হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদ করায় পোপের ক্ষোভ প্রকাশ

হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদ করায় ক্ষোভ প্রকাশ পোপের

ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য

ভ্যাটিকান সিটি- তুরস্কের ইস্তাম্বুলে ঐতিহাসিক হাজিয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরের সিদ্ধান্তে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের ধর্মীয় গুরু পোপ ফ্রান্সিস। তিনি বলেছেন, হাজিয়া সোফিয়া সিদ্ধান্তে তিনি ‘মনে ব্যাথা’ পেয়েছেন তিনি। রোববার( ১২ জুলাই)  সেন্ট পিটারস স্কয়ারে দেয়া সাপ্তাহিক ভাষণে পোপ বলেন, ‘ইস্তাম্বুল নিয়ে আমার চিন্তা হচ্ছে। আমি সেইন্ট সোফিয়ার ব্যাপারে চিন্তা করছি। আমি খুব কষ্ট পেয়েছি।’রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আগামী ২৪ জুলাই হাজিয়া সোফিয়ায় প্রথম নামাজ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোগান। প্রসিদ্ধ ওই স্থাপনার জাদুঘরের মর্যাদা বাতিল করে মসজিদে রূপান্তরের আদেশ জারি করে দেশটির আদালত। এর পরেই তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান হায়া সোফিয়াকে মসজিদ হিসেবে ঘোষণা দেন।

এরদোগান অবশ্য জানিয়েছেন, মসজিদ হিসেবে ব্যবহৃত হলেও আয়া সোফিয়া দেখার জন্য সমস্ত ধর্মের পর্যটকরাই সেখানে প্রবেশ করতে পারবেন। কিন্তু তাতেও নিন্দা থামছে না। গ্রিস সহ বেশ কিছু দেশ তুরস্কের এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছে। ইউনেস্কো জানিয়েছে, আয়া সোফিয়ার ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ স্টেটাস পুনর্বিবেচনা করা হবে।

জার্মানির তুর্কি সম্প্রদায়ও এরদোগানের বিরোধিতা করে জানিয়েছেন, এর ফলে দেশের ভাবমূর্তি ধাক্কা খেল। দেশের ভিতরেও প্রতিবাদ হচ্ছে। বিশিষ্ট লেখক অরহান পামুক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ধর্মনিরপেক্ষ তুরস্ক নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের গর্ব ছিল, তা ধসে গেল। তবে আয়া সোফিয়াকে ফের মসজিদে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট চাপও ছিল দেশের ভিতরে। দেশের একাংশের মানুষ অনেক দিন ধরেই চাইছিলেন, কাঠামোটি আবার মসজিদ হিসেবে খুলে দেয়া হোক। দেশের সরকারও তা সমর্থন করেছিল।

হাজিয়া সোফিয়ার তুর্কি নাম ‘আয়াসোফিয়া’। একে ‘পবিত্র জ্ঞানের চার্চ’ বা ‘স্বর্গীয় জ্ঞানের চার্চ’ নামেও ডাকা হয়। সর্বপ্রথম ৩৬০ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট কন্সটান্টিয়াস, বাইজেন্টাইন ব্যাসিলিকা হিসেবে হাজিয়া সোফিয়া নির্মাণের নির্দেশ দেন।

প্রথম নির্মিত হাজিয়া সোফিয়ার ছাদ  কাঠের তৈরি ছিলো। রাজপরিবারের ক্ষমতাসংক্রান্ত কলহের জেরে ৪০৪ খ্রিস্টাব্দে সে ছাদ আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছিল। এরপর ৪১৫ সালে হাজিয়া সোফিয়া নতুন করে নির্মাণ করেন সম্রাট থিওডোসিওস। এর ছাদও ছিল কাঠের তৈরি।

এক শতাব্দীর কিছু বেশি সময় টিকে ছিল দ্বিতীয়বারে নির্মিত হাজিয়া সোফিয়া। দ্বিতীয়টিরও কপালে জুটেছিল আগুনের আঁচ। সেবারে হাজিয়া সোফিয়া পুড়েছিল সম্রাট প্রথম জাস্টিনিয়ানের বিরুদ্ধে প্রজাদের বিদ্রোহের আগুনে। এরপর বাইজেন্টাইন সম্রাটে জাস্টিনিয়ান’র উদ্যেগে তৃতীয়বার নির্মিত অনন্য সাধারণ হাজিয়া সোফিয়ার নির্মাণ শেষ হয় ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে, যা আজও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে স্বগৌরবে।

বাইজেন্টাইনরা গ্রিকদের সনাতন ধর্ম অনুসরণ করত, আর হাজিয়া সোফিয়া ছিল তাদের প্রধান প্রার্থনালয়। এখানেই বাইজেন্টাইন সম্রাটরা শপথ নিতেন, প্রথম মুকুট পরতেন। ৯০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের এই ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে হাজিয়া সোফিয়া।

ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম এবং খ্রিস্টানদের মধ্যে সংগঠিত ক্রুসেডে হাজিয়া সোফিয়া কিছু সময়ের জন্য রোমানদের দখলে চলে যায়। সেসময় এটি রোমান ক্যাথলিক ক্যাথেড্রাল হিসেবে ব্যবহৃত হয় কিছুকাল। যতদিনে বাইজেন্টাইনরা পুনরায় এই স্থাপত্যের দখল ফিরে পায়, ততদিনে এটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাই বাইজেন্টাইন শাসকগণ আবারও মেরামত করে তাদের সাধের প্রার্থনালয়ের পুরনো সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনেন।

পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে অটোম্যান সম্রাট সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ কন্সট্যান্টিনোপল দখল করেন। অটোমানরা কন্সট্যান্টিনোপলের নতুন নাম দেয় ইস্তাম্বুল। ইস্তাম্বুলের উপর অটোমানদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে সুলতান মুহাম্মদ আল ফাতিহ হাজিয়া সোফিয়াকে নিজ অর্থে ক্রয় করে মসজিদ হিসেবে রুপান্তরের চিন্তা করেন। হাজিয়া সোফিয়ার ভেতরের অনেক খ্রিস্টীয় নিদর্শনকে তারা বদলে ফেলেন।

এ স্থাপত্যের দেয়ালে এবং মেঝেতে যেসব খ্রিস্টীয় প্রতীক ছিলো, সেগুলোকে অটোমানরা ঢেকে ফেলে ইসলামিক লিপি দিয়ে। মসজিদের ঐতিহ্য অনুসারে একটি মিহরাব স্থাপন করা হয় হাজিয়া সোফিয়ার পশ্চিমের দেয়ালে।  এ স্থাপত্যকে ঘিরে চারদিকে নির্মাণ করা হয় চারটি মিনার, যেগুলো থেকে আযানের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ত চারপাশে। সময়ের পরিক্রমায় এমন অনেক কিছুই পরিবর্তিত হয়ে হাজিয়া সোফিয়া ব্যবহৃত হতে থাকে মুসলিমদের প্রার্থনালয় মসজিদ হিসেবে।

অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের একশ বছর পরে আজও, রাজনীতি ও ধর্মীয় ক্ষেত্রে হাজিয়া সোফিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় অবতীর্ণ। কামাল আতাতুর্ক তুরস্ক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নয় বছর পরে, ১৯৩৫ সালে হাজিয়া সোফিয়াকে একটি জাদুঘরে রুপান্তর করা হয়। জাদুঘরে রুপান্তরের পরে বাইজেন্টাইন আমলের বিভিন্ন খ্রিস্টীয় প্রতীক ও ছবি পুনঃস্থাপন করা হয় হাজিয়া সোফিয়াতে।

আরও পড়ুন:

তুরস্কের হাজিয়া সোফিয়া মসজিদে রূপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *