থল ইরানের বাইরে। গোটা অঞ্চল জুড়ে। জেনারেল কাশেম সোলাইমানি শুধু ইরানের নয়, পুরো আরব বিশ্বের বীর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। ক্যারিশম্যাটিক কমান্ডার হিসেবে সারা পৃথিবীতে পরিচিতি পেয়েছিলেন। তার বুদ্ধি-সাহস, নেতৃত্বের গুণাবলী ও যুদ্ধক্ষেত্রের বিচক্ষণতার গল্প ছিলো মানুষের মুখে মুখে। পৃথিবীর ‘এক নম্বর’ জেনারেল হিসেবে বিবেচিত সোলাইমানির নাম ছিলো বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষ গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ ও মোসাদের হিট লিস্টের ‘এক নম্বরে’।

বিহাইন্ড দ্য সিনঃ

ঘটনার শেকড় যদিও অনেক গভীরে। কিন্তু সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূচনা আমেরিকার ইরানের সাথে নিউক্লিয়ার চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে। ৮ মে, ২০১৯ এ আমেরিকা এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। তারপর দুইদফা ইরানের উপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে, যা ইরানের অর্থনৈতিক দুর্দশাকে আরো বৃদ্ধি করেছে। সুলাইমানির মৃত্যু অনেকাংশে এই অর্থনৈতিক খেলচালের সাথে জড়িত।

অর্থনৈতিক অবরোধ উঠিয়ে নেওয়ার জন্য আমেরিকা ১২ টি শর্তারোপ করে, বলাবাহুল্য ইরান তা মানেনি। তার পূর্বেই এপ্রিলে ইরান রেভ্যুলুশনারি গার্ড ও কুদস ফোর্সকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিশেবে তালিকাভুক্ত করে আমেরিকা। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রধান সামরিক বাহিনিকে এভাবে সন্ত্রাসী সংগঠন হিশেবে তালিভুক্তি খুবই বিরল।

আমেরিকা এর পিছনে বহির্দেশে কুদস ফোর্সের সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে কারণ হিশেবে দেখায়। একটা উদাহরণ হচ্ছে ২০১১ সালে জর্জটাউনে এক রেস্টুরেন্টে বোমা হামলা হয়, উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যা করা। এই ঘটনার পিছনে কুদস ফোর্স কলকাঠি নেড়েছে এবং হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করা হয়।

১২ মে তে ফুজাইরা বন্দরে আরব আমিরাতের চারটি শিপ আক্রান্ত হয়। এর জন্য ইরানকে দায়ী করা হয়, যদিও ইরান ঘটনার সাথে সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে। এর পরপরই ১৯ মে বাগদাদে আমেরিকান দূতাবাসের পাশে একটি মিসাইল নিক্ষিপ্ত হয়, এই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও দোষটা আবারও ইরানের কাঁধেই যায়। জুনে ইরান আমেরিকান ড্রোন ভূপাতিত করে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা এফ-২২ র‍্যাপটর স্টিলথ মোতায়েন করে এই অঞ্চলে।

জুলাইতে রেভ্যুলুশনারি গার্ড বৃটেনের পতাকাবাহী একটি জাহাজ আটক করে হরমুজ প্রণালি থেকে, অভিযোগ ছিল তারা ইরানের সার্বভৌমত্বকে যথার্থ সম্মান করেনি। সেপ্টেম্বরে হুত্থিরা আক্রমণ করে সৌদির আরামকো তেলক্ষেত্রে, যা সৌদির দৈনিক মোট উৎপাদনের ৫% কমিয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে এটি ছিল একটি বড়সড় ধাক্কা। খুব স্বাভাবিকভাবেই দায়টা চাপে ইরানের কাঁধে।

সর্বশেষ ধাক্কাটা আসে ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ। সেদিন সুলাইমানির সাথে নিহত আবু মাহদির কাতায়েব হিযবুল্লাহর রকেট হামলায় কিরকুকে আমেরিকান এক কন্ট্রাক্টর মারা যায়। প্রতিশোধে ২৯ তারিখ তারাও আল কাইম ও আরো দুটি শহরে কাতায়েবের ঘাঁটিতে বিমান হামলা চালায় যাতে ২৫ জন নিহত ও ৫৫ জনের মত আহত হয়।

এই নিহতের প্রতিবাদে কাতায়েব সমর্থকরা বিক্ষোভ বের করে, সেখান থেকে ৩১ তারিখ বাগদাদের গ্রিন জোনে আমেরিকান দূতাবাসে হামলা ও ভাংচুর চালায়। এর পরপরই ট্রাম্প ইরানকে দায়ি করে টুইট করেছেন- তাদেরকে এর চড়া মূল্য দিতে হবে, এটা ওয়ার্নিং নয়, হুমকি। তার পরই তিন তারিখে সুলাইমানি নিহত হন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *