বাংলাদেশে মুক্তা চাষে বড় সম্ভাবনা

বাংলাদেশ লিড নিউজ

ঢাকা, বাংলাদেশ- মুক্তা একটি মূল্যবান রত্ন। প্রাচীনকালে মুক্তার উৎপাদন কৌশল জানা ছিল না। তখন শুধুমাত্র প্রাকৃতিকভাবে উৎপাদিত মুক্তাই সংগ্রহ করা হতো। পরবর্তী সময়ে চীন এবং জাপানে ঝিনুকের মুক্তা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবিত হয়। আশার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশেও মুক্তাচাষের বড় সম্ভাবনা দেখা গেছে। এরই মধ্যে দেশীয় ঝিনুকে মুক্তাচাষের পদ্ধতি উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন বাংলাদেশের গবেষকরা। গবেষকদের বরাতে এ খবর দিয়েছে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড।

গবেষকরা বলছেন, উদ্ভাবিত এই মুক্তাচাষ দেশের ওষুধ শিল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি আনবে বৈদেশিক মুদ্রাও। মুক্তাচাষ পদ্ধতি সহজ হওয়ায় গ্রামীণ নারীদের স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।

মুক্তাচাষ নিয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই)। তারা বলছে, বাংলাদেশের মিঠাপানির জলাশয় মুক্তাবহনকারী ঝিনুকে পরিপূর্ণ। জলবায়ুও মুক্তাচাষের উপযোগী। প্রায় ১০ মাস উষ্ণ আবহাওয়া থাকায় ঝিনুকের বৃদ্ধি ও মুক্তাচাষের পরিবেশও অনুকূল এখানে। তাই এই খাতে ব্যাপক সম্ভাবনা দেখছেন তারা। তাই উদ্যোক্তা তৈরিতে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।

দেশীয় আবহাওয়ায় মুক্তাচাষে বেশ কয়েকজনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। তাদেরই একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবিনা আক্তার।

তিনি জানিয়েছেন, এলাকার খাল-বিল থেকে স্বাদু পানির প্রায় দুই হাজার ঝিনুক সংগ্রহ করেছেন তিনি। ঝিনুকের মধ্যে নিজেই অস্ত্রোপচার করে ইমেজ (মুক্তার বীজ) প্রতিস্থাপন করেছেন। পুকুরে মাছ চাষের পাশাপাশি ঝিনুকগুলোও বেড়ে উঠছে। নির্দিষ্ট সময় পর ঝিনুক থেকে মুক্তা আহরণ করা হবে। মুক্তাচাষের জন্য অস্ত্রোপচার কোনো কঠিন কাজ নয়। খুব অল্প খরচে সরঞ্জাম কেনা যায়।

লালমনিরহাটের মাছ চাষী রুহুল আমিন লিটন এক একর জমিতে মাছ চাষ করেন। মাছের পুকুরেই বাড়তি আয় আনতে মুক্তাচাষ শুরু করেছেন তিনি। এরই মধ্যে তিনি নয় মাস বয়সী ঝিনুক থেকে ২০০ মুক্তা সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করেছেন। যা থেকে তার আয় হয়েছে প্রায় দুই লাখ টাকা।

২০০ পিস মুক্তাচাষে তার ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়েছে জানিয়ে রুহুল আমিন আরও বলেন, তাকে দেখে এলাকার অন্য চাষীরা মুক্তাচাষে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। চাষ সহজ হলেও মুক্তা বিক্রির প্রক্রিয়াটি একটু জটিল। সরকার একটি আধুনিক বাজারের ব্যবস্থা করলে দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশে রফতানির সুযোগ বাড়বে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

দেশের স্বাদু পানিতে প্রথমবারের মতো মুক্তাচাষ পদ্ধতি বের করেছেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহসেনা বেগমের নেতৃত্বে একদল গবেষক।

ড. মোহসেনা জানান, প্রাথমিকভাবে সফলতা পাওয়ার পর এখন পর্যন্ত এক হাজার জনকে বিনামূল্যে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ৮০০ জনই নারী। বিএফআরআই থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের মধ্যে ১২ জন সফলভাবে প্রথম পর্যায়ে মুক্তা উৎপাদন করছেন। বাকিদের বড় অংশ চাষ শুরু করেছে। ইমেজ মুক্তা উৎপাদন প্রযুক্তি তুলনামূলক সহজ এবং বাণিজ্যিকভাবে করা সম্ভব। তাই প্রথমে এটির উপর নজর দেয়া হচ্ছে বেশি।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট জানায়, বর্তমানে বিশ্ব বাজারে মুক্তা রফতানিতে প্রথমে রয়েছে চীন। চীনের উৎপাদিত স্বাদু পানির মুক্তা বিশ্ব বাজারের ৯৫ শতাংশ দখল করে আছে। যার পরিমাণ বছরে প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার টন। যার প্রায় অর্ধেকেই এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা এবং আমেরিকায় রফতানি হয়।

এ সব দিক বিবেচনায় এ খাতে বাংলাদেশের অপার সম্ভাবনা দেখছেন গবেষকরা। তবে ঝিনুকের জাত নিয়ে কিছুটা বিপাকে রয়েছেন তারা। মুক্তা উৎপাদনে এগিয়ে থাকা দেশগুলো উন্নত জাতের ঝিনুক পাচ্ছে।

তবে বাংলাদেশে চাষিদের নির্ভর করতে হচ্ছে দেশীয় জাতের ছোট আকৃতির ঝিনুকের ওপর। তাই মুক্তার আকৃতির দিক দিয়ে পিছিয়ে পড়ছে চাষিরা। দুই থেকে তিন মিলিমিটারের বেশি বড় মুক্তা পাচ্ছেন না তারা। সমস্যা সমাধানে কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হোসেন জানান, দেশব্যাপী জরিপ চালিয়ে এ পর্যন্ত স্বাদু পানির ৫ ধরনের মুক্তা উৎপাদনকারী ঝিনুক পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যে ভিয়েতনাম থেকে কিছু উন্নত জাতের ঝিনুক সংগ্রহ করে গবেষণা করা হচ্ছে। ঝিনুকের আকৃতি বড় হলে মুক্তার আকার বড় হবে, এতে বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়বে। 

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, তিন ধরনের মুক্তাচাষে আমরা সক্ষম। প্রযুক্তি উদ্ভাবন করে মুক্তাচাষ পদ্ধতি উদ্যাক্তাদের দেওয়া হয়েছে। উৎপাদনের পর মুক্তা বাজারজাতের ব্যবস্থা করতে হবে। তাই বাজার ব্যাবস্থাপনা ও রপ্তানির সুযোগ তৈরিতে কাজ করছি আমরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *