নাগরিকত্বের প্রমাণ নেই মোদিরই

ভারত লিড নিউজ

নয়াদিল্লি, ভারত- ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কোনো নাগরিকত্ব সনদ নেই। নেই কোনো ধরনের কাগজপত্রই। তিনি ভারতীয় জন্মসূত্রে। রোববার এমনটাই জানিয়েছে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) চালুর পর তথ্য অধিকার আইনের (আরটিআই) মাধ্যমে মোদির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন করেন এক ভারতীয় নাগরিক। এর পরিপ্রেক্ষিতেই এ তথ্য জানিয়েছ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়। খবর ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য সিয়াসাত ডেইলি ও এনডিটিভির।

সিএএ চালুর পর গত ১৭ জানুয়ারি শুভঙ্কর সরকার নামে এক ভারতীয় তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে জানতে চান, মোদির নাগরিকত্বের সনদ রয়েছে কিনা। এর জবাবে রোববার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আন্ডার সেক্রেটারি প্রবীণ কুমার জানান, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী জন্মসূত্রে ভারতীয়। মোদির নাগরিকত্বের প্রশ্নে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের এ জবাবকে ‘অস্পষ্ট’ বলেছে হায়দরাবাদের উর্দুভাষী পত্রিকা সিয়াসাত।

সিএএ নিয়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভের মধ্যেই এই তথ্য রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে কাগজপত্রের দোহাই দিয়ে আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) তৈরি করে ৪০ লাখ মানুষের ভারতীয় নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হয়েছে। রাজ্যটিকে অবৈধ অভিবাসীমুক্ত করার কর্মসূচীর নামে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এর ফলে প্রত্যাবাসনের মুখে পড়ার ভয়ে অনেকেই আত্মহত্যা করেছেন। নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় রাজ্যের বহু মানুষকেই ‘ডিটেনশন ক্যাম্প বা বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় এর পরে নাগরিকত্বের কাগজপত্র- নথি চাওয়া হলে আমজনতাও যদি জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের দাবি তোলে তাহলে কি গ্রাহ্য হবে। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এর আগে জানিয়েছে, ২০১১ ও ২০১৫ সালের জাতীয় জনগণনা পঞ্জি প্রক্রিয়ার পরে দেয়া পরিচয়পত্র যাদের কাছে নেই তারা নাগরিক নন। দেশের মানুষের বড় অংশের কাছেই সেই পরিচয়পত্র নেই।

বিরোধীরা প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, তবে বিজেপি কাদের ভোটে জিতল, অনাগরিকদের। সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে প্রধানমন্ত্রীরই নাগরিকত্বের সার্টিফিকেট নেই। সেখানে কেন অন্য নাগরিকদের কাছে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে। এ কোন ধরনের দ্বিচারিতা।

সিমি পাশা নামের এক প্রবীণ সাংবাদিক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘১৯৫৫ সালের ভারতের নাগরিকত্ব আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী মোদির যদি নাগরিকত্ব নিবন্ধনের প্রয়োজন না হয়, তাহলে অন্যদের বেলায় এ নির্দেশ কেন?’ অবশ্য ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার বা এর শীর্ষ নেতাদের থেকে এই প্রশ্নের কোনো উত্তর এখনও মেলেনি।

গত বছরের আগস্টে আসামের এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়। এনআরসির পরই আসে সিএএ। বহুল বিতর্কিত এই আইনে আফগানিস্তান, পাকিস্তান, বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়া হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ও খ্রিষ্টানদের নাগরিকত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে বাদ দেয়া মুসলিমদের। পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই আইন বৈষম্যমূলক এবং ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের ভাবমূর্তির পরিপন্থি। এনআরসি ও সিএএ আইনের মাধ্যমে ভারতীয় মুসলিমদের রাষ্ট্রহীন করার চেষ্টা হচ্ছে।

শুধুমাত্র অমুসলিমদের নাগরিকত্ব নিশ্চিতে গত বছরের ডিসেম্বরে আইন সংশোধন করার পর থেকে এর বিরুদ্ধে ভারতজুড়ে অব্যাহত চলছে ব্যাপক প্রতিবাদ-বিক্ষোভ। গত দুই মাস ধরে চলমান এই বিক্ষোভে পুলিশ, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও সিএএ সমর্থক সরকারপন্থীদের সহিংস হামলায় এখন পর্যন্ত ৭৭ জন নিহত হয়েছে। এর মধ্যে গত এক সপ্তাহেই রাজধানী নয়াদিলি­র মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বিজেপি ও আরএসএস কর্মী-সমর্থকদের পরিকল্পিত সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৪৩ জন। এরমধ্যে ২১ জনই গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছে। আহত হয় দুই শতাধিক।

সিএএ’র জেরে সবচেয়ে নাজেহাল অবস্থায় রয়েছেন সেখানকার মুসলমানরা। তাদের প্রতিটা দিনই কাটছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি একটানা চারদিন দিলি­তে সিএএবিরোধীদের ওপর দফায় দফায় সহিংস হামলা চালায় সিএএ সমর্থকরা। পুলিশের সামনেই মাদ্রাসা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদসহ মুসলিমদের অসংখ্য বাড়িঘর ও দোকানপাটে বেছে বেছে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ‘জয় শ্রী রাম’ ধ্বনি দিয়ে মুসলমানদের প্রকাশ্যে পেটানো হয়। যে নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এত কিছু, সেখানে হঠাৎই জানা গেল, খোদ ভারতের প্রধানমন্ত্রীরই নাগরিকত্বের কোনো কাগজপত্র নেই।

আসামে তথাকথিত ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ চিহ্নিত করতে এনআরসি বাস্তবায়নের সময় নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে জমি এবং ব্যাংকের কাগজপত্রের নথি গ্রহণ করে ভারত সরকার। তবে দেশটির আদালত বলেছেন, ভোটার আইডি কার্ড, জমির রাজস্বের রসিদ, ব্যাংক স্টেটমেন্ট এবং স্থায়ী অ্যাকাউন্ট নম্বর (প্যান) কার্ডের কোনোটিই নাগরিকত্বের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কয়েক দশক ধরে ভারতে বসবাস করে এলেও গত বছরের আগস্টে এনআরসির পর বিদেশি ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় এক নারী আবেদন করলে আসামের গুয়াহাটি হাইকোর্ট তার এ আবেদন নাকচ করে দেয়।

ভারতের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে ভারতের আসামেই রয়েছে ছয়টি বন্দিশিবির। জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) ঘিরে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেককে বন্দি রাখা হয় ওই সব শিবিরে। খবরে আরও আসছে, আসাম রাজ্যে দেশটির সবচেয়ে বড় বন্দিশিবির নির্মাণের কাজ চলছে। আসামের রাজধানী গুয়াহাটি থেকে ১২৯ কিলোমিটার দূরে গোয়ালপাড়ার মাতিয়ায় ২৫ বিঘা জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে এই বন্দিশিবিরটি।

চারদিকে তোলা হয়েছে ২০ থেকে ২২ ফুট উঁচু দেয়াল। আসাম সরকারের সূত্র উল্লেখ করে সংবাদমাধ্যম জানায়, আরও ১০টি বন্দিশিবির তৈরি করা হবে আসামে। ২০০৯ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে আসামে ছয়টি বন্দিশিবির তৈরি হয়। তবে বন্দিশিবিরের বিষয়টি সবসময়ই অস্বীকার করে আসছে ভারত সরকার।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *