বর্ণবাদ নিপাত যাক

বর্ণবাদ নিপাত যাক, মানবতা মুক্তি পাক

মতামত

মো: শফিকুল ইসলাম নাহিদ

১৮৬৫ সালের পর থেকে আমেরিকায় দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও ইসরাইল থেকে কৃষ্ণাঙ্গ নির্যাতনের ধার করা পন্থা আজও সক্রিয়। ধার করা পন্থার বিষয়ে একটু পরে আসি। বর্ণবাদ আলচনায় না আনলেই নয়। আমেরিকার গৃহযুদ্ধের মূলে ছিল দক্ষিণের কিছু রাজ্যের শিল্প বিকাশের কারণে দাসদের ব্যবহার বৃদ্ধি। কিন্তু দক্ষিণের রাজ্যগুলো দাসপ্রথার বিলুপ্তির বিষয়ে উত্তরের রাজ্য গুলোর সাথে আপোষ করেনি।

ফলে ১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৫ সাল পর্যন্ত আমেরিকায় ঘটেছিল এক বিভীষিকাময় গৃহযুদ্ধ। অবশেষে দক্ষিণের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে এই গৃহযুদ্ধের অবসান হয় এবং এই সময়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন আব্রাহাম লিঙ্কন। সংবিধান পরিবর্তনের মাধ্যমে ৪০০ বছর ধরে চলা দাস প্রথার বিলুপ্তি সাধনে সক্ষম হন তিনি। দাসত্বর সাথে বর্ণবাদের সম্পর্ক অবিচ্ছিদ্য হলেও বর্ণবাদ এখনও অ্যামেরিকায় টিকে আছে বিভক্তির রাজনীতিতে।

আবার বর্ণবাদের কথা বললে মারটিন লুথার কিং জুনিয়নের নাম চলে আসে। যিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৯৬৩ সালে তিনি ওয়াশিংটনে ২ লাখ মানুষের শান্তিপূর্ণ সমাবেশে বর্ণবাদ বিলুপ্তির জন্য ‌’আই হাভ আ ড্রিম’ শীর্ষক ভাষণে যা বলেছিলেন তা বিশ্ব দরবারে আজও অমলিন হয়ে আছে। ভাষণের এক অংশে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিন আমার সন্তানেরা এমন এক জাতির মধ্যে বসবাস করবে যেখানে তারা গায়ের বর্ণ দিয়ে নয় বরং মেধা ও মনন দিয়ে মুল্লায়ন হবে।’

এ কারণেই বারাক ওবামাকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দেখেছিল বিশ্ব। যদিও প্রথম দিকে মার্কিনিদের সবাই তাকে মেনে নিতে পারেনি। তবে নিজের দায়িত্ব তিনি সুনামের সাথেই শেষ করেছিলেন। শত চেষ্টা করেও  তিনিও এই বর্ণবাদ দমন করতে পারেননি রাজনৈতিক বাধার কারণে। তবে তিনি ট্রাম্পের মত এত বর্ণবাদী মন্তব্য করেননি। এজন্যই বলতে হয়, এই একবিংশ শতাব্দীতে অনেক রাষ্ট্র বর্ণবাদের বিরুধে সেচ্চার হলেও খোদ আমেরিকাই তলায় পড়ে আছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পর ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ইউডিএইআর (Universal Declaration of Human Rights) ঘোষণা করা হয়। এটি সকল দেশ ও জাতির উপর ন্যাস্তকৃত  আন্তর্জাতিক মৌলিক দলিল হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। ইউডিএইআরের ৫ নং অনুচ্ছেদ অনুশারে, ‘কাউকে নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণ ও শাস্তির শিকার করা যাবে না।’

কিন্তু আমেরিকাতে কৃষ্ণাঙ্গদের উপর অমানবিক আচরণ তো আহরহ ঘটেই, মাঝে মাঝে তারা এই নিষ্ঠুরতায় মৃত্যুবরণও করে। এটাই হয়ত এখানে কৃষ্ণাঙ্গদের  দমিয়ে রাখার একটা অন্যতম কৌশল। সেই হত্যার বিচারের জন্য আবার হাজারও মানুষ রাজপথে নামে। এভাবেই আমেরিকাতে বর্ণবাদ বড় জায়গা করে নিয়েছে।

এবার আসা যাক ইহুদিদের ব্যাপারে। ১৩০০ খৃষ্ট পূর্বাব্দে ইহুদিরা মিসরীয়দের দ্বারা বিতারিত হয়ে ইউরোপীয় অঞ্চলে বসবাস শুরু করেছিল। ১৯৪৮ সালে বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে তাদেরকে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখলের মাধ্যমে ইসরাইল নামে পূনর্বাসন করা হল। যার প্রেক্ষিতে শুরু হল আরব-ইসরাইল দ্বন্দ্ব, সেই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন। ১৯৬৭ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে জয়ের মধ্যদিয়ে ইসরাইল আরও শক্তিশালী ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠল।

নিজেদের বিতাড়িত হওয়ার ঐতিহাসিক ক্ষোভের প্রতিশোধ নেয় নিরীহ ফিলিস্তিনি মুসলিমদের ওপর। এভাবে গত ৭ দশক ধরে চলছে নিপীড়ন। ইসরাইল যেভাবে ফিলিস্তিনিদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালায় তার সঙ্গে আমেরিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের উপর পুলিশ বাহিনীর নির্যাতনের পন্থার মিল খুজে পাওয়া যায়। লেখক ও সাংবাদিক মাইকো পেলেড তার একটি নিবন্ধে দুই দেশের পুলিশের এই নির্যাতনের পন্থার মিলের কারণ ব্যাখ্যা করেছেন। এমনকি তিনি এটাও বলেছেন, আজ আমেরিকার পুলিশের যে বর্ণবাদী আচরণ তার শিকড় মূলত ইসরাইলে।

অনেক আগে থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ইহুদি সংগঠন প্রভাব বিস্তার করে আসছে। তার মধ্যে ইহুদি ফেডারেশন ও অ্যান্টি-ডিফেশন লিগ ((Anti defamation league) অন্যতম। এই সংগঠনগুলো আমেরিকার ৫০টি রাজ্যেই কাজ করে ইসরাইলর স্বার্থ রক্ষারেথ। এমনকি ইসরাইল সমর্থিত প্রেসিডেন্ট প্রার্থীর জন্য অর্থ সরবারহ করা ও লজিস্টিক সমর্থন সবকিছুই করে থাকে। এমনকি মুসলিমদের দমনের জন্য এবং মুসলিম শিক্ষাক্রমে ইহুদি মতবাদ প্রচারে মার্কিন রাজনীতিকদের প্রভাবিত করে থাকে।

ইসরাইলে মাঝে মাঝে সন্ত্রাসবাদ দমনে যৌথ সামরিক প্রশিক্ষণ নেয় আমেরিকার পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা। ইসরাইলে সামরিক ও পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে মতবিনিময় সহ নানা কৌশল রপ্ত করে। এর ফলে ইসরাইল ও আমেরিকার পুলিশ বাহিনীর নির্যাতনের পন্থা একই ধরনের এবঙ এটা মোটেই কাকতালীয় নয়। যেভাবে জর্জ ফ্লয়েডের উপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে সেটা ফিলিস্তিনিদের উপর প্রতিদিন প্রতিনিয়তই ঘটে চলেছে।

একটা সমিক্ষায় দেখা গেছে, ইসরাইলের মোট কারাবন্দির ৪০ ভাগই ফিলিস্তিনি। অথচ তারা দেশটির মোট জনগোষ্ঠীর মাত্র ২০ ভাগ। বিবিসির এক রিপোর্ট অনুসারে, আমেরিকাতে আফ্রিকান আমেরিকান তথা কৃষ্ণাঙ্গ ১৩ ভাগ হলেও তাদের মধ্যে কারাবন্দির সংখ্যা শ্বেতাঙ্গদেরও পাঁচ গুণ। বর্ণবাদের সফল উদাহরণ হিসাবে আমেরিকা এবং ইসরাইলের নাম তাই না বললেই নয়।

যাহোক, আমেরিকা দাসপ্রথা বিলোপসাধনের মধ্যে দিয়ে অনেকটাই একটি মেধাভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলেছে। গণতন্ত্র ও বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে আধুনিক বিশ্বকে দিকনির্দেশনা দিয়ে আসছে এই দেশটিই। তবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে মানবিক অধিকারের বিপর্যয়য়ে কথা বলে যে দেশ, সেই দেশের নাগরিকের উপর এমন বৈষম্যমূলক আচরণ গ্রহনযোগ্য নয়। যে কারণে এই বিষয়ে সাবেক রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট  জর্জ ডাব্লিউ বুশও ট্রাম্পের সমালচনা করতে ছাড় দেননি।

তবে এখানে বলাই যায়, নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প বিভক্তির রাজনীতির শুরু করেছেন। যার ফলে বর্ণবাদকে উদ্দেশ্যপ্রণীতভাবে উস্কে দিয়ে ফাইদা লুটতে চান তিনি। এজন্যই আমেরিকার হাতে গড়া দলিল জাতিসংঘ সনদের প্রথম অনুচ্ছেদে জীবনের অধিকারের কথা বলা হলেও সেখানেই জীবনের অধিকারকে কার্যত বর্ণবাদের ফ্রেমে ফেলা হচ্ছে। অন্যদিকে ইসরাইল সন্ত্রাসবাদের তকমা দিয়ে ফিলিস্তিনিদের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছে। রাজনৈতিক কারণে বর্ণবাদ উস্কে দিয়ে মানব নির্যাতন বা হত্যার মত জঘন্য কাজ থেকে কখনই গ্রহণযোগ্য নয়। বর্ণবাদ নিপাত যাক, মানবতা মুক্তি পাক।

মো: শফিকুল ইসলাম নাহিদ, প্রভাষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *