ব্রিটেনে লকডাউন উঠে যাচ্ছে

ব্রিটেনে লকডাউন উঠছে, স্বাভাবিক হচ্ছে জীবনযাত্রা

ইউরোপ লিড নিউজ

লন্ডন, ব্রিটেন- ব্রিটেনে লকডাউন উঠে যাচ্ছে, শিথিল হচ্ছে সামজিক দূরত্ববিধি। সেই সঙ্গে খুলছে পাব-রেস্তোরাঁ-হোটেল। করোনাভাইরাসের কারনে দীর্ঘ তিন মাস লকডাউনের পর জনজীবন আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সম্প্রতি মৃতের হারও কমতে শুরু করেছে।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ৪ জুলাই থেকে ইংল্যান্ডে ব্যাপক পরিসরে লকডাউন শিথিলের ঘোষণা দিয়েছেন। এর আওতায় ইংল্যান্ডে খুলবে পাব, রেস্তোরাঁ, হোটেল। এমনকী সামাজিক দূরত্ববিধিও ২ মিটার থেকে এক মিটারে কমিয়ে আনা হবে। জনসন মঙ্গলবার পার্লামেন্টের ভাষণে একথা জানিয়েছেন।

জনসন ব্যবসায়িক নেতা এবং নিজ দলের সদস্যদের কাছ থেকে লকডাউন তুলে নেওয়ার জন্য চাপের মুখে ছিলেন। কিন্তু করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়ার আশঙ্কায় তিনি লকডাউন শিথিল না করার পক্ষপাতি ছিলেন।

মঙ্গলবার জনসন বলেন, ভাইরাস সংক্রমণের হার কমছে। কোভিড-১৯ এর দ্বিতীয় পর্যায় শুরুর ভয়ও কম বলেই মনে হচ্ছে। এ কারণে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য আবার চালু করতে পারেন এবং ইংল্যান্ডের জীবন স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসার চেষ্টা করতে পারেন। সামাজিক দূরত্বের নতুন নিয়মে মানুষ একে অপরের থেকে ১ মিটার দূরত্ব বজায় রাখতে পারবে। তবে ফেস মাস্ক পরা, হাত বারবার ধোয়ার মত নিয়মগুলো মেনে চলতে হবে।

নাপিতের দোকান থেকে শুরু করে সিনেমা হল, মিউজিয়াম, উপাসনালয় এমনকী থিম পার্ক, খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, গ্যালারিও ৪ জুলাই থেকে খুলছে। গত ২৩ মার্চ থেকে এই জনসমাগম স্থানগুলো বন্ধ ছিল। কেবল নাইটক্লাব, ইনডোর জিম এবং সুইমিং পুলগুলো এখনো বন্ধ থাকবে।

প্রধানমন্ত্রী জনসন বলেছেন, একবারেই সব বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হবে না এবং মানুষজনকেও সতর্ক থাকতে হবে। ভাইরাস সংক্রমণ ফের বাড়তে শুরু করলে লকডাউনের পদক্ষেপ আবার ফিরিয়ে আনার প্রয়োজন পড়তে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

১৫ জুন থেকে ব্রিটেনে গণপরিবহনে চড়তে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এই বিধিনিষেধ অমান্য করলে যাত্রীদের গুনতে হবে ১০০ পাউন্ড জরিমানা। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, মানুষ যাতে এই বিধিনিষেধ ঠিকভাবে পালন করে সেজন্য বাস ও রেল স্টেশনগুলোতে তিন হাজারের বেশি অতিরিক্ত কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে। এদের মধ্যে পুলিশের কর্মকর্তারাও রয়েছেন।

ব্রিটেনে লকডাউন শিথিলের পর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে মন্থরতা সৃষ্টি করছে করোনা মোকাবেলায় দুই মিটার শারীরিক দূরত্ব নীতি। সরকারি এ নীতি পরিবর্তনে ইতোমধ্যে বাণিজ্যিকপ্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে চাপও প্রয়োগ করা হয়েছে।

বিবিসিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেন, দুই মিটার দূরত্ব নীতি পর্যালোচনা আগামী সপ্তাহেই মীমাংসা হবে। তিনি বলেন, আমরা বুঝেছি, এ নীতি হোটেল, বার, রেঁস্তোরা ও অন্যান্য পর্যটন ব্যবসাকে কতটা প্রভাবিত করছে। করোনা মোকাবেলায় দুই মিটার দূরত্বে আমাদের অবস্থান অবশ্যই দরকার। তবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিবেচনায় আমাদের এ নীতিতে প্রয়োজনীয় সংশোধনেরও দরকার হয়ে পড়েছে।

এ বিষয়ে দেশটির বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালিকরা জানান, টানা তিন মাস লকডাউনের পর অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কেবল শুরু হয়েছে। দুই মিটার দূরত্ব নীতি বাস্তবায়ন করতে গেলে দ্রুত অর্থনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।

ব্রিটেনের করোনাভাইরাস সতর্কতার স্তর চার থেকে তিনে নামিয়ে আনা হয়েছে। দেশটির প্রধান মেডিকেল অফিসারেরা শুক্রবার এই ঘোষণা দেন। কোভিড-১৯ এর সতর্কতার স্তর যখন চার ছিলো তখন তা উচ্চ মাত্রায় ছড়ানোর ঝুকিতে ছিলো। তৃতীয় স্তরে আসায় ভাইরাসটি সাধারণ গতিতে ছড়াবে বলে বিবেচনা করা হচ্ছে। এর ফলে ধীরে ধীরে বিধিনিষেধ শিথিল করা হতে পারে।

হেলথ সেক্রেটারী ম্যাট হ্যানকক বলেছেন, এটি দেশের জন্য একটি বিশাল মুহূর্ত, এতে দেখা যাচ্ছে সরকারের পরিকল্পনা কাজ করছে। সতর্কতা স্তরের হ্রাসের সিদ্ধান্তটি যৌথ বায়োসিকিউরিটি সেন্টারের সুপারিশের পর ঘোষণা করা হয়। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ডের প্রধান মেডিকেল অফিসারেরা এই সিদ্ধান্তে ঐক্যমত পোষণ করেছেন।

আগামী সেপ্টেম্বর থেকে ব্রিটেনের স্কুলের সকল ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাস কক্ষে যেতে হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন এডুকেশন সেক্রেটারী গ্যাভিন উইলিয়ামসন। তিনি শুক্রবার নিয়মিত করোনাভাইরাস সংক্রান্ত প্রেস ব্রিফিংয়ে ওই ঘোষণাদেন। এসময় তিনি জানান, সকল ক্লাসের ছাত্র-ছাত্রীদের ক্লাসে ফিরিয়ে আনতে সাইনআপ করা হয়েছে। শিশুদের সুরক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কিত গাইডেন্স আগামী পনের দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

গত ২০ মার্চ থেকে করোনা পরিস্থিতির কারনে স্কুল বন্ধ হলেও শুধুমাত্র ফ্রন্ট লাইন কর্মীদের সন্তানরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিলো। আর এ মাসের শুরুতে নার্সারি, রিসিভশন, ইয়ার ওয়ান এবং ইয়ার সিক্স-এর শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পায়। এদিকে ইয়ার টেন ও ইয়ার টুয়েলভ-এর শিক্ষার্থীরা আগামী সপ্তাহ থেকে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

এডুকেশন সেক্রেটারি গ্যাভিন উইলিয়ামসন বলেছেন, এখনো অনেক অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি তাদের উদ্বেগ নিরসনের। তিনি বলেন, আমরা শিশুদের সুস্থতা জন্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছি।

করোনার কারণে এত দিন বেশি মানুষের সমাগমে বড় অনুষ্ঠান না করা গেলেও লকডাউন শিথিল হওয়াও ব্রিটেনে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য অনুষ্ঠান করার সুযোগ পাচ্ছে মানুষ। তবে বিয়ের অনুষ্ঠানে বেশি মানুষ আমন্ত্রণ না করার পরামর্শ দিয়েছে সরকার। আর অনুষ্ঠানে সবাইকে শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

যুক্তরাজ্যে করোনাভাইরাসে দৈনিক মৃত্যু সর্বোচ্চে পৌঁছেছিল এপ্রিলে। ওই সময় ৯ দিনে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার পেরিয়েছিল। দেশটিতে করোনাভাইরাসে মৃত্যু ৫০ হাজারেরও বেশি। তবে চলতি মাসে প্রতিদিনই নতুন ভাইরাস সংক্রমণ ২ থেকে ৪ শতাংশ করে কমছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী জনসন।

আরও পড়ুন:

লন্ডনে এবার সরল আঠার শতকের দাস ব্যবসায়ীর মূর্তি

ইউরোপে ৩০ লাখ মৃত্যু ঠেকিয়েছে লকডাউন: গবেষণা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *