মিয়ানমারের জটিলতায় আটকা পড়ছে ভারত: সাউথএশিয়ান মনিটরের বিশ্লেষণ

পূর্ব এশিয়া ভারত

উচ্চাভিলাষী ৪৮৪ মিলিয়ন ডলারের কালাদান মাল্টিমোডাল প্রকল্প সম্পন্ন ও একে কার্যপোযোগী করে তুলতে ভারত সম্ভবত পুরোপুরি মিয়ানমারের সমস্যা হিসেবে পরিচিত একটি জটিলতায় জড়িয়ে পড়তে যাচ্ছে। সেটি হলো মিয়ানমারের উপকূলীয় প্রদেশ রাখাইনে (সাবেক আরাকান) শক্তিশালী হয়ে ওঠা বিদ্রোহ। মিয়ানমারের সাথে সুপরিচিত নীতি বিশ্লেষকেরা এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে পরামর্শ দিয়েছেন দিল্লিকে।

উত্তরাঞ্চালীয় রাজ্য কচিনে ২০০৯ সালে গঠিত আরাকান আর্মি (এএ) এখন বর্মি সামরিক বাহিনীর ওপর অব্যাহতভাবে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। এমনকি নগর এলাকাগুলোতেও তারা আক্রমণ করছে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ রাখাইন প্রদেশে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলছে। উল্লেখ্য, এই প্রদেশে চীন ও ভারত উভয় দেশই বড় বড় কানেকটিভিটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।

চীন কিয়াকফু গভীর সমুদ্রবন্দর শেষ করেছে এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণ করতে যাচ্ছে। একে ঘিরে আছে রেল রোড কানেকশন ও তেল-গ্যাস পাইপলাইন। এটি তাদের ইউনান প্রদেশকে যুক্ত করবে। ভারত সিত্তুই বন্দর সংস্কার করেছে এবং একে কালাদান নদী দিয়ে ভারতের মিজোরামের সাথে যুক্ত করতে চাচ্ছে।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সন্দেহ আরাকান আর্মি রাখাইনে একটি শক্তিশালী ঘাঁটিসহ একটি স্বাধীন জোন প্রতিষ্ঠা করতে চায়। মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণ থেকে রাখাইনকে মুক্ত করা তাদের লক্ষ্য। কিন্তু বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরাকান আর্মিকে দমন করতে অক্ষম মিয়ানমার। এই আর্মির ৭০০০-৮০০০ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে কচিনরা।

মিয়ানমার বিশেষজ্ঞ বার্টিল লিন্টনার বলেন, আরাকান আর্মি ভিন্ন ধরনের রণকৌশল গ্রহণ করেছে। তারা কোনো এলাকা দখলের চেষ্টা করছে না। তারা কঠোরভাবে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে হাওয়া হয়ে যায়। এ ধরনের উচ্চগতির চলমান যুদ্ধকৌশলের কোনো জবাব মিয়ানমার সামরিক বাহিনী কাছে নেই।

সামরিক বিশ্লেষক জন মুখার্জি বলেন, রাখাইন ঝামেলা থেকে ভারতকে দূরে থাকা উচিত। সামরিকভাবে তো সম্পৃক্ত হওয়াই উচিত হবে না, মিয়ানমার সামরিক বাহিনী হয়তো সেটা চাইতে পারে। অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল ও ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের সাবেক প্রধান মুখার্জি কলকাতাভিত্তিক নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক সেন্টার্স-কে-এর প্রধান। এই সংগঠনের পৃষ্ঠপোষকদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক জেনাপ্রধান জেনারেল শঙ্কর রায়চৌধুরী।

মুখার্জি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন, প্রকল্পটি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে মিজোরামের জন্য। কিন্তু আরাকান আর্মির মতো বিদ্রোহীদের সাথে লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়াটা ঠিক হবে না।

কয়েক বছরের বিলম্বের পর ২০১৮ সালে ভারত অবশেষে ১০৯ কিলোমিটারের সড়ক প্রকল্প নির্মাণকাজ শেষ করে। এটি পালেতওয়া নদীর টার্মিনাল থেকে মিজোরাম-মিয়ানমার সীমান্তের জরিনপুইকে যুক্ত করেছে। তবে এই প্রকল্পের কাজ এখনো বেশ মন্থর গতিতে চলছে। এর একটি কারণ হলো আরাকান আর্মি সবসময় বাধা দিয়ে আসছে। তারা রাস্তা নির্মাণের সাথে জড়িতদের অপহরণ করে থাকে।

১,৬০০ কোটি রুপির রাস্তা প্রকল্পটি ঘন বন ও পাহাড়ি এলাকা দিয়ে অতিক্রম করেছে। কাজটি নির্মাণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল ২০১৭ সালে দিল্লিভিত্তিক সিঅ্যান্ডসি কনস্ট্রাকশনকে। কিন্তু ঠিকাদারকে কাজ শুরু করার জন্য মিয়ানমার সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পেতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়।

কোম্পানিটি জোরালো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছিল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী গত বছর দক্ষিণ মিজোরামে আরাকান আর্মির ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করতে অপারেশন সানরাইজ পরিচালনা করেছিল। ভারতীয় সেনাবাহিনী এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল যে আরাকান আর্মিকে দমন করার জন্য এই অভিযানের প্রয়োজন ছিল।

এই অভিযান সম্পন্ন হওয়ার পর মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সিত্তুই বন্দরের নির্মাণকাজ শেষ করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় থাকার সময় ভারতের কথায় সায় না দেয়ায় ভারত উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর জন্য সাগর-স্থলভাগে প্রবেশের জন্য এই প্রকল্প গ্রহণ করে। কিন্তু এখন হাসিনা সরকার উত্তর-পূর্ব ভারতের জন্য মাল্টিমোডাল ট্রানজিট (সড়ক, রেল ও সাগরপথে) সুবিধা দিতে রাজি হয়েছে। ফলে এখন কালাদান প্রকল্পটি তত গুরুত্বপূর্ণ বিবেচিত হচ্ছে না, কেবল মিজোরামের জন্যই এর প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের মিয়ানমারবিষয়ক পর্যবেক্ষক বিনোদা মিশ্র বলেন, সামরিক হস্তক্ষেপ করার মতো বিষয় এটি নয়। আমাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে শিখতে হবে, সব পক্ষকে খুশি রেখে কাজ করতে হবে।

ভারত ইতোমধ্যেই মিয়ানমারের কালাদান প্রকল্পের বাকি কাজ সম্পূর্ণ করেছে। এর মধ্য রয়েছে রাখাইনের কালাদান নদীর মুখে সিত্তুই বন্দর নির্মাণ, পালেতওয়ার উজানে একটি নদী টার্মিনাল নির্মাণ, কালাদান নদী ড্রেজিং করা।

ভারতীয় অংশে আইজাওয়াল-সাইহা ন্যাশনাল হাইওয়েতে ৯০ কিলোমিটার নির্মাণ করতে হবে। মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণে ৬০০০ কোটি রুপির প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

অবশ্য অপারেশন সানরাইজের পর আরাকান আর্মি আগের চেয়ে বেশি নিয়মিতভাবে ভারতীয় স্বার্থে হামলা চালাচ্ছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে কালাদান রাস্তা প্রকল্পে নিয়োজিত ৫ ভারতীয় শ্রমিক ও ৪ স্থানীয় শ্রমিককে অপহরণ করা হয়। এছাড়া মিয়ানমারের চিন রাজ্যে ক্ষমতাসীন এনএলডির এক এমপিকেও অপহরণ করা হয়।

সাবেক বিদ্রোহী নেতা ও ভারত-মিয়ানমার সীমান্তের বিদ্রোহী গ্রুপগুলোর সাথে ব্যাপক যোগাযোগ থাকা মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা একজন বাদে ওই শ্রমিকদের মুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তবে মিয়ানমারের এমপিকে মুক্ত করতে পারেননি। একজন শ্রমিক বন্দিদশায় মারা গিয়েছিলেন।

২০১৯ সালের মার্চে কালাদান প্রকল্পে জড়িত শ্রমিকদের অপহরণের ঘটনা আবার ঘটে। এবার অপহৃত হয় স্থানীয় শ্রমিকেরা। পালেতওয়া সেতুর জন্য ৩০০ স্টিলের ফ্রেম বহনকারী বেসামরিক গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয় আরাকান আর্মি। এটি করা হয়েছিল মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় ভারতীয় বাহিনীর অপারেশন সানরাইজের বদলা নিতে। ভারতীয় অভিযানে ভীত না হয়ে আরাকান আর্মি প্রতিশোধ মিশনে নামে।

আরাকান আর্মির মুখপাত্র ইউ খাইঙ থুক্কা সম্প্রতি মিয়ানমার মিডিয়াকে বলেছেন যে চীন আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছে, ভারত দেয়নি। বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের জয়দীপ চন্দার মতো বিশ্লেষকেরা বলেন, ভারতীয়রা স্বীকৃতি না দেয়ায় কষ্ট পায় আরাকান আর্মি। তিনি মনে করেন যে তাদের কিয়াকফু গভীর সমুদ্রবন্দর ও অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিঘ্ন না ঘটানোর প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে চীন তাদেরকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রথমে প্রকল্পটির বাজেট ছিল ৬ বিলিয়ন ডলার। তবে মিয়ানমার ঋণ বোঝার ভয়ে ভীত হলে তা কমিয়ে করা হয় ২ বিলিয়ন ডলার।

মিয়ানমারে চীন সরকার একদিকে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর সাথে এবং অন্য দিকে বেশ কয়েকটি বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে চমৎকার সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে। এটা সম্ভব যে চীন ইতোমধ্যেই আরাকান আর্মিকে অর্থ প্রদান করেছে।

অবশ্য আরাকান আর্মিকে চীনের সহায়তার কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। কিন্তু বাস্তবতা হলো এই যে কিয়াকফুতে চীনা প্রকল্পে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটেনি। অথচ ভারতীয় কালাদান প্রকল্পে তা ঘটেছে। ফলে চীনের আরাকান আর্মিকে অর্থ প্রদান নিয়ে সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।

জন মুখার্জি বলেন, ভারতের উচিত হবে রাখাইন সঙ্ঘাতে চীনা মডেল অনুসরণ করে সব পক্ষের সাথে কাজ করা।

মিয়ানমার সামরিক বাহিনী সম্প্রতি দক্ষিণ মিজোরামে কিছু কৌশলগত করিডোর ব্যবহারের সুযোগ দেয়ার জন্য ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে অনুরোধ করেছে। এতে নয়া দিল্লিতে কিছু প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শ্রীলঙ্কার তামিল টাইগারদের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে ভারতীয় সেনাবাহিনী কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেছে। জাফনায় ভারতীয় শান্তিরক্ষা বাহিনী কেবল বড় ধরনের ক্ষতির মুখেই পড়েনি, সেইসাথে একসময় ভারতের সমর্থনপুষ্ট তামিল টাইগারদের হামলার শিকারও হয়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী নিহত হন।

মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী জোরামথাঙ্গা সম্প্রতি সাউথ এশিয়ান মনিটরকে বলেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী মোদি ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করকে কালাদান প্রকল্পের জন্য নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করতে বলেছেন। কারণ সিঅ্যান্ড সি দেউলিয়া হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, এই এলাকায় কিভাবে কাজ করতে হবে সে ব্যাপারে কোনো ধারণা নেই সিঅ্যান্ড সির। আমি নতুন ঠিকাদার নিয়োগ করে তাদেরকে যথাযথ উপদেশ দিতে দেখেছি। আরাকান আর্মি বলে আসছে যে তারা রাখাইনের ট্রান্স-ন্যাশনাল প্রকল্পগুলোর বিরোধী নয়। তবে তারা তাদের প্রতি স্বীকৃতি চায় ও মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সাথে ভারতের সহযোগিতা না করা।

এই মুখ্যমন্ত্রীই উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যান্য বিদ্রোহী গ্রুপগুলোকে আলোচনার টেবিলে আনার জন্য মোদিকে সহায়তা করছেন। তিনিও রাখাইনে সামরিক হস্তক্ষেপ না করতে বলছেন। তিনি বরং কালাদান প্রকল্প সমাপ্ত করার জন্য আরাকান আর্মির প্রভাবকে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী অসন্তুষ্ট হতে পারে।

কাশ্মির ও উত্তর-পূর্ব ভারতে বিদ্রোহী দমন অভিযান, চীন ও পাকিস্তানের সাথে দীর্ঘ সীমান্ত পাহারা দেয়ার কর্তব্য পালনের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী যদি এখন মিয়ানমারের চতুর জেনারেলদের অনুরোধে রাখাইন ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ে তবে তা হবে তাদের জন্য বেশ সমস্যার। মনে রাখতে হবে যে শ্রীলঙ্কার বিচক্ষণ প্রেসিডেন্ট জে আর জয়াবর্ধনের পরামর্শে জাফনায় সম্পৃক্ত হয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী।

ভারতের সামনে মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন হলো, ভারত কি ক্ষমতাসীন সরকার ও সামরিক বাহিনীর সাথে সুসম্পর্কের ভিত্তিতে মিয়ানমার নীতি নির্ধারণ করবে নাকি ১৯৮৭-৯৬ সময়কালের নীতিতে ফিরে যাবে, যখন কিছু বিদ্রোহী গ্রুপের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করে চলত ভারত। এসব গ্রুপের মধ্যে রয়েছে কচিন ইন্ডিপেন্ডেন্ট আর্মি, ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি অব আরাকান। এসবের মাধ্যমে সীমান্তে ভারতের স্বার্থ রক্ষা করা হতো, যা মিয়ানমার সামরিক বাহিনী পারত না।

জোরামথাঙ্গার (তিনি সু চি-পূর্ব আমলে বর্মি শান্তিপ্রক্রিয়ায় কিছু ভূমিকা পালনের কথা স্বীকার করেছেন) মতো একজন লোক থাকায় ভারত আসলেই আরাকান আর্মি ও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে আলোচনার টেবিলে আনার বিষয়টি বিবেচনা করতেই পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *