চীনে ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২৭টিতে বন্যা দেখা দিয়েছে

চীনের ৩১টি প্রদেশের ২৭টিতেই বন্যা, মৃত্যু ১৪০

চীন লিড নিউজ

বেইজিং, চীন- একটানা তুমুল বৃষ্টিপাতের পর চীনের বিশাল অঞ্চলজুড়ে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে। মূলভূখণ্ডের ৩১টি প্রদেশের ২৭টিই এখন বন্যার কবলে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রদেশের গ্রামগুলোর প্রায় সাড়ে তিন কোটি লোক বন্যাকবলিত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে কিংবা খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না, এমন ব্যক্তির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪০। রয়টার্স, শিনহুয়া।

দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জুলাইয়ের প্রথমদিক থেকে ২১২টি নদীর পানি বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইছে। এর মধ্যে ১৯টি নদীর পানি স্মরণকালের মধ্যে সবচেয়ে বেশি উচ্চতা অতিক্রম করেছে।  পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক ইয়াংসির নদীর অববাহিকায় বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। চীনের সবচেয়ে বড় মিঠাপানির হ্রদ পয়াংয়ের উপচে পড়া পানি ইয়াংসি নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে বহু শহর ও গ্রাম ডুবিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছে কর্তৃপক্ষগুলো।

ইয়াংসি নদীর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় রোববার কর্তৃপক্ষ দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বন্যা সতর্কতা জারি করেছে। ইয়াংসির তীরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যে পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ জিয়াংসু ও জিয়াংশি সবচেয়ে বেশি বন্যাকবলিত হয়েছে। চীনে বন্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য ৪ স্তরের জরুরি সতর্কতা ব্যবস্থা আছে। এর মধ্যে প্রথম স্তর সবচেয়ে মারাত্মক বন্যা পরিস্থিতি বোঝায়।

সিনহুয়ার তথ্য অনুযায়ী, জিয়াংসিতে যে দুই হাজার ৫৪৫ কিলোমিটার বাঁধ আছে, তার মধ্যে দুই হাজার ২৪২ কিলোমিটার বাঁধের আশপাশের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। প্রদেশটির স্থানীয় কর্মকর্তাদের অনেককেই নির্ঘুম রাত কাটাতে হচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

খবরে বলা হয়েছে, গত ৭০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে চীন। চলতি বছরের জুন মাস থেকেই  দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলজুড়ে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হচ্ছে। কিন্তু বর্ষার শুরুতেই নতুন মাত্রায় ভারিবৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। লাগাতার এই বর্ষণে একাধিক নদীর পানি উপচে প্লাবিত হয়েছে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কয়েকটি নদীর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে।  কোথাও কোথাও ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। নদীর তীরবর্তী অঞ্চলের লাখ লাখ মানুষকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবারের বন্যায় আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৪০ লাখ অধিবাসী। এখন পর্যন্ত বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ১৪০ জন নিহত হয়েছে।

পূর্বাঞ্চলে জিয়াংজি প্রদেশে নদীতীরবর্তী বাধে আশ্রয় নিয়েছে এই অঞ্চলের কয়েক লাখ অধিবাসী। কিন্তু নদীর পানির চাপে বাধগুলোতেও ফাটল দেখা দিয়েছে। যেকোনো সময় ভেঙে পড়ার আশংকা করা হচ্ছে। জিয়াংজি প্রদেশের শাংগ্রাওয়ের পোয়াং অঞ্চলে সি নদীর তীরবর্তী বাধে পরিবারসহ আশ্রয় নিয়েছেন উ শেংসন। শনিবার রাতেও তার নির্ঘুম গেছে। অঝোর বৃষ্টির মধ্যেই বাধ ভেঙে পড়ার ভয়ে আরও কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে সারারাত জেগে জেগে পাহারা দেন তিনি।

‘আমি খানিকটা উদ্বিগ্ন। পূর্বাভাসে টানা কয়েকদিন বৃষ্টির কথা বলা হয়েছে,’ বলেছিলেন পয়াং হ্রদের নিকটে অবস্থিত ওয়ানলি গ্রামের কর্মকর্তা উ শেংসং। তুমুল বৃষ্টি আর ইয়াংসি নদীর উজান থেকে আসা বন্যার পানিতে রোববার সকালের মধ্যেই পয়াংয়ের পানি উঠে যায় রেকর্ড ৭৪ ফুট উঁচুতে; ঝুঁকিতে ফেলে দেয় জলাশয়টির বাঁধের আশপাশের অসংখ্য এলাকাকে।

শনিবার সন্ধ্যায় প্রদেশেটির সামরিক কর্তৃপক্ষ হ্রদটির ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় নয় কিলোমিটার বাঁধ মেরামতের জন্য কয়েক হাজার সৈন্য মোতায়েন করেছে বলে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানিয়েছে।  উ’র গ্রাম ওয়ানলি হচ্ছে চীনের এবারের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত অসংখ্য গ্রামের একটি। শনিবার পর্যন্ত ২৭টি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়া বন্যায় প্রায় তিন কোটি ৪০ লাখ লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত সপ্তাহের সোমবার থেকে দেখা দেয়া বন্যায় শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৫টা পর্যন্ত জিয়াংসির ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স; নিরাপদে আশ্রয়ে সরিয়ে নেয়া হয়েছে ৪ লাখ ৩২ হাজার মানুষকে। বৃষ্টি-বন্যায় প্রদেশটির ৪৫ লাখ ৬০ হাজার হেক্টর ফসল ক্ষতিগ্রস্ত ও ৯৮৮টি বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, তাৎক্ষণিক ক্ষতির পরিমাণ সাড়ে ৬০ বিলিয়ন ইউয়ান ছাড়িয়ে গেছে বলে জানিয়েছে সিসিটিভি।

বিপর্যস্ত এ প্রদেশটিতে এরই মধ্যে উদ্ধারকারী নৌকা, তাঁবু, ফোল্ডিং বিছানা ও কম্বল পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে চীনের জরুরি ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। ব্যাপক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস জানিয়ে শনিবার চীনের ন্যাশনাল অবজার্ভেটরি দক্ষিণাঞ্চলীয় হুনান, মধ্যাঞ্চলীয় হুবেই, দক্ষিণপশ্চিমের চংকিং এবং সিচুয়ান প্রদেশে নতুন করে ‘ইয়েলো অ্যালার্ট’  জারি করেছে।

অন্যরা আরও যা পড়ছে:

হংকংয়ে যৌন হয়রানির শিকার লাখ লাখ গৃহকর্মী

যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি চীন: এফবিআই প্রধান

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *