হাফতার বাহিনীর সহায়তায় ভুয়া নোট ছাপাচ্ছে রাশিয়া

হাফতার বাহিনীর সহায়তায় ভুয়া নোট ছাপাচ্ছে রাশিয়া

ইউরোপ মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

লিবিয়ায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নেতা খলিফা হাফতার বাহিনীর সহায়তায় কোটি কোটি ভুয়া নোট ছাপানো হচ্ছে। ত্রিপোলির যুদ্ধে অর্থায়নের লক্ষ্যে এসব অবৈধ নোট ছাপানো হচ্ছে রাশিয়ায়। সম্প্রতি লিবিয়ায় পাচারকালে প্রায় ৮০০ কোটি দিনার সমমূল্যের ভুয়া নোট আটক করা হযেছে। এরপর থেকে নগদ লেনদেন প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে দেশটির দোকান মালিক ও ব্যবসায়ীরা। আলজাজিরার বরাত দিয়ে বুধবার এ খবর দিয়েছে মিডিল ইস্ট মনিটর।

আলজাজিরা জানায়, দুই মাস আগেই দুই জাহাজ ভর্তি প্রায় ১০০ কোটি ডলার সমমূল্যের দিনারের নতুন ভুয়া নোট উদ্ধার করা হয়। এসব নোট রাশিয়ায় ছাপানো হয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে। তবে রাশিয়া এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, লিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে বিদ্রোহী নেতা হাফতার বাহিনীর সহায়তায় মস্কোর একটি প্রিন্টিং ফ্যাক্টরি থেকে পাঠানো হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, রাজধানী ত্রিপোলি দখলের লক্ষ্যে যোদ্ধাদের বেতন দিতে এসব ভুয়া নোট ব্যবহার করছেন হাফতার।    

২০১১ সালে লিবিয়ার সাবেক একনায়ক প্রেসিডেন্ট মুয়াম্মার গাদ্দাফির পতনের পর থেকে প্রায় এক দশক ধরে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। এক সময়ের আফ্রিকার তৃতীয় সর্বোচ্চ তেল উৎপাদনকারী দেশটির লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণে লড়াই করছে কয়েকটি পক্ষ। বর্তমানে লিবিয়ায় জাতিসংঘের সমর্থন পুষ্ট সরকার বিদ্রোহী নেতা জেনারেল খালিফা হাফতারের বাহিনীর সাথে লড়ছে। লিবিয়ার পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ এই মুহূর্তে খালিফা হাফতারের বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। 

লিবিয়ার গৃহযুদ্ধে জড়িত দুই পক্ষের পেছনেই আন্তর্জাতিক সমর্থন আছে। তুরস্ক, ইতালি এবং কাতার ত্রিপলিতে এই মুহূর্তে শাসনক্ষমতায় আছে যে জিএনএ সরকার (গভর্নমেন্ট অফ ন্যাশানাল অ্যাকর্ড) তাদের মদত দিচ্ছে। অন্যদিকে রাশিয়া, মিশর ও সংযুক্ত আরব আমীরাত সমর্থন করে জেনারেল হাফতারকে। ধারণা করা হয় যে, ফ্রান্সও জেনারেল হাফতারের সমর্থক, যদিও ফরাসী সরকার বারবার একথা অস্বীকার করেছে।

জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞায় লিবিয়াতে কোন সৈন্য মোতায়েন করা যাবে না এবং অস্ত্র পাঠানো নিষিদ্ধ। কিন্তু তা খুবই কম কার্যকর হয়েছে। তুরস্ক ২০১৯ সালে জিএনএ সরকারের সাথে একটি সামরিক চুক্তি করে এবং জানুয়ারি মাসে দেশটিতে সৈন্য মোতায়েন করে।

গত মাসে জিএনএ বাহিনী অবশেষে ত্রিপলির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় যার পেছনে মূল কারণ ছিল তুরস্কের সহযোগিতা। জেনারেল হাফতার শহরের উপকণ্ঠ থেকে তার সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয় বলে খবর পাওয়া যায়। মে মাসে ফাঁস হওয়া জাতিসংঘের এক রিপোর্টে বলা হয় যে, ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন পরিচালিত রাশিয়ার ওয়াগনার গ্রুপ থেকে কয়েক’শ সৈন্য লিবিয়ায় জেনারেল হাফতারের সমর্থনে কাজ করছে।

বলা হয়, ইয়েভগেনি প্রিগোঝিন প্রেসিডেন্ট পুতিনের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী। আবার এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে যে এই ওয়াগনার গ্রুপের ভাড়াটে সৈন্যরা লিবিয়া ছেড়ে চলে যাচ্ছে, যদিও এই খবর নিশ্চিত করা যায়নি।

এক দেশ দুই সরকার

২০১১ সালে ন্যাটো সমর্থিত সামরিক অভিযানে গাদ্দাফিকে উৎখাত করা হলেও দেশটিতে এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া সম্ভব হয়নি। ২০১৫ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে বিবদমান পক্ষগুলোকে সাথে নিয়ে অন্তবর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, যা গভর্মেন্ট অব ন্যাশনাল একর্ড (জিএনএ) নামে পরিচিত। পরবর্তীকালে ফায়েজ আল সারাজের নেতৃত্বাধীন  জিএনএ সাথে বিরোধে লিপ্ত হয় খলিফা হাফতারের নেতৃত্বাধীন লিবিয়ান ন্যাশনাল আর্মি(এলএনএ)।

বর্তমানে ত্রিপোলিতে অবস্থিত জিএনএর দখলে আছে সমূদ্রতীরবর্তি ত্রিপোলি, মিসরাতার মতো জনবহুল শহর, অন্যদিকে হাফতারের এলএনএর নিয়ন্ত্রণে আছে পূর্ব ও দক্ষিণের বিস্তীর্ণ জনবিরল অঞ্চল এবং সির্ত, তর্বুক, ডের্না এবং বেনগাজির মতো বড় শহর।  লিবিয়ায় প্রকৃতপক্ষেই দুইটি আলাদা সরকার যাদের অধীনে রয়েছে আলাদা সেনাবাহিনী।

এর মধ্যে খলিফা হাফতার গত মার্চে পুরো লিবিয়ার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে রাজধানী ত্রিপোলি দখলের ঘোষণা দিলে নতুন করে অস্থিতিশীলতার সূত্রপাত ঘটে। শক্তিশালী বিমানবাহিনী থাকায় হাফতারবাহিনী শুরুতে বেশ কিছু শহর দখল করে নির্বিঘ্নেই ত্রিপোলির দিকে অগ্রসর হতে থাকে।

এরপর তুরস্ক জাতিসংঘ সমর্থিত সারাজের নিয়ন্ত্রাধীন জিএনএ-র সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। বিপুল পরিমাণে গোলাবারুদ, অত্যাধুনিক ড্রোন আর সিরিয়া থেকে বিদ্রোহীদের এনে হাফতার বাহিনীর ত্রিপোলি অভিযান রুখে দিতে সক্ষম হয়। ব্যাপক প্রতিরোধের মুখে আপাতত পিছু হটতে বাধ্য হয়

প্রক্সি যুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র

দুইটি পরস্পর বিরোধী সরকারের নেতৃত্বে দুইজন লিবিয়ান থাকলেও আদতে সিরিয়া, ইয়েমেনের পর বৃহৎ  আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর প্রক্সিযুদ্ধের নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে লিবিয়া। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং লিবিয়ার বিপুল জ্বালানি সম্পদের দখল নেওয়াকেই বিশ্লেষকরা এর কারণ বলে মনে করছেন। বিবাদমান দুই পক্ষের মধ্যে একদিকে রয়েছে জিএনএ যারা তুরষ্কের শক্তিশালী সমর্থন পেয়ে আসছে।

যদিও কাগজকলমে জিএনএ জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সমর্থনধারী সরকার হলেও শুরু থেকেই ফ্রান্স ও ইতালির মতো শক্তিশালী ইউরোপীয় শক্তি হাফতারের এলএনএর দিকে ঝুঁকে পড়ে। পরবর্তীতে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ইসরায়েলসহ রাশিয়া হাফতারকে পুরো লিবিয়ার শাসক বানাতে সর্বাত্মক সহযোগিতা শুরু করে।

সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত জোট কাতারে অবরোধ দিলে তুরস্ক কাতারের পক্ষে এগিয়ে আসে, তেমনি লিবিয়া গৃহযুদ্ধেও তারা আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে পরস্পরবিরোধী বাহিনীর পক্ষ নিয়েছে। অন্যদিকে সিরিয়াতে রাশিয়া বাশার আল আসাদের পক্ষ নেয় আর তুরস্ক পক্ষ নেয় আসাদবিরোধীদের। লিবিয়াতেও দুই পক্ষ মুখোমুখি অবস্থানে আছে। তুরস্কের সামরিক সহায়তায় জিএনএর প্রতি-আক্রমণের মুখে এই সপ্তাহে হাফতারের বাহিনী ত্রিপোলি থেকে পিছু হটতে শুরু করে। 

জিএনএ এর পক্ষে এরদোয়ানের তুরস্কের সামরিক সহায়তার সমালোচনা করে খলিফা হাফতার একে অটোমান ঔপনিবেশের সাথে তুলনা করেন। যদিও এটা সত্য যে, এরদোয়ান গত কয়েক বছর ধরে সাবেক অটোমান দেশগুলোর উপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে, কিন্তু খালিফা হাফতার নিজেই বিদেশি শক্তিগুলোর কাছ থেকে অবাধ সহযোগিতা পেয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিদ্ধস্ত অন্যান্য দেশসমূহ যেমন সিরিয়া, ইয়েমেন, লেবাননের মতোই আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের বলি হচ্ছে লিবিয়া।

লিবিয়া সংকট নিযে আরও পড়তে পারেন:

লিবিয়ায় মুখোমুখি মিসরীয় ও তুর্কি বাহিনী

    

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *