আঠার শতকের দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি

লন্ডনে এবার সরল আঠার শতকের দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি

ইউরোপ লিড নিউজ

লন্ডন, ব্রিটেন- বিক্ষোভের মুখে লন্ডনে এবার আঠার শতকের এক দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি সরিয়ে নেয়া হল। মঙ্গলবার লন্ডন মিউজিয়ামের সামনে বসানো দাস ব্যবসায়ী রবার্ট মিলিগানের মূর্তিটি সরিয়ে ফেলে শহর কর্তৃপক্ষ। কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে চলমান ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনে মূর্তি সরিয়ে নেয়ার দাবির মুখে এটা সরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এর আগে দাস ব্যবসার  সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ভাস্কর্য ধ্বংস করে ফেলা উচিত বলে  মন্তব্য করেন লন্ডনের মেয়র সাদিক খান। একই সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত রাস্তাগুলোর নাম পাল্টে ফেলা উচিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

রোববার ব্রিস্টলে বর্ণবাদবিরোধীরা দাস ব্যবসায়ী এডওয়ার্ড কলস্টনের মূর্তি গুঁড়িয়ে দেয়ার পর লন্ডনে অন্যান্য মূর্তিগুলোর ইতিহাস খতিয়ে দেখার ঘোষণা দেন মেয়র। সাদিক খান বলেন, লন্ডনের এসব স্থাপনা ও নামের সঙ্গে কুখ্যাত দাসত্বপ্রথার একটি ‘অস্বস্তিকর সত্য’ রয়েছে। দাস ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব মূর্তি ভেঙে ফেলা উচিত।

মিলিগানের মূর্তি সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ বলেছে, স্থানীয় অধিবাসীদের দাবির প্রতি সম্মান জানাতে মূর্তিটি সরিয়ে নেয়া হয়েছে। মঙ্গলবার ক্রেন দিয়ে নামিয়ে আনার সময় আনন্দধনী ও হাততালির মাধ্যমে একে স্বাগত জানায় স্থানীয় বাসিন্দারা।

লর্ড ক্লাইভের মূর্তি

এদিকে লন্ডনের শ্রুজবেরি থেকে লর্ড ক্লাইভের মূর্তি অপসারণের দাবিও জোরদার হচ্ছে। এজন্য একটি পিটিশন আবেদন স্বাক্ষরও এগিয়ে চলেছে। পিটিশনের আবেদনকারীরা ভারতবর্ষে ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ক্লাইভের ওই মূর্তিকে ‘ঔপনিবেশিকতার প্রতীক’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন।

চেইঞ্জডটওআরজির্গের মাধ্যমে করা পিটিশনটিতে শ্রপশার শহর কর্তৃপক্ষকে মূর্তিটি অপসারণে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। এডওয়ার্ড কলস্টনের মূর্তি নদীতে ফেলে দেয়ার কয়েক ঘণ্টা পর এ অনলাইন পিটিশনটি খোলা হয়।

পিটিশনে লর্ড ক্লাইভকে এভাবেই চিত্রিত করা হয়েছে, ‘ভারতবর্ষ, বাংলা এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশিরভাগ অংশে ব্রিটিশ উপনিবেশের শুরুর দিককার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র রবার্ট ক্লাইভ।’ প্রাথমিকভাবে এ অনলাইন আবেদনে আড়াই হাজার মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও, খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটি এক হাজার ৭০০রও বেশি মানুষকে আকৃষ্ট করে।

পিটিশনে আরও বলা হয়েছে। ‘ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার প্রতীক ক্লাইভের এই মূর্তিটি ভারতীয়, বাঙালি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ভাষাভাষীদের জন্য খুবই অবমাননাকর। একে ব্রিটিশদের গর্ব ও জাতীয়তাবাদের স্মারক হিসেবে ন্যায্যতা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। লাখ লাখ নিরপরাধ মানুষকে হত্যা ও নির্যাতন যারা উপভোগ করতে পারে, কেবল তাদের কাছেই এটি ন্যায্যতা পেতে পারে।’

অষ্টাদশ শতকে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে থাকা বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির প্রথম গভর্নরের দায়িত্ব পালন করেন রবার্ট ক্লাইভ; পান ‘ভারতের ক্লাইভ’ খেতাব। পিটিশনে ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনের শুরুর দিকে বাংলা অঞ্চলে লুটপাটে ক্লাইভের ভূমিকার কথা তুলে ধরা হয়।

বলা হয়েছে, ‘একটি জাতিকে গুড়িয়ে দেয়া ও নিরপরাধ মানুষদের আটকে রাখার বর্বর নির্দেশ দেয়া একজনের স্মরণে একটি মূর্তি থাকা একইসঙ্গে আপত্তিকর ও লজ্জাজনক। ঐতিহাসিক ব্যক্তি হওয়ার মানেই তিনি ভালো লোক ছিলেন এমনটা নয়। তিনি শোষণ ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদের প্রতীক ছাড়া আর কিছুই নন; বুঝে হোক বা না হোক, কয়েকশ বছর ধরে শ্রুজবেরি শহরের কেন্দ্রে থাকা এ প্রতীককেই স্মরণ ও উদযাপন করা হয়েছে।’

শ্রজবেরির রক্ষণশীল সাংসদ ড্যানিয়েল কচিনস্কি মূর্তিটি নিয়ে শান্তিপূর্ণ আলোচনার আহ্বান জানিয়েছেন। ‘স্থানীয় ছেলে’ ক্লাইভের জীবন নিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ গবেষণারও আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, ‘আমরা একটি গবেষণা করছি, সেটি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি তার জীবন নিয়ে কোনো মন্তব্য করবো না। সেসময়ে ব্রিটিশ সামাজ্য ছিল ভালোর এক অসাধারণ উৎস।’

ক্লাইভের জীবন নিয়ে গবেষণায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের লাইব্রেরি ব্যবহার করতে পারেন বলেও জানিয়েছেন কচিনস্কি। তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশ সাম্রাজ্য গড়ে তোলার জন্য যারা সহায়তা করেছে তাদেরকে স্মরণ ও সম্মান করি আমরা। তারা আমাদের ইতিহাসের অংশ এবং তাদেরকে অবশ্যই সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেখা উচিত। আমি জানি অনেকেই আছেন যারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সব স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলতে চান। তবে আমি সেসময় বিশ্বজুড়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের করা অনেক ইতিবাচক জিনিস দেখেছি।’

শ্রুজবেরির এ সাংসদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলকেও স্মরণ করেছেন। বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীরা সম্প্রতি লন্ডনের পার্লামেন্ট স্কয়ারে রাখা চার্চিলের মূর্তিতে সাবেক এ প্রধানমন্ত্রীর নামের নিচে ‘ওয়াজ এ রেসিস্ট’ লিখে দিয়েছে।

আন্দোলনকারীরা চার্চিলের মূর্তির কাছাকাছি অবস্থিত মহাত্মা গান্ধীর মূর্তিকেও ছাড় দেয়নি। তারা গান্ধীর মূর্তির বেদিতেও ‘বর্ণবাদী’ শব্দ জুড়ে দিয়েছে। শ্রপশার কাউন্টি কাউন্সিলের নেতা পিটার নুটিং বলেছেন, তাদের কাউন্সিলের সংবিধান অনুযায়ী এক হাজার স্বাক্ষর সম্বলিত যে কোনো আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কাউন্সিলে আলোচনা করে নিতে হয়।

শ্রুজবেরি ছাড়াও লন্ডনের কেন্দ্রস্থলে কিং চার্লস সড়কে অবস্থিত ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ কার্যালয়ের কাছেও ক্লাইভের একটি মূর্তি আছে। ওই মূর্তির বেদিতে ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ ও ১৭৬৫ সালের এলাহাবাদ চুক্তিতে ক্লাইভের ‘অসামান্য ভূমিকার’ উল্লেখ আছে।

শ্রপশারের মার্কেট ড্রেটনে জন্ম নেওয়া ক্লাইভের পড়াশোনা লন্ডনে; ১৭৪৩ সালে তিনি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে ভারতে যান। সেখান থেকে লন্ডন ফিরে আসার পর ১৭৭৪ সালে তার মৃত্যু হয়। ক্লাইভ আত্মহত্যা করেছিলেন বলে ইতিহাসবিদদের ধারণা।

আরও পড়ুন:

[দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি ভেঙে নদীতে ফেলল বিক্ষোভকারীরা]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *