ভারতে শীতের রাতে বিক্ষোভকারীদের কাথা-কম্বল কেড়ে পুলিশ

ভারত

নয়াদিল্লি, ভারত- ভারতে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি রুখতে এবার দমনপীড়নের নয়া পন্থা নিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। রাতের অন্ধকারে নারী বিক্ষোভকারীদের লেপ-কম্বল কেড়ে নিল যোগী আদিত্যনাথ সরকারের পেটুয়া বাহিনী। কেড়ে নেয়া হয় থালা-বাসন, খাবারও। শনিবার রাতে লক্ষ্ণৌয়ের ওল্ড কোয়ার্টারের কাছে ঘণ্টাঘর এলাকায় এমনই দৃশ্য চোখে পড়ল।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যেই সেই ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। তাতে যোগী সরকারের দমননীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন দেশটির সচেতন নাগরিকরা। এদিকে দিল্লির শাহিনবাগে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেয়া নারীরা নরেন্দ্র মোদিকে ‘চায়ে পে চর্চার’ আমন্ত্রণ জানিয়ে তাকে চিঠি লিখেছেন। কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করে মোদি সরকারের আইনের বিরোধিতায় রাতের পর রাত কাটাচ্ছেন শাহিনবাগের নারীরা। সিএএ, প্রস্তাবিত জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার (এনপিআর) এবং জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) প্রত্যাহারের দাবিতে অনড় তারা। খবর এনডিটিভির।

সিএএ এবং এনআরসি বিরোধিতায় পাঁচ শতাধিক নারী গত একমাস ধরে দিল্লির শাহিনবাগে অবস্থান বিক্ষোভ করছেন। তাদের অনুপ্রেরণাতেই শুক্রবার থেকে ঘণ্টাঘরের কাছে জমা হয়েছিলেন উত্তরপ্রদেশের নারীরা। ছিল শিশুরাও। প্রচণ্ড ঠান্ডা থেকে বাঁচতে লেপ-কম্বল নিয়ে বসেছিলেন তারা। কিন্তু সন্ধ্যা পেরোতেই সেখানে হাজির হয় পুলিশের একটি দল। লেপ-কম্বল কেড়ে নিতে শুরু করে তারা। খাবার এবং থালা-বাসনও বাজেয়াপ্ত করা হয়।

শনিবার তোলা এক মোবাইল ফোন ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী প্রতিবাদী কয়েকজন পুলিশের দিকে ছুটে গিয়ে প্রশ্ন করছেন, কেন তাদের কম্বল তুলে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ? মহিলা ও শিশুদের জন্য খাবার ও কম্বল নিয়ে আসা এক শিখ ব্যক্তি বলেন, কিছু পুলিশ আমাদের থামাতে চাইছে।

পুলিশের এই ভূমিকা নিয়ে ইতিমধ্যেই সমালোচনার ঝড় উঠেছে সর্বত্র। সোশ্যাল মিডিয়ায় উত্তরপ্রদেশ পুলিশকে ‘কম্বল চোর’ বলে দাগিয়েছেন কেউ কেউ। আবার কটাক্ষও করেছেন কেউ কেউ। প্রশ্ন উঠেছে, ‘প্রভুরা ওই কম্বল মুড়ি দিয়ে ঠিকঠাক ঘুমিয়েছেন তো?’ কোন আইনে বিক্ষোভকারীদের কম্বল কেড়ে নেয়া হল, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

নিন্দার ঝড় উঠেছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। তবে সে সবে কান দিতে নারাজ উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। তাদের তরফে একটি বিবৃতি প্রকাশ করে বলা হয়, ‘ঘণ্টাঘরের কাছে বেআইনি বিক্ষোভ চলছিল। অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও তাঁবু খাটানোর চেষ্টা চলছিল। একটা দল কম্বল বিলি করছিল। যারা বিক্ষোভে অংশ নেননি, তারাও কম্বল নিতে এসেছিলেন। সেখান থেকে ভিড় হঠাতেই আমাদের নামতে হয়। আর তা করতে গিয়েই নিয়ম মেনে কম্বল বাজেয়াপ্ত করা হয়।’

এদিকে, শাহিনবাগে হলদেটে পোস্টকার্ডের লেখা, ‘নো সিএএ-এনআরসি-এনপিআর’, ‘সংবিধান বাঁচাতে বসেছি’। কখনও উঠে এসেছে সেই অমর লাইন, ‘হিন্দি হ্যায় হম’। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বছর পঞ্চাশের এক মহিলা বলেন, ‘এটা এমনই এক সময়, যখন আমরা নিশ্চিন্ত হতে চাই যে ধর্মের জন্য আমাদের সন্তানদের নাগরিকত্ব যাতে কেড়ে নেয়া না হয়।’ নিজের আশঙ্কার কথা বলতে গিয়ে তার প্রশ্ন, ‘আমার বয়স হয়েছে, কিছু দিন পরে মরেও যাব। কিন্তু আমার সন্তানেরা, নাতিনাতনিরা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দোরগোড়ায়। লোকের মনে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার ভয় জেকে বসেছে।’

এমন সব আশঙ্কাকে দূর করতেই প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাস চায় শাহিনবাগ। মোদির প্রতি ওই মহিলার আহ্বান, ‘দেশের প্রধানমন্ত্রীকে শাহিনবাগে আসার আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। আসুন, আমাদের সঙ্গে চা খেতে খেতে দেখুন আমাদের লড়াই, শুনে যান আমাদের দুশ্চিন্তার কথা।’

গত কয়েক মাস ধরে ভারতে সিএএ-বিরোধী বিক্ষোভ চলছে। এ আইনানুসারে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালের আগে আগত ছয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শরণার্থীদের নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তাতে বাদ পড়েছে মুসলিমরা। সমালোচকদের মতে, এই আইন বৈষম্যমূলক ও ভারতীয় সংবিধান পরিপন্থী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *