লকডাউনে নেপালে আত্মহত্যা

নেপালে লকডাউনের মধ্যে ১২০০ জনের আত্মহত্যা

পূর্ব এশিয়া লিড নিউজ

নেপালে লকডাউনের মধ্যে ১২০০ মানুষ আত্মহত্যা করেছে। দেশটিতে গত ৭৪ দিনে বিপুল সংখ্যক এই আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। আত্মহত্যার এই মৃত্যুর সংখ্যা দেশটির করোনায় মৃত্যুর অন্তত চল্লিশ গুণ। করোনায় মৃত্যু হয়েছে মাত্র ২২ জনের। করোনা মহামারীর আতঙ্ক ও অর্থনৈতিক সংকটে মানসিক স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। ইনকোয়ারারডটনেট, জাকার্তা পোস্ট ও কাঠমান্ডু পোস্ট।

গত ২৪ মার্চ নেপালে দ্বিতীয় করোনা রোগী শনাক্তের পরপরই লকডাউন করা হয় গোটা দেশ। একটানা লকডাউনের কারণে দেশটির মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর সীমাহীন প্রভাব ফেলেছে। করোনা মহামারীর সঙ্গে সঙ্গে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি এতই নাজুক আকার নিয়েছে যে দেশটিতে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ আত্মহত্যা করছে।  

লকডাউনের মধ্যে ৭৪ দিনেই আত্মহত্যা করেছে ১২২৭ জন। প্রতিদিন গড়ে ১৬.৫ জন করে। যেখানে গত বছর জুড়ে আত্মহত্যায় মারা গেছে ৫ হাজার ৭৮৫ জনের। হিমালয় সংলগ্ন দেশটিতে আক্রান্ত হয়েছে অন্তত ৭ হাজার ৮৪৮ জন।

ডাক্তার ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ও লকডাউন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন এনেছে। সংক্রমণের ভয়ে সবসময় একটা আতঙ্কের মধ্যে জীবন যাপন করছে তারা। মানুষ মানুষের সঙ্গে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে কম মেলামেশা করছে। অনেকেই চাকরি হারিয়েছে। বাড়িভাড়াসহ নানা ধরনের বিল পরিশোধ করতে হিমশিম খাচ্ছে। সর্বোপরি অর্থনৈতিক সংকট মানুষের মধ্যে উদ্বেগ, চাপ আর বিসন্নতা বাড়াচ্ছে।

নেপালের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক সংগঠন ট্রান্সকালচারাল সাইকোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক ড. কমল গৌতম বলছেন, ‘এটা শুরু মাত্র। এখনই বহু মানুষ চাপের মধ্যে আছে।’ গত শনিবারই কাঠমান্ডুর ডোলাখায় নিজের বাড়িতে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন ভগবতী নামে ৩৮ বছর বয়সী এক নারী। তার সন্তানরা টের পেয়ে সাহায্যের চিৎকার করলে প্রতিবেশীরা দৌড়ে আসে। ইতোমধ্যে অজ্ঞান হয়ে গেছেন ভগবতী। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে নেয়া তাকে।

লকডাউনের মধ্যে বিশ্বে বড় হুমকিতে মানসিক স্বাস্থ্য

মহামারী এই করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্বজুড়ে আজ শুধুই হাহাকার। চারিদিকে শুধু মৃত্যু, রোগ আর চাকরি হারানোর চিৎকার। করোনাভাইরাস মহামারি এমন এক সংকট তৈরি করেছে যা নজিরবিহীন। প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের বিস্তার ঠেকানোর জন্য প্রায় পুরো বিশ্বজুড়ে চলছে লকডাউন। লকডাউনের মধ্যে কাজ হারিয়ে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় দিশেহারা বহু মানুষ।

সম্প্রতি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ডব্লিউএইচওর প্রধান তেদ্রোস আধানম গেব্রিয়াসাস, মানুষ জনের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর এই মহামারির প্রভাব ইতিমধ্যে খুবই উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিশ্বের বিপুল সংখ্যক মানুষ একইসঙ্গে এমন মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি হয়নি।

জরুরি ভিত্তিতে সরকারগুলো এ সংকটের বিষয়টি আমলে না নিলে আরো বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে স্বাস্থ্যকর্মী ও শিশুরা এই মানসিক চাপের ‘ব্যাপক বিস্তার’ ঘটতে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

জাতিসংঘ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, চলমান করোনাভাইরাস সংকটে কানাডায় ৪৭ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর মানসিক সহায়তা লেগেছে। চীনে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বিষণ্ণতায় ভোগার সংখ্যাটা ৫০ শতাংশ; আর পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর্মীদের হালকা মানসিক চাপ আছে ৪২ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মীর, তীব্র মানসিক সংকটে আছেন ২৬ শতাংশ!

জাতিসংঘের ওই তথ্য-উপাত্তে আরও বলা হয়েছে, ইতালি ও স্পেনের বাবা-মায়েরা জানিয়েছেন, চলমান সংকটে ৭৭ শতাংশ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে মনোযোগহীনতা দেখা গেছে। ৩৯ শতাংশ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অস্থিরতা ও খিটখিটে মেজাজ। স্নায়বিক দুর্বলতা দেখা গেছে ৩৮ শতাংশ বাচ্চাদের ক্ষেত্রে এবং একাকীত্বে ভুগেছে ৩১ শতাংশ শিশু।

যুক্তরাজ্যে আরেকটি জরিপে দেখা গেছে, দেশটির ৩২ শতাংশ তরুণ-তরুণীর মানসিক স্বাস্থ্যের অনেক অবনতি ঘটেছে বলে জানা গেছে। গবেষণায় করোনা ছাড়াও সার্স মহামারির সময়ের মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকির দিকটিও তুলে ধরা হয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়, ২০০০ সালে সার্স মহামারির সময়ে মানুষের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে গিয়েছিল। আর করোনা ভাইরাসের কারণে বিশ্বের শত শত কোটি মানুষ ঘর-বন্দি হয়ে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন থাকায় এসময় মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি আরো বেশি বলে দাবি করেন বিশেষজ্ঞরা।

আরও পড়ুন:

[সীমান্ত নিয়ে তৎপর নেপাল, সংযত ভারত]

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।