ট্রাম্প-নেতানিয়াহুর `মধ্যপ্রাচ্য শান্তি চুক্তি’তে আসলে কি আছে?

আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য

ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘ দিন ধরে চলে আসা সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো ‘মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা’ নিয়ে কাজ করে আসছে। তাদের এই পরিকল্পনায় ‘দুই রাষ্ট্র সমাধান’ এর ওপরই জোর দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ইসরাইলের কট্টর সমর্থক ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি সরাসরি ইসরাইলের দিকে ঝুঁকে পড়েন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ট্রাম্প প্রশাসনই সবচেয়ে বেশি ইসরাইল-ঘেঁষা নীতি নিয়ে চলছে। তার আমলেই ওয়াশিংটন কয়েক দশকের পুরোনো দুই রাষ্ট্র নীতি থেকে সরে আসে। শুধু তাই নয়, জেরুসালেমকেও ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়। আর ফিলিস্তিনিদের জন্য সহায়তা তহবিলের পরিমাণ কোটি ডলার কমানো ও ফিলিস্তিনে ইসরাইলের দখলকে আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয় বলে দেওয়া ঘোষণার মতো বিষয়গুলো তো রয়েছেই।

ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ মীমাংসার জন্য ‘মধ্প্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা’ বলে গত বছর ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সাথে একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করেন ট্রাম্প।  চুক্তিটির নাম দেয়া হয়েছে ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ বা শতাব্দীর সেরা চুক্তি। এর কয়েক মাস পর চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করার কথা থাকলেও বারবার এর সময় পিছিয়েছে।

চলতি সপ্তাহেই ট্রাম্প আবার ঘোষণা দিয়েছেন, খুব শিগগিরই চুক্তিটি প্রকাশ করবেন তিনি। প্রকাশের আগে গত বছরের জুলাই মাসে ইসরাইলের একটি পত্রিকায় ওই পরিকল্পনার সারাংশ প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়, মধ্যপ্রাচ্যে ফিলিস্তিন নামে কোনো দেশ থাকবে না। ফিলিস্তিনের নতুন নাম হবে নিউ প্যালেস্টাইন। চুক্তিটি স্বাক্ষরের আগে ফিলিস্তিনি নেতাদের সাথে কোনো আলোচনাই করেননি ট্রাম্প। কিন্তু ট্রাম্পের এই চুক্তি না মানলে প্রয়োজনে ফিলিস্তিনি নেতাদের হত্যা করার হুমকি দেয়া হয়।

চুক্তিটি বাস্তবায়নে ট্রাম্প সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে তার পাশে পেয়েছেন বলে ইসরাইলি পত্রিকার খবরে বলা হয়। সে সময় ফিলিস্তিনি নেতারা ট্রাম্পের এ চুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করেন। তারা বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও রাশিয়ার উচিত যুক্তরাষ্ট্রকে শক্ত জবাব দেয়া। ইসরাইলের ওই দৈনিকটির দেয়া তথ্য অনুযায়ী, নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলোই হবে চুক্তিটির মূল দফা।

১.  চুক্তি স্বাক্ষর:

ইসরাইল, পিএলও এবং হামাসের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে এবং ফিলিস্তিন নামে কোনো দেশ থাকবে না। চুক্তি অনুযায়ী নতুন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের নাম হবে নিউ প্যালেস্টাইন। গাজা উপত্যকা, যিহুদিয়া পার্বত্য এলাকা এবং পশ্চিম তীরের সামারিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত হবে এ রাষ্ট্রটি। তবে পশ্চিম তীরের ইসরাইলি বসতিগুলোর ওপর এ রাষ্ট্রের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। এসব বসতির সার্বভৌমত্ব থাকবে ইসরাইলের হাতে।

২. ভূমির ওপর সার্বভৌমত্ব:

চুক্তি অনুযায়ী জেরুসালেম নগরী ভাগ হবে না, এটি হবে উভয় দেশের রাজধানী। নগরীর আরব বাসিন্দারা নিউ প্যালেস্টাইনের নাগরিক হবেন এবং ইহুদিরা ইসরাইলি নাগরিক হিসেবে সেখানে বসবাস করবেন। ইহুদিরা আরবদের এবং আরবরা ইহুদিদের বাড়িঘর কিনতে পারবেন না। জেরুসালেমে নতুন আর কোনো এলাকা দখল করা হবে না। পবিত্র স্থানগুলোর বিদ্যমান অবস্থা বজায় থাকবে। তবে জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ থাকবে ইসরাইলের জেরুসালেম পৌরসভার হাতে। তবে সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। জেরুসালেম পৌরসভার কাছে ট্যাক্স ও পানির বিল প্রদান করবে নিউ প্যালেস্টাইন সরকার।

৩. গাজা:

চুক্তিতে বলা হয়েছে, ফিলিস্তিনে একটি বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য মিসর নতুন জমি দেবে। কলকারখানা নির্মাণ, বাণিজ্যিক ও কৃষি খাতে ব্যবহারের জন্যও নতুন ভূখণ্ড দেবে মিসর। তবে ফিলিস্তিনিরা এখানে বসবাসের সুযোগ পাবে না। লিজ বাবদ মিসরকে মূল্য পরিশোধ করবে নিউ ফিলিস্তিন। লিজ বাবদ ঠিক কী পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করা হবে তা নির্ধারণ করে দেবে মধ্যস্থতাকারী ও সহযোগী দেশগুলো।

৪. সহযোগী দেশ:

চুক্তি বাস্তবায়নে আর্থিক সহায়তা দেবে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। নিউ প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন প্রকল্পে পাঁচ বছরে ৩০ বিলিয়ন ডলার সহায়তা দেবে তারা। এর আওতায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে থাকা ইহুদি বসতিগুলোকে ইসরাইলের সাথে যুক্ত হবে। আন্তর্জাতিক সহযোগীরা যে অর্থ সহায়তা দেবে তার ২০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন ১০ শতাংশ দেবে। বাকি ৭০ শতাংশ তহবিলের জোগান দেবে মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। তেল বিক্রির অর্থ থেকে তারা এ সহায়তা দেবে। চুক্তি বাস্তবায়নের আর্থিক বোঝা তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলোকেই বইতে হবে। কেননা, এ চুক্তিতে তারাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে।

৫. সশস্ত্র বাহিনী:

নিউ প্যালেস্টাইনের কোনো সামরিক বাহিনী থাকবে না। দেশটির পুলিশকে কেবল হালকা অস্ত্র বহনের সুযোগ দেয়া হবে। দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সুরক্ষা চুক্তির আওতায় বিদেশী আগ্রাসন থেকে দেশ রক্ষায় ইসরাইলকে অর্থ দেবে নিউ প্যালেস্টাইন সরকার। মধ্যস্থতাকারী সহযোগী দেশগুলোকে নিয়ে এ অর্থের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। চুক্তি স্বাক্ষরকালে ফিলিস্তিনের গাজা নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন হামাস তার সব অস্ত্র মিসরের কাছে জমা দেবে। সরকার গঠনের আগ পর্যন্ত হামাসের নেতাকর্মীরা সহযোগী দেশগুলোর কাছ থেকে বেতন পাবেন। রাষ্ট্রগঠনের এক বছরের মাথায় নিউ প্যালেস্টাইনে নির্বাচন হবে। এর মধ্য দিয়ে একটি নতুন সরকার ক্ষমতায় আসবে।

৬. সীমান্ত:

নিউ প্যালেস্টাইন ও ইসরাইলের সীমান্ত জনগণের চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। নিউ প্যালেস্টাইনের পশ্চিমতীর ও গাজার মধ্যে সংযোগ স্থাপনে মহাসড়ক নির্মাণ করা হবে। এর অর্ধেক খরচ বহন করবে চীন। ১০ শতাংশ করে বাকি ৫০ শতাংশ অর্থের জোগান দেবে দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

৭. চুক্তিটি কার্যকর করার শর্তাবলি:

চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামাস এবং পিএলও যদি এ চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে, তাহলে দেশটিকে দেয়া সব মার্কিন সহায়তা বাতিল করা হবে। একইসাথে অন্য কোনো দেশও যেন তাদের অর্থ সহায়তা দিতে না পারে তাও নিশ্চিত করা হবে। এ ছাড়া ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন দল পিএলও যদি এ চুক্তি মেনে নেয় এবং হামাস ও ইসলামিক জিহাদ যদি চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে তাহলে এ দু’টি দলের নেতাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে গাজা উপত্যকার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে ইসরাইল। এ যুদ্ধে ইসরাইলের পক্ষ নেবে যুক্তরাষ্ট্র।

ফিলিস্তিনকে সৌদি যুবরাজের চাপ

ট্রাম্পের এ চুক্তি মেনে নিতে ফিলিস্তিনকে সৌদি আরব চাপ দিচ্ছে বলে খবর বেরিয়েছে। মিডল ইস্ট মনিটরের খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের প্রস্তাব মেনে নিতে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্টকে ১০ বিলিয়ন ডলার তহবিল দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। তবে তার ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে ফিলিস্তিন।

ট্রাম্পের পরিকল্পনা মেনে নিতে না পারলে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছেন সৌদি যুবরাজ। ইসরাইলি পত্রিকা হাওম ডেইলি জানিয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মিসর ও জর্ডান ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’ নামে ট্রাম্পের পরিকল্পনায় সমর্থন দিয়েছে।

এসব দেশের কর্মকর্তারা জানান, সৌদি আরব, আমিরাত, মিসর ও জর্ডান ট্রাম্পের জামাতা ইহুদি ধর্মাবলম্বী জ্যারেড কুশনারকে এ পরিকল্পনার প্রতি তাদের সমর্থনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ঘনিষ্ঠ কুশনার হোয়াইট হাউজের সিনিয়র উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করছেন।

ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের অনীহারও সমালোচনা করেন চার আরব দেশের কর্মকর্তারা। হামাসের পলিটব্যুরোর সদস্য ওসামা হামদান আল জাজিরাকে বলেন, ট্রাম্পের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ফিলিস্তিনকে চাপ দিতে আরব দেশগুলোকে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্র। তারা যে সমাধানের কথা বলছে সেটা কেবল ইসরাইলের স্বার্থ সংরক্ষণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *