কাটগড়া বাওড়: সম্ভাবনাময় এক বিনোদন কেন্দ্র

বাংলাদেশ

আব্দুল মালেক, মহেশপুর: ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত ঘেষে বিশাল এলাকা নিয়ে কাটগড়া বাওড়। এ অঞ্চলের অপার সম্ভাবনাময় এক বিনোদন কেন্দ্র বাওড়টি। মহেশপুর উপজেলার ১১নং মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়ন এবং যশোরের চৌগাছা উপজেলার ১১নং সুখপুকুরিয়া ইউনিয়নের জিরো পয়েন্টে ও পুড়াপাড়া বাজার সংলগ্ন কাটগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পূর্ব তিরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী এ বাওড়টি। কালের অনেক ইতিহাসের স্বাক্ষী এই বাওড় ।

বাওড়টির আয়তন ১৪৯ হেক্টর । ছোট-বড় সর্বমোট ১৬টি খালের পানি পতিত হয় এই কাটগড়া বাওড়ে। আর একটি খালের মাধ্যমে এই বাওড়টির পানি বের হয়ে খড়িঞ্চা বাওড়ে পতিত হয় । এই বাওড়টিতে রয়েছে অসংখ্য সৌন্দর্য্য মণ্ডিত পুকুর এবং চারপাশে সরু রাস্তা ।

বাওড়ের শুরুতেই পুড়াপাড়া-মহেশপুর সড়কের পাশেই রয়েছে মৎস্য অফিস । এবং তার ঠিক পরেই রয়েছে মৎস্য আহরণের ল্যান্ডিং স্পেস । যেখানে বাওড় থেকে জেলেরা মাছ ধরে ওজন এবং বিপনণ করেন (এলাকায় এটি ‘ঠান্ডা ঘর’ নামে পরিচিত) । কোনো সুহৃদয় ব্যাক্তি এখানে অর্থ বিনিয়োগ করলে সীমান্তবর্তী এই অঞ্চল হতো বিনোদনের একমাত্র কেন্দ্রস্থান ।

যশোর থেকে চুড়ামনকাঠি বাজার হয়ে ‘যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়’ পার হয়ে চৌগাছা বাজার; সেখান থেকে যেকোনো গাড়িতে করে মাত্র ০৯ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হবে পুড়াপাড়া বাজার । আবার, ঝিনাইদহ থেকে সরাসরি আসতে হবে মহেশপুর । সেখান থেকে ঐ একই ভাবে যেকোনো গাড়িতে করে মাত্র ১০ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিয়ে আসতে হবে পুড়াপাড়া বাজার । আর ঠিক ঐ পুড়াপাড়া বাজারের পাশেই অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কাটগড়া বাওড় ।

বিনোদনের জন্য এখানে এসে পূর্ব দিকে পুকুর পাড় সহ আশপাশের বিভিন্ন মনোরম পরিবেশে রয়েছে রান্নার সুব্যবস্থা । এই বাওড়ে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় নৌকা । কারো দীর্ঘদিনের নৌকা ভ্রমনের শখ থাকলে অবশ্যয় এখান থেকে করতে পারেন ‘নৌকা ভ্রমণ’ ।

বাওড়ের কোল ঘেসে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় রংবেরঙ্গের ব্রিজ এবং কালভার্ট । বাওড়ের দক্ষিণ পাশের পাড় ধরে হাটতে থাকলে সামনেই পড়বে একটি ছোট্ট গ্রাম। গ্রামটির নাম মহেশখোলা। এই গ্রামে বসবাস করে অল্প কিছু হিন্দু সম্প্রদায়ের পরিবার। আর এই মহেশখোলা গ্রাম পার হলেই সামনে পড়বে আরোএকটি দর্শনীয় স্থান । এই স্থানটির নাম ‘কালী তলা’ । যায়গাটিতে কেউ একবার না ঘুরে আসলে বুঝতে পারবেন না, যায়গাটা আসলে কত সুন্দর। এছাড়া বাওড়ের দক্ষিণ পাশের ধারে রয়েছে শ্বশান ঘাট । এখানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেদেরকে সৎ্কার করা হয় । এটিও একটি দর্শনীয় স্থান । ইতিপূর্বে অনেক দূর-দুরান্ত থেকে প্রকৃতি প্রেমিরা এই কাটগড়া বাওড় ভ্রমণে এসেছেন; এবং প্রতিনিয়ত এখনো অনেকে আসেন ।

বাওড়ের অফিস ভবনের পূর্ব দিকে রাস্তার পাশেই অবস্থিত কাটগড়া কলেজ । বর্তমানে এটি ‘ডাঃ সাইফুল ইসলাম ডিগ্রী কলেজ, কাটগড়া নামে পরিচিত । বর্তমানে এই কলেজটি এলাকায় বেশ সুনাম অর্জন করেছে । দর্শনীয় স্থান হিসাবে এই কলেজটিও কিন্তু একেবারে খারাপ নই । এই কলেজটিতে রয়েছে সবুজ ঘাসে ভরা একটি বৃহত্তর মাঠ, এবং মনরোম পরিবেশ ।

পুড়াপাড়া বাজার থেকে একটু দূরেই কমলাপুর গ্রাম । এই গ্রামটি পার হলেই আলিশা গ্রাম । যেখানে মহি নামে এক ব্যাক্তি তার নিজের নামে ‘মহিউদ্যান’ নামে একটি বিনোদন মূলক যায়গা করার চেষ্টা করছে । যার পূর্ব পাশে অসংখ্য পুকুর । সেখানে গেলে সত্যিই মন ভরে যায় । সবুজের নীরবতা ছেড়ে এবার একটু যন্ত্র-যান্ত্রিকতার মাঝে ফিরে যায় ।

পুড়াপাড়া বাজারের পাশেই রয়েছে আরো একটি গ্রাম । শ্যামনগর । এই গ্রামে রয়েছে একটি বাছাই মিল । সেখানে শত শত মণ চাউল বাছায় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করা হয় । তার ঠিক পাশের রাস্তা ধরে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে তাকালে দেখতে পাওয়া যাবে একটি রাধা বল্লভ মন্দির তার উত্তর পাশেই রয়েছে বৃহত্তর ‘অটো রাইচ মিল’ । এই রাইচ মিল শুক্রবার বাদে প্রতদিন খোলা থাকে । এখান থেকে প্রতিবছর শত শত টন চাউল উৎপাদন করে দেশের সর্বত্র পাঠানো হয়ে থাকে । চৌগাছা উপজেলার মধ্যে এটিই হচ্ছে সর্ববৃহত্তর অটো রাইচ মিল । এই রাইচ মিলের পাশের রাস্তা ধরে সামনে এগোলেই দেখতে পাওয়া যাবে সদ্য নির্মিত ‘যশোর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১’ এর চৌগাছা শাখার সাব-স্টেশন ।

তার ঠিক সামনের রাস্তা ধরে এগোলেই সামনে পড়বে আবার পুড়াপাড়া বাজার । বাজারের ভেতরে বকুল তলা মোড়ের দক্ষিণ দিকের সরু রাস্তা দিয়ে গেলে সামনেই পড়বে ইতিহাসের স্বাক্ষী হিসাবে খ্যাত স্বনামধন্য ঐতিহ্যবাহী কাটগড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় । বর্তমানে এই বিদ্যালয়টি যেই স্থানে অবস্থিত, ব্রিটীশ আমলে সেখানে ইংরেজদের ‘নীল কুঠি’ ছিলো যার নাম ছিল ‘কাটগড়া কনসারেন্স’ । সেইসবের ধ্বংসাবষেশ দৃশ্যমান না হলেও এখনো কিছু লক্ষ্য করা যায় । তারপরেই রয়েছে আবার সেই ঐতিহ্যবাহী কাটগড়া বাওড় ।

এবার বাওড়ের উত্তর সরু রাস্তা ধরে গেলেই বিশ্বনাথপুর গ্রাম। পাশে মুজিদ মেম্বার এর পুকুর এবং বাগানবাড়ি তার পরেই সেই খাল। খাল পার হয়েই শশান ঘাট। শ্বশান ঘাটের ঠিক দক্ষিণে বোয়ালিয়া বিল। যে বিলে রয়েছে অসংখ্য পুকুর, রয়েছে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর নিকট থেকে পুরষ্কার প্রাপ্ত মৎস্য চাষী আবুল কাশেম এর মাছের ভেড়ী । তার পর আরএকটু এগিয়ে গেলে এস, কে, কম্পিউটার সবুজ ভাই এর সুন্দর একটি পুকুর। তার পরেই একটু পার হয়ে উত্তর দিকে গেলে সুদর্শন লম্বু বাগান এবং শাহাপুরের পুরাতন ঘাট আর একটু পার হলেই কাশিপুরের ব্রিজ তার সামনে জোকা গ্রাম। গ্রামটি বামে রেখে সরু রাস্তা ধরে এগোলেই আবার দেখা মিলবে সেই কালি তলা ।

১১নং মান্দারবাড়ীয়া ইউনিয়নের অফিসিয়াল সরকারি ওয়েবসাইটে ইউনিয়নের যে ৩টি দর্শনীয় স্থানের নাম দেওয়া রয়েছে, তার দুইটি’ই হচ্ছে কাটগড়া বাওড়কে কেন্দ্র করে (কাটগড়া বাওড় ও কালী তলা) । দর্শনীয় স্থান হলেও কাটগড়া বাওড় ক্রমশই যেন তার যৌবন হারাতে বসেছে । আগে এই বাওড়টির পুকুর সংরক্ষণের জন্য চারপাশে কাটাতারের বেড়া দেওয়া ছিলো। কিন্তু সেই সব এখন ঊধাও ! প্রশাসন অথবা কোনো সুহৃদয় ব্যাক্তি যদি এই দর্শনীয় স্থানটিতে অর্থ বিনিয়োগ করে, তাহলে হয়ত বিভিন্ন অঞ্চলের লোক এখানে আসত, এবং তাদের অবসর সময় বিনোদনের সাথে যাপন করতে পারত।

আরও পড়ুন:

ঝিনাইদহে করোনা আক্রান্ত ৩০০ ছাড়াল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *