ভারতীয় ঘুঁটিতে চীনকে ঘিরতে চায় যুক্তরাষ্ট্র

আমেরিকা চীন ভারত

ভারতীয় ঘুঁটিতে চীনকে ঘিরতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও ভারতের মধ্যে গত দশকে পারস্পরিক সম্পর্ক ভিন্নমাত্রায় পৌঁছেছিল। দুই দেশের মধ্যে অমিমাংসিত সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও গত ৪৫ বছরে কোন ধরনের সীমান্ত সংঘাত হয়নি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর এই পর্যন্ত পাঁচবার চীন সফর করেছেন। চীনা প্রেসিডেন্টের সাথে তার বিভিন্নভাবে ১৮ বার সাক্ষাৎ হয়েছে। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময় থেকে চীনের সাথে নরেন্দ্র মোদি সুসম্পর্ক বিরাজমান ছিল।

পঞ্চশীল ও হিন্দি চীনা ভাই ভাই কূটনীতিকে দুই দেশের সম্পর্কের ভিত্তি ধরা হয়। ভারতে চীনের ব্যাপক বিনিয়োগ রয়েছে। ব্রিকসের অন্যতম অংশীদার চীন ও ভারত। এছাড়া চীনা নেতৃত্বের সাংহাই করপোরেশনের সদস্য ভারত ও পাকিস্তান। চলতি বছরে দিল্লীতে সাংহাই করপোরেশনের সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে লাদাখ ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। গত ১৫ জুন লাদাখে লাইন অব এক্সুয়াল কন্ট্রোলের অনেক ভেতরে ঢুকে ভারতীয় সেনার সাথে সংঘর্ষে জড়ায় চীন। ফলে দুই দেশের মধ্যে শুরুতে বাকযুদ্ধ, উত্তেজনা ও এখন বাণিজ্য যুদ্ধ চরম আকার ধারণ করেছে। ভারত চীনের অনেক প্রকল্প চুক্তি বাতিলসহ ৫৯টি চীনা অ্যাপস নিষিদ্ধ করেছে।

কিন্তু কেন হঠাৎ করে দুই দেশ জনবসতিহীন লাদাখ নিয়ে সংঘর্ষে জড়াল! লাদাগ একটি জনবসতিহীন অঞ্চল হলেও এই জায়গার কৌশলগত গুরুত্ব রয়েছে। লাদাখের রাজধানী লেহ থেকে নিজেদের সীমান্তের বিমানঘাঁটি দৌলতবেগ বরাবর ভারত যে রাস্তা নির্মাণ করছে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন চীন। উদ্বিগ্নতার কারণও আছে। লাদাখ সীমান্তের অপারে চীনের স্বায়ত্বশাসিত তিব্বত ও উইঘুর মুসলিমদের ঝিং ঝিয়াং প্রদেশ। দুই প্রদেশেই অভ্যন্তরীণ সংকট চলছে।

ভারতের ধর্মশালায় তিব্বতের একটি প্রবাসী সরকার রয়েছে। সম্প্রতি চীনের অভ্যন্তরীণ সংকটে ‘উসকানি’ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত মে মাসে মার্কিন কংগ্রেস উইঘুর মুসলিমদের মানবাধিকার রক্ষায় একটি বিল পাস করেছে। এছাড়া তিব্বতকে একটি ‘স্বাধীন দেশ’ আখ্যা দিয়েও বিল এনেছে মার্কিন কংগ্রেস। তাইওয়ানকে অস্ত্র বিক্রি করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

হংকং ইস্যুতে মার্কিন অবরোধের পরিকল্পনার পাশাপাশি যুক্তরাজ্য ৩০ লাখ হংকং বাসিন্দাকে নাগরিকত্বের প্রস্তাব দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-চীনের এই স্নায়ুযুদ্ধ বহুদিনের। সে যুদ্ধের অংশ হিসাবে এবার চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে তৈরি করছে যুক্তরাষ্ট্র। চীনও ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘনিষ্টতা ও সীমান্তে ভারতীয় সামরিক আয়োজনকে তাই নিজের নিরাপত্তার সংকট হিসাবে দেখছে।

অর্থনীতিতে চীনের উত্থান নিয়ে মার্কিন নীতি নির্ধারকরা বহু আগে থেকে উদ্বিগ্ন। চীনও মার্কিন বলয়ের বিরুদ্ধে ব্রিকস গঠন করে। বিশ্বব্যাংককে ঠেক্কা দিতে গঠন করে ব্রিকস নিউ ডেপেলপমেন্ট ব্যাংক। যুক্তরাষ্ট্রও বিশ্ব অর্থনীতিতে চীন ঠেকাতে মরিয়া। তারা কখনো চাইবে না মার্কিন বলয়ের বাইরে ব্রিকস শক্তিশালী হউক বা  চীন-ভারত একত্র হয়ে বিশ্বায়নকে এশিয়াকেন্দ্রিক করে ফেলুক। ফলে বর্তমানে স্থল সীমান্তে ভারত-চীনের উত্তেজনায় অপ্রকাশ্যে ফুরফুরে আছে হোয়াইট হাউজ।

যুক্তরাষ্ট্র বহুভাবে চীনকে সামরিকভাবে ঘিরে ফেলছে। চীন সাগরে তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালেশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামের সাথে চীনের উত্তেজনার কলকাঠি নাড়ছে যুক্তরাষ্ট্র। ভারত মহাসাগরে চীনবিরোধী যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সামরিক জোট QUAD এর নৌ মহড়ার প্রস্তুতি চলছে।

 চীনের শত্রু অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রে সাথে ভারতের সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করার চুক্তি হয়েছে ইতিমধ্যে। চীনের সাথে বিরোধপূর্ণ প্রতিবেশী জাপান আর কোরিয়ার সামরিক খাত মার্কিন অস্ত্রে ঝনঝন করছে। গতবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের কাছে ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রি করেছে ৩৩০ কোটি ডলারের আর কোরিয়া কিনেছে প্রায় ৬০ কোটি ডলারের ক্ষেপণাস্ত্র। এই রণাঙ্গনের উদ্দেশ্য চীন।

২০১৭ সালে ডোকলাম নিয়ে চীন-ভারতের উত্তেজনা ব্রিকস সম্মেলনকে কেন্দ্র করে পশমিত হলেও লাদাখে তা দেখা যায়নি। এবার বরং ফ্রান্সের রাফায়েল জেট, রাশিয়ার এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন নরেন্দ্র মোদির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং। মোদি সরকার এখন খোলাখুলিভাবে তাইওয়ানের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখছে। সামরিক জোট QUAD শক্তিশালী করার দিকে আগাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও তার মোট নৌ শক্তির ৬০ শতাংশ এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরিয়ে নিচ্ছে। ভারত মহাসাগরে রয়েছে ইন্দো-মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়াগো গার্সিয়া।

ভারতের সাথে রাশিয়ার বহুদিনের সামরিক সম্পর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে এই সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রীয় মহলে আপত্তি থাকার কথা থাকলেও তা দেখা যাচ্ছে না। রাশিয়া থেকে এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র কেনায় যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বহুদিনের মিত্র তুরস্কের সাথে উত্তেজনা তৈরি হলেও ভারতীয় মহলের দাবি তারা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়ে রাশিয়ান ক্ষেপনাস্ত্র কিনছে। এটার প্রমাণ মিলে লাদাখে উত্তেজনার মধ্যে ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাশিয়া সফরে গিয়ে  এস-৪০০ দ্রুত ডেলিভারি দেওয়ার তাগাদা দেন। কিন্তু এই যুক্তরাষ্ট্রের কোন আপত্তি তো নেইই বরং বর্তমানে পেন্টাগন ভারতকে ৭২ হাজার সিগ সয়ার অ্যাসল্ট রাইফেল সরবরাহ করতে যাচ্ছে বলে ভারতীয় গণমাধ্যম খবর প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যেকোনভাবে যে কারো অস্ত্র দিয়ে ঘিরে ফেলতে চায় চীনকে।

চীনও হয়তো যুক্তরাষ্ট্রের চতুর্মুখী জাল টের পাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ‘দুই বৃহৎ অর্থনীতি (চীন-যুক্তরাষ্ট্র) সাথে সহাবস্থানের পক্ষে চীন’ বলে বিবৃতি দিয়েছে। তবে কভিড-১৯ পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি চালিত হবে ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। ফলে ভারত চীনের সরাসরি ‘অল ওয়ার’ যুদ্ধে জড়ানোর বাস্তবতা নেই। উভয় দেশ তাদের অর্থনীতিকে ধরে রাখতে চাইবে। কিন্তু বাণিজ্য যুদ্ধ ও মুখোমুখি সামরিক জোট ও মহড়া চলবে।

তবে এটা নিশ্চিত এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলায় বিকল্প হিসাবে ভারতকে তুলতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। আগামী দিনে চীনের মার্কিন ও জাপানী বিনিয়োগের পরবর্তী ‘নিরাপদ’ ঠিকানা হতে যাচ্ছে ভারত। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে মোকাবেলায় সোভিয়েতের মতো চীনা সাম্রাজ্য ভাঙার পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

তাইওয়ান, হংকং, তিব্বত, ঝিং ঝিয়াংয়ের উইঘুর মুসলিম নিয়ে পশ্চিমা গণমাধ্যমে আলোচনা ব্যাপকতা পাচ্ছে। ডেমোক্রেট শিবির থেকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট প্রার্থী জো বাইডেনও এসব ইস্যু নিয়ে তার নির্বাচনী প্রচারণা ওয়েবসাইটে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভারতে বিপুল বিনিয়োগের আগে চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে বিশ্বস্ত বন্ধু হিসাবে চায় যুক্তরাষ্ট্র।

তবে ভারত চীনের সাথে সম্পর্ক ভারসাম্য না করলে ভারতকে চাপে রাখতে লাদাখ ও অরুণাচল প্রদেশে চীন তার দাবিকে জোরালো করতে পারে। ভারত ও চীনের মধ্যে স্নায়ুযুদ্ধ ব্যাপকতা পেলে ব্রিকসের ভবিষ্যত হুমকিতে পড়বে। সেক্ষেত্রে রাশিয়া তার দুই সামরিক অস্ত্রের ক্রেতা চীন-ভারতের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চালাতে পারে।

কিন্তু ততদিনে নরেন্দ্র মোদি ভারতকে চীনের বাজার থেকে সরিয়ে মার্কিন ও জাপানি কোম্পানির বাজারে পরিণত করার প্রস্তুতি নিয়ে নিবেন। আর সামরিক জোট QUAD হয়ে উঠতে পারে একসময়ের সোভিয়েত বিরোধী CENTO, SEATO এর মতো চীনবিরোধী সামরিক জোট। সেক্ষেত্রে ভারতও চীনের বড় নিশানা হয়ে যেতে পারে। করোনা মহামারীর মধ্যে এত বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা ও সামরিক ঝনঝনানি এশিয়া কেন্দ্রিক পরবর্তী বিশ্বায়নের বার্তা দিচ্ছে। সূত্র- বনিক বার্তা।

আরও পড়ুন-

ফাহিমকে হত্যার পর পার্টি করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন হাসপিল

চীনকে চাপে রাখতে সাগরে ৪ দেশের নৌ মহড়া

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *