পাকিস্তান যেভাবে আমেরিকার কাছ থেকে বাবর ক্রুজ মিসাইলের প্রযুক্তি হাতিয়ে নিয়েছিল

আমেরিকা পাকিস্তান

পাকিস্তান তার অত্যাধুনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বশেষ পরীক্ষা চালায় ২০১৮ সালের এপ্রিলে। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি বাবর-৩ নামের এ ক্ষেপণাস্ত্র ৭০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

আইএসপিআরের পক্ষ থেকে বলা হয়, বাবর-৩ ক্ষেপণাস্ত্র ভূমি ও সমুদ্রে নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম। জিপিএস প্রযুক্তির অনুপস্থিতিতেও সফলভাবে লক্ষ্যে আঘাত হানতে পারবে বাবর। বাবুর-৩-এর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল এটি শত্রুর রাডার, বিমান প্রতিরক্ষা, ব্যালিস্টিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম ফাঁকি দিতে পারে।

বাবুর-৩ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষার মাধ্যমে পাকিস্তানের পরমাণু ত্রয়ীর শেষ ধাপ সম্পন্ন হয়। পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে পরমাণু শক্তি স্থিতিশীল করার ক্ষেত্রে পরমাণু ত্রয়ী সক্ষমতা তৈরি অপরিহার্য। ফলে বাবুর-৩-এর মাধ্যমে পাকিস্তানের পরমাণু অস্ত্রভান্ডার দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত সমতা প্রতিষ্ঠা করে।

বিশ্লেষকের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্রটির সাথে চীনের ডিএইচ-১০ এবং যুক্তরাষ্ট্রের টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সাদৃশ্য রয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে এর মিল থাকার কারণ আমেরিকার কাছ থেকে কৌশলে এ প্রযুক্তি হাতিয়ে নিয়েছিল পাকিস্তান।

২০০১ সালে নাইন ইলেভেন হামলার পর ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় পাকিস্তানের কাছে তাদের এয়ারস্পেস ব্যাবহারের অনুমতি চায় তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বুশ প্রশাসন। তবে এই অনুমতি কিন্তু কোনো বিমান উড়ানোর জন্য চাওয়া হয়নি। আমেরিকার টার্গেট ছিল ওসামা বিন লাদেন।

বুশ সরকার তখন লাদেনকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে রয়েছিল। তারা চেয়েছিল পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের উপর দিয়ে আফগানিস্থানে লাদেনের ঘাটিতে টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করতে। হামলার সময় এবং তারিখ জেনে নিয়ে পাকিস্তান আমেরিকাকে এয়ারস্পেস ব্যাবহারের অনুমতি দিয়ে দেয়।

টমাহক ক্রুজ মিসাইল হচ্ছে আমেরিকার ভান্ডারে থাকা প্রধান ক্রুজ মিসাইল।  এই মিসাইলটিকে তারা গণহারে ব্যাবহার করে। টমাহক খুব নিচু দিয়ে উড়তে পারে বলে শত্রু রাডার ফাকি দিয়ে আকস্মিকভাবে হামলা চালিয়ে শত্রুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করতে সক্ষম। মিসাইলটি ইন্টারন্যাল এবং স্যাটেলাইট গাইডেন্সের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

এদিকে আমেরিকাকে অনুমতি দিলেও তলে তলে পাকিস্তানের মতলব ছিল অন্যরকম। বেলুচিস্তান প্রদেশের উপর দিয়ে যে রুট ধরে মিসাইলগুল যাবে, সেদিকে পাকিস্তান বেশ কিছু শক্তিশালী জ্যামিং সিস্টেম বসিয়ে দেয়।

হামলার দিন মার্কিন নৌবাহিনীর একটি আর্লেজ-বুর্ক ক্লাস ডেস্ট্রয়ার জাহাজ আরব সাগরে দাড়িয়ে থেকে কয়েক ডজন টমাহক ক্রুজ মিসাইল নিক্ষেপ করে। মিসাইলগুলো পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে আফগানিস্থানের ৩ টি স্থানে আঘাত করে।

আমেরিকা যেন পাকিস্তানের চালবাজি টের না পায় সেজন্য পাকিস্তান বেশিরভাগ মিসাইল গুলোকেই চলে যেতে দেয়। কিন্তু কয়েকটি মিসাইলের বিরুদ্ধে শক্তিশালী জ্যামার ব্যাবহার করে স্যাটেলাইটের সাথে মিসাইলগুলোর যোগাযোগ ব্যাবস্থা নষ্ট করে দেয়। স্যাটেলাইট গাইডেন্স হারিয়ে উক্ত মিসাইলগুলো অবিষ্ফোরিত অবস্থায় বেলুচিস্তান প্রদেশের বিভিন্ন স্থানে পড়ে।

আমেরিকা তখনই পাকিস্তানের এই চালবাজি টের পেয়েছিল কিনা সেটা জানা যায়নি। তবে কয়েক বছর পর ঠিকই টের পেয়েছিল। ২০০৫ সালের ১২ আগস্ট পাকিস্তান সর্বসম্মুখে ঘোষণা করে যে তারা পারমাণবিক অস্ত্রবহনে সক্ষম একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে, যার পাল্লা প্রায় ৫০০ কিলোমিটার।

২০০৭ সালের ২২ মার্চ পাকিস্তান বাবরের আরেকটি উন্নত সংস্করণের পরীক্ষা চালায়, যার পাল্লা ছিল ৭০০ কিমি। ২০০৯ সালের ৬ মে আরেকটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করে। তবে রাজনৈতিক বিভিন্ন কারনে ২০০৯ সালের ৯ মে পর্যন্ত এই বিষয়ে কোন ঘোষণা দেয়া হয়নি। এই ঘটনাটা আমাদেরকে আরেকটি বার্তা প্রদান করে, কেবল আমেরিকাই সবসময় গুটিবাজি করে না, তারাও মাঝে মাঝে উল্টো গুটিবাজির শিকার হয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *