ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন আলোচনায়

ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী কেন আলোচনায়

বাংলাদেশ ভারত

দক্ষিণ এশিয়ায় জনপ্রিয় রঙ ফর্সাকারী ক্রিম ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। এই আলোচনা মূলত এর ব্রান্ড নামের প্রথম অংশ ‘ফেয়ার’ শব্দটি নিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ পুলিশের হাতে কৃষ্ণাঙ্গ যুবক জর্জ ফ্লয়েড হত্যার প্রতিবাদে দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলন। সেই আন্দোলনের রেশ এসে পড়েছে প্রসাধন সামগ্রীর বাজারেও। বিতর্কের মুখে পড়েছে সব রং ফর্সাকারী ক্রিমগুলো।

বিতর্কের মুখে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলি থেকে বাদ পড়ছে ‘ফেয়ার’ শব্দটি। ইতোমধ্যে রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের ব্র্যান্ড নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়ার কথা জানিয়েছে ভারতের হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড। এরপর ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেড-ইউবিএলও বৃহস্পতিবার এই ঘোষণা দিয়েছে।

হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড’র সিদ্ধান্তের কথা ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানানোর কয়েক ঘণ্টার মাথায় এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়েছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। ইউবিএলের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কোম্পানির স্কিনকেয়ার পোর্টফোলিও বা ত্বকের যত্নে ব্যবহৃত প্রসাধন পণ্যের বিবর্তনের পরবর্তী পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কোম্পানির ফ্ল্যাগশিপ ব্র্যান্ড ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর নাম পরিবর্তন করতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

আরও সার্বজনীন সৌন্দর্যের লক্ষ্যে ব্র্যান্ডকে এগিয়ে নিতে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী নামটির মধ্য থেকে ‘ফেয়ার’ শব্দটি ব্যবহার বন্ধ করবে কোম্পানি। ব্র্যান্ডটির নতুন নাম অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যে নামটি পরিবর্তন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।’

টাইমস অফ ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা রাজ্যের মিনেপোলিস শহরে পুলিশের নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু নিয়ে বিশ্বব্যাপী বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও ভারতের বাজারে রঙ ফর্সাকারী দুটি পণ্য বিক্রি বন্ধের ঘোষণা দেয় প্রসাধন কোম্পানি জনসন অ্যান্ড জনসন।

এরপর রঙ ফর্সাকারী পণ্য বাজারে চালু থাকায় বেকায়দায় পড়ে ইউনিলিভার। এখন তারা বলছে, ত্বকের যে কোনো রঙকে স্বাগত জানায় এই ব্র্যান্ড। হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সঞ্জীব মেহতা বলেছেন, ‘সব ধরনের ত্বকের যত্ন নেওয়ার কথা বলা নিয়েই কাজ করছি আমরা। আমরা সৌন্দর্যর পরিসরকে আরও বড় করে উদযাপন করতে চাই।’

‘পণ্যের গায়ে আলাদা গাত্রবর্ণের যে দুই চেহারা ছিল তা আমরা সরিয়ে নিয়েছি। এছাড়া ত্বকের রঙের যে নির্দেশনা দেওয়া হত ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্যাকেটের সাথে তাও বাদ দেয়া হয়েছে।’ ফর্সা হওয়ার বদলে উজ্জ্বল ত্বকের কথা বলতে গিয়ে ত্বকের স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে চায় হিন্দুস্তান ইউনিলিভার লিমিটেড।

গ্রাহকরাও এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন সঞ্জীব মেহতা। তিনি বলেন, ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী ব্র্যান্ড থেকে ফেয়ার শব্দটি উঠিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছি আমরা। তবে এই পণ্যের নতুন নাম এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’ নতুন নাম আর নতুন মোড়কে ‘কয়েক মাসের মধ্যেই’ বাজারে আসবে এই পণ্য।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বেই রঙ ফর্সাকারী ক্রিমের ব্যবহার রয়েছে। তবে এশিয়ায় এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। চীন, ভারতসহ এশিয়ার দেশগুলোর ৪০ শতাংশ নারী এই ধরনের ক্রিম ব্যবহার করেন। ভারতে এসব প্রসাধন পণ্যের ক্রেতাদের ধারণা, সুন্দর ও সৌন্দর্যর জগতে প্রবেশের প্রথম ধাপই হচ্ছে এই সব রঙ ফর্সাকারি পণ্য।

ইউনিলিভারের কর্মকর্তারাও আগে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী নিয়ে বলে আসছিলেন, এই পণ্য নারীদের আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে তোলে। টাইমস অফ ইন্ডিয়া বলছে, কিছু দিন ধরে বেশিরভাগ পণ্যের প্রচারে ‘ফেয়ারনেস’ শব্দটি এড়িয়ে ‘গ্লোয়িং’, ‘ফ্ললেস’, ‘ব্রাইটনেস’ নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। তবে বিপণন কৌশল থেকে ব্র্যান্ডের নামে ‘ইচ্ছাকৃতভাবেই’ ফেয়ার শব্দটি ব্যবহার হয়ে আসছিল।

ইউনিলিভার বাংলাদেশও বলছে, ২০১৯ সালের শুরুর দিকে ব্র্যান্ডের যাবতীয় যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ত্বক ফর্সা করার উপকারিতা’ এবং ‘ফর্সাকারি’ শব্দগুলোর পরিবর্তে ‘দ্যুতি’ বা ‘গ্লো’, ‘উজ্জ্বল আভা’, ‘ত্বকের নির্মলতা’ ও ‘উজ্জ্বলতা’ ব্যবহার করেছেন তারা।

আরও বলা হচ্ছে, বস্তুত পরিমার্জিত এই শব্দগুলো সুস্থ ত্বকের সামগ্রিক পরিচায়ক। এছাড়া রঙের পরিবর্তন নির্দেশক ও রঙ পরিবর্তন বোঝার শেড গাইড- ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্রায় সব প্যাকেট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বিজ্ঞাপনের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের নানা বর্ণের নারীদের উপস্থিতি এবং বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করবে কোম্পানিটি।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) কেদার লেলে বলেন, ‘আমরা আমাদের স্কিনকেয়ার পোর্টফোলিওকে আরও সার্বজনীন করে তুলছি এবং আমরা বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উদযাপনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই। ২০১৯ সালে ব্র্যান্ড যোগাযোগ প্রক্রিয়াকে যুগোপযোগী করে ‘ফেয়ারনেস’ এর পরিবর্তে ‘গ্লো’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবেই সুস্থ ত্বককে উপস্থাপন করে।’

‘এখন আমরা ঘোষণা করছি যে, আমাদের ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী’ ব্র্যান্ড নাম থেকে ‘ফেয়ার’ শব্দটি সরিয়ে ফেলব। ব্রান্ডটির নতুন নাম অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই পরিমার্জিত নামসহ পণ্যটি বাজারে পাওয়া যাবে।’

আরও পড়ুন:

চীনা পণ্য বয়কটের ডাকে বিপাকে ভারত

সিকিমে চীন-ভারত সেনাদের মধ্যে সংঘর্ষ, হাতাহাতি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *