করোনাকালের অশেষ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা জাফরুল্লাহ

মতামত

শাহনেওয়াজ আরেফিন

এখনো যুদ্ধ করতে হচ্ছে আমাদের মুক্তিযোদ্ধাদের। আরকি মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর যারা ডান সারির লোক, তাদের। প্রকাশ্যে বা গোপনে বাম সারির বেশিরভাগই আজ ফ্যাসিস্টদের সাথে যুক্ত। শুধু কি তাই? পুঁজিবাদের দোসর হিসেবে তারা এবং ভারতপন্থী রাজাকাররাই দেশে ফ্যাসিজমের জনক। ভাবতে অবাক লাগে, এই পরিমাণ হীনম্মন্যতা নিয়ে এরা প্রগতির কথা বলে! হেলথ ইমার্জেন্সির সময়ে কি সব প্রটোকল মানতে বলে! আসলে কে মুক্তিযোদ্ধা আর কে রাজাকার তা চিনে নেবার সময় এসেছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বড় অপরাধ (?) বোধহয় এই যে তিনি ডান সারির লোক। কারণ বিজ্ঞান-প্রগতি মারানি ফ্যাসিস্ট ঘরানা ছাড়া কেউ সমাজে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ আনবে সেটা তো হতে পারে না! তাছাড়া এতো সস্তায় বাজারে করোনা কীট ছাড়লে পুঁজিবাদের স্বার্থটা দেখবে কে? তাদের জন্য সম্ভাব্য আরেকটা বিপদ হচ্ছে এই এন্টিজেন-এন্টিবডি সমন্বিত টেস্ট করলে বোঝা যাবে কি ক’রে এদেশে ইতোমধ্যেই হার্ড ইমিউনিটির ব্যাপারটা এগিয়েছে এবং কি দারুণভাবে কেইস ফ্যাটালিটি রেইট ও ইনফেকশান ফ্যাটালিটি রেইটের পার্থক্য জেনে অতিরিক্ত মিডিয়া ভীতি ঝেঁটিয়ে করোনা মোকাবেলা সম্ভব!

পলিটিক্যাল ধান্দাবাজরা অনেক সত্যই সামনে আনতে চায় না। আবার নিজ নিজ ঘরানাগত গোঁড়ামির কারণে অনেকে আজীবন অন্ধকারেই থাকে। আম-জনতা জানে কিনা জানিনা, অধিকাংশ রাজনীতিবিদ সাংবাদিক কবি বুদ্ধিজীবী আসলে সংকট পছন্দ করে। সংকট এদের জন্য অর্থাৎ নিজ নিজ রাজনৈতিক তৎপরতা এগিয়ে নেয়ার, মেধা-প্রতিভা দেখিয়ে দেয়ার একটা সুযোগ। এই ‘দেখিয়ে দেয়ার’ নেশায় তারা ভুলে যায় যে তারাও জনতারই অংশ। ভুলে যায় সাময়িক ফায়দা হলেও জনদুর্ভোগ মানে তাদেরও দুর্ভোগ।

সাম্রাজ্যবাদী কর্পোরেট স্বার্থে পরিচালিত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) আর তার পাপেরদের হাউকাউ শুনলে কিছুই ঠিকমতো এগোবে না। এই যেমন তাদের পরামর্শে ভিটামিন-ডি থেকে বঞ্চিত হয়ে গৃহবন্দীত্ব মানে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও নষ্ট করা। এভাবে অসুস্থ হলে, প্রকৃতির আশীর্বাদ ছাড়লে ভ্যাকসিন ব্যবসায়ই কেবল জোরদার হবে।

ওদিকে অযাচিত লকডাউন শ্রমিক-মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে এর চেয়ে অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটাবে।  তাছাড়া দীর্ঘায়িত লকডাউনে অবশ্যম্ভাবী দারিদ্র্য এবং অপরাধপ্রবণতার জন্য শুধু নয়, জোহান জিসেকের মতো পৃথিবীর প্রখ্যাত একদল মহামারীবিদ বলছেন এটা আসল সমাধান না। সমাধান হচ্ছে হার্ড ইমিউনিটির পাশাপাশি সুস্থ হওয়া ব্যক্তির রক্ত অসুস্থ ব্যক্তিকে দেয়া অর্থাৎ প্লাজমা থেরাপির প্রয়োগ।

ইরান যেভাবে তাদের প্রায় অর্ধেক রোগীকে সারিয়ে এনেছে। বয়স্ক আর অসুস্থদের আইসোলেট ক’রে বাকিদের সব কাজকর্ম স্বাভাবিক রেখে সুইডেন, কাজাখিস্তান যেভাবে সফল হচ্ছে। এখন কেউ কেউ বলছেন হার্ড ইমিউনিটির জন্য ৬০% আর কেউ বলছেন ৮০% এন্টিবডি সম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন। কেউ কেউ আঁতকে উঠছেন এর জন্য প্রচুর লাইফ সেক্রিফাইস করতে হবে। তাহলে হাজার হাজার বছর ধ’রে হাজারো ভাইরাস মোকাবেলা ক’রে মানুষ কিভাবে আসলো এতদূর? সিজনাল ফ্লু-তে হাজারো মানুষ প্রতিবছর এমনিতেই মৃত্যুবরণ করেন। তাছাড়া করোনা ভাইরাস বারবার মিউটেড ক’রে শক্তিশালী হচ্ছে এটাও ভুয়া কথা। এ পর্যন্ত আট বার হয়েছে মাত্র।

সমস্যা হল এখন প্রায় সব মৃত্যুই করোনার মৃত্যু ব’লে ঠাওর হচ্ছে। ব্যাপারটা ভয়ঙ্কর আর সেটা মূলত এইজন্য যে এর পেছনে বিশ্ব শাসনের হর্তাকর্তারা সম্ভাব্য ঠিক কিভাবে কলকাঠি নাড়ছে তা চাপা প’ড়ে যায়। সচেতনতার নামে মেইনস্ট্রিম আর সোশ্যাল মিডিয়ায় এই অতিরিক্ত ভীতি হোক সেটা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা অজ্ঞতাবশত এর বেনিফিসিয়ারি কিন্তু ওই হর্তাকর্তারাই!

এখন বিশ্বের হর্তাকর্তা বলতে আপনি যদি ট্রাম্প-বরিস জনসন বোঝেন তাহলে আপনার সাথে আলাপের ইচ্ছা নাই। দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রখ্যাত মার্কসবাদী বুদ্ধিজীবী আবার ‘ষড়যন্ত্র তত্ত্বে’র নতুন ফর্মুলা দিয়েছেন। তাই বলতে বাধ্য হচ্ছি ষড়যন্ত্র মানে যদি ধনীরা গরিব মারার পাঁয়তারা করছে এইটুক বোঝেন তাহলে স্রেফ হাসির পাত্র হবেন।

আপনি রথচাইল্ড রকফেলার বিল গেটস গোষ্ঠীর শিল্প-বাণিজ্য পরিকল্পনায় সন্দেহ পোষণ করছেন। আবার বলছেন তারা কোনোই ষড়যন্ত্র করেনি। এগুলো শুধুই পুঁজির ধর্ম তাহলে সেটা দিশাহীনতা! কারণ (আপনার বোঝাপড়া মোতাবেক) ভাইরাস যদি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট হয়ে থাকে অর্থাৎ কোনো জীবাণু অস্ত্র না হয়ে থাকে কেবলমাত্র তখনই আপনি বলতে পারেন যে ভ্যাকসিন ব্যবসা বিলগেইটস বা সিক্রেট সোসাইটির ষড়যন্ত্রের অংশ নয়, নিছক পুঁজির ধর্ম।

কিন্তু কোভিড-19 প্রাকৃতিক ভাবে সৃষ্ট হওয়ার ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। গবেষণা বলছে বনরুই বা বাদুড় থেকে উৎপত্তি হয়ে থাকতে পারে এর ‘সম্ভাব্যতা’ প্রমাণিত হয়েছে মাত্র! নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়েছে এমন কিছুই বলছে না। অথচ অধিকাংশ ফেইসবুকজীবী আর সব মিডিয়া পাপেট সেটাকে রসগোল্লার মতো গিলেছে আর ঢালাওভাবে ‘প্রাকৃতিক’ ব’লে প্রচার করেছে। এখন তাদের মস্ত বিপদ। যাহোক এতে আমাদের খুশি হওয়ার কিছু নাই। অবাক হওয়ারও কিছু নাই।

দেখেন কোভিড-১৯ জীবাণু অস্ত্র হতেই হবে এমনটা জরুরি না, আবার বিশ্ববাজারে ছড়িয়ে পড়া পুঁজির উপর কারোরই নিয়ন্ত্রণ নাই এমনটা ভাবাও বোধহয় ভুল। হোক সিক্রেট কিবা ওপেন সোসাইটি, দয়া ক’রে ভাববেন না বিশ্বের হর্তাকর্তারা আপনার চেয়ে মার্কস কোনো অংশে কম বোঝে। তারা তো আর বাংলাদেশের বামপন্থী না।

পুঁজিবাদ তাদেরই তৈরি দুষ্ট-দৈত্য-জীন হলে তারা তাকে বের করতে এবং বোতলে ভরতে সক্ষম। এইটুক সক্ষমতা না থাকলে ওরা আপনার জায়গায় আর আপনারা ওদের জায়গায় থাকতেন। আপনি আপনার অক্ষমতা ঢাকার জন্য ওদের শয়তানিকে পুঁজির শয়তানি ব’লে চালাতে পারেন না। আরেকটা বোকামি হবে যদি এটাকে আমরা চীন ভার্সেস আমেরিকা হিসেবে দেখি যেভাবে মিডিয়া দেখাইতে চায়। কারণ যারা দুনিয়াটা চালায় তারা ভাই চীন আমেরিকা চেনে না, বরং দেশে দেশে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ‘ফ্যাসিস্ট চাইনিজ মডেলই’ তাদের জন্য পারফেক্ট .. যে মডেলের জন্য বিজ্ঞান-প্রগতি মারানিরা সহায়ক হিসেবে কাজ করে …

শয়তানের ধর্ম হিসেবে পুঁজিবাদ তার সংকটকালে ফ্যাসিবাদী রূপ নেবে এটা জানা কথা। কিন্তু আমরা অনেকেই ভুলে যাই পুঁজির বিরুদ্ধে এই অশেষ যুদ্ধে কোনটা মুক্তি কোনটা গারদ-কারা। যাহোক এদেশে প্রণোদনার নামে ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপানো গার্মেন্টস মালিকদের সব দোষ দিয়ে লাভ নাই এবং একই কারণে সব দোষ বিশ্বের পুঁজিপতিদের উপর বর্তায় না।

কাদের ব্যর্থতা ওইসব পুঁজিপতিদের টিকিয়ে রাখে সেটাও বোঝা দরকার। এদেশের গার্মেন্টস মালিকদের সাথে ক্ষমতাসীনদের আঁতাত কিংবা চীন আমেরিকার মতো ফ্যাসিস্ট রেজিম টিকিয়ে রাখার পেছনে যে বুদ্ধিজীবিতা, যে কালচারাল হাব রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে লড়াইটা অব্যাহত রাখা জরুরি। বীর মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী বোধ করি এমনই এক যোদ্ধা।

মুক্তির নেশায় যে কি পরিমাণ মাদকতা সেটা কেবল মুক্তিকামীরাই উপলব্ধি করেন। একা একা ভালো থাকা যায় না। মুক্ত হতে হলেও হাতে হাত রেখে হতে হয়। ইনশাআল্লাহ করোনা ভাইরাস এবং ভাইরাস ব্যবসায়ী সকল ভন্ড, কর্তৃত্ববাদী ভাইরাসদের পরাস্ত ক’রে খুব শিগগিরই আমরা মুক্ত হবো। আমরা মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিকামীরা বিশ্বাসী! সত্যি বলতে বিশ্বাস ছাড়া কিছুই মানুষকে মুক্ত করেনি!!

The views expressed in this article are the author’s own and do not necessarily reflect theasianjournals.com’s editorial stance.

শাহনেওয়াজ আরেফিন, লেখক ও সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *