নাফতালি বেনেট নেতানিয়াহুর চেয়ে আরও ভয়ংকর

মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

পশ্চিম তীর, ফিলিস্তিন- ইসরাইলের দায়িত্ব নিচ্ছে নতুন সরকার। যার প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন নাফতালি বেনেট নামে পেছনের সারির এক রাজনীতিক। অনেকেই হয়তো মনে করছে, এর মাধ্যমে বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর ১২ বছরের ভয়াবহ বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। এবার হয়তো ফিলিস্তিনিদের ভাগ্যের কিছুটা উন্নতি হবে। কিন্তু না, তেমনটা হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই শূন্য। বরং পরিস্থিতি আরও নাজুক হতে পারে। আরও দখলদারি, হত্যা-নির্যাতনে বিষিয়ে উঠতে পারে ফিলিস্তিনিদের জীবন। অন্তত তেমনটাই মনে করছে খোদ ফিলিস্তিনিরাই।

নেতানিয়াহুর মতো উগ্র-জাতীয়তাবাদী নেতার স্থলে আরেক জাতীয়তাবাদীর আগমনে ফিলিস্তিন পরিস্থিতির খুব একটা পরিবর্তন হবে না বলেই মনে করছে তারা। তারা বলছেন, নেতানিয়াহুর সরকার ও নতুন সরকারের মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। ফিলিস্তিন ইস্যুতে নেতানিয়াহুর চেয়ে আরও ভয়ংকর নাফতালি বেনেট। পুরো পশ্চিম তীরকে ইসরাইলের সঙ্গে একীভূত করতে চান তিনি।

বিভিন্ন বিষয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতপার্থক্য থাকলেও দুজনই গত মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের জন্য হামাসকেই দায়ী বলে মনে করেন। ইসরাইলের চ্যানেল ১২-কে বেনেট বলেছেন, ‘সত্যিটা বলতেই হবে। ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের এই বিবাদ মোটেও জায়গা নিয়ে নয়। ফিলিস্তিনিরা এখানে আমাদের অস্তিত্বই স্বীকার করে না। আরও কিছুদিন এরকম পরিস্থিতি চলবে বলে মনে হয় আমার।’

উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনীতিক হিসাবে ইসরাইলে প্রায় এক যুগ ধরে বর্ণবাদী শাসন চালিয়েছেন ৭১ বছর বয়সী নেতানিয়াহু। ফিলিস্তিনিদের ওপর চালিয়েছেন নজিরবিহীন হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন-নিপীড়ন। সর্বশেষ গত মাসের গাজা আগ্রাসন তার জলজ্যান্ত প্রমাণ। মাত্র ১১ দিনে ৭০ শিশুসহ হত্যা করেছেন দুই শতাধিক নিরীহ-নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে।

ফিলিস্তিনিদের প্রতি বর্ণবাদী, জাতিবিদ্বেষী ও নোংরা মন্তব্যের জন্যও কুখ্যাত নেতানিয়াহু। কতটা বর্ণবাদী কয়েকটা উদাহরণেই স্পষ্ট হবে। এক. ‘ফিলিস্তিনিদের মোকাবিলার একটাই উপায়, আর তা হলো, তাদেরকে মার দেওয়া। একবার নয়, বারবার। তাদের এমনভাবে মারো যতক্ষণ সহ্য করতে পারে। দুই. ফিলিস্তিনিরা ইসরাইলের অস্তিত্বের প্রতি হুমকি। তিনি. ইসরাইল রাষ্ট্র তার সব নাগরিকের জন্য নয় (এ কথার মধ্য দিয়ে তিনি আসলে বলতে চেয়েছেন, ইসরাইল শুধু ইহুদিদের, ফিলিস্তিনিদের জন্য নয়)।

রাজনৈতিক ধ্যানধারণার দিক দিয়ে নেতানিয়াহুর মতোই উগ্র জাতীয়তাবাদী ৪৯ বছর বয়সী নাফতালি বেনেট। যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো থেকে ইসরাইলে আসা এক অভিবাসী বাবা-মার ঘরে জন্ম তার। ইসরাইলের হিব্রু ইউনিভার্সিটিতে আইন বিষয়ে পড়াশোনার শুরুর আগে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর এক এলিট বাহিনীতে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সেনাবাহিনী ছাড়ার পর ১৯৯৯ সালে একটি প্রযুক্তি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৫ সালে কোম্পানিটি বিক্রি করে দিয়ে রাজনীতিতে যোগ দেন তিনি। পরের বছরই নেতানিয়াহুর চিফ অব স্টাফ হন। নেতানিয়াহুর দল ছেড়ে ২০১০ সালে সেটেলারদের সংগঠন ইয়েশা কাউন্সিলে যোগ দেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি সেটেলারদের সহযোগিতায় কাজ করে সংগঠনটি।

২০১২ পুরোদমে রাজনীতি শুরু করেন। কট্টর ধর্মীয়-জাতীয়তাবাদী বক্তব্যের মধ্যদিয়ে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা পান উগ্রপন্থি ইয়ামিনা পার্টির এই নেতা।দৃষ্টিভঙ্গি ও আদর্শে নেতানিয়াহুর মতোই পুরোদস্তুর বর্ণবাদী বেনেট। ফিলিস্তিনিদের কোনো অধিকারই স্বীকারই করেন না। এমনকি প্রকাশ্যেই প্রত্যাখ্যান করেন ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান।

শুধু তাই নয়, তিনি ও তার দল নারী ও শিশুসহ সব ফিলিস্তিনিকেই শত্রু মনে করেন এবং তাদের যেকোনো পরিস্থিতি ‘হত্যা করা যায়’ বলেও মত তার। ফিলিস্তিনি কিম্বা আরবদের হত্যার কথা শুধু মুখেই বলেননি তিনি। তার রয়েছে গণহত্যা চালানোর বিতর্কিত অতীতও। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার আগে আগে ওই গণহত্যার জন্য ফের বিতর্কের মুখে পড়েছেন বেনেট।

ইসরাইলি সেনাবাহিনীর স্পেশাল ফোর্সের একজন কমান্ডো হিসাবে ১৯৯৬ সালে লেবানন যুদ্ধে একটি সেনাদলের নেতৃত্ব দেন তিনি। সশস্ত্র গোষ্ঠী হেজবুল্লার বিরুদ্ধে যুদ্ধকালে দক্ষিণ লেবাননের কানা গ্রামে গণহত্যা চালান, যা ইতিহাসে কানা গণহত্যা হিসাবে পরিচিত। এতে ১০৬ লেবানিজ বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়। জাতিসংঘের চার শান্তিরক্ষীসহ গুরুতর আহত হয় ১১৬ জন। জাতিসংঘ কম্পাউন্ডে আশ্রয় নিয়ে প্রাণে বাঁচে ৮ শতাধিক।

সেই হত্যাযজ্ঞের জন্য চলতি সপ্তাহে বেনেটের দিকেই অভিযোগের আঙুল তোলে ইসরাইলের একটি পত্রিকা ইয়েডিওথ আহরোনথ। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বেনেট। তিনি যে নিরীহ মানুষের ওপর সহিংস হামলা শত শত মানুষকে হত্যা করেছেন, সে ব্যাপারে তার অনুশোচনা নেই। বরং এ নিয়ে গর্ববোধ করেন তিনি। যেমন ২০১৩ সালে লেবানন গণহত্যার দিকে ইঙ্গিত করে এক বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনে বহু আরবকেই (ফিলিস্তিনিকে) হত্যা করেছি এবং এটা কোনো সমস্যা না।’

ফিলিস্তিনিদের এমনকি শিশুদেরকেও প্রায় ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন নাফতালি বেনেট। এমনকি ফিলিস্তিনি বন্দিদের কারাগারেই হত্যা করা উচিত বলে মনে করে তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘এরা শিশু নয়, তারা সন্ত্রাসী। এসব সন্ত্রাসীকে ছেড়ে না দিয়ে হত্যা করা উচিত।’

ইসরাইল-ফিলিস্তিন দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান একটা ঐতিহাসিক দাবি। ইসরাইলের প্রধান পুষ্ঠপোষক যুক্তরাষ্ট্রও এতদিন এর সমর্থন করে এসেছে। ১৯৬৭ সালে ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে ফিলিস্তিনসহ অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের একটা বড় অংশ দখল করে নেয় ইসরাইল। পরে আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলের সীমানা নির্ধারণ করা হয়। আর দখলিকৃত ভূখণ্ডে ইসরাইল রাষ্ট্রের জন্য নির্ধারিত ওই সীমানার বাইরের বাদবাকি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সমাধান প্রকল্পকেই দ্বি-রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান বলা হয়ে থাকে। তবে আজও তা আলোর মুখ দেখেনি।

ইসরাইলের সাম্প্রতিক গাজা আগ্রাসনের পর দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকেই সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তবে ইসরাইলের অনেক রাজনীতিকই এই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের বিরোধিতা করেন। সেই তালিকার সর্বশেষ সংশোজন নাফতালি নাফতালি বেনেট।

বেশ আগে থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন তিনি। ২০১৩ সালে ইয়েশি কাউন্সিলের এক সভায় তিনি বলেন, ‘ইসরাইলের মধ্যে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র গঠনের আইডিয়া শেষ হয়ে গেছে।’ দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানকে ‘অমূলক’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘এমন একটা অমূলক বিষয় নিয়ে এত শক্তি কোথাও খরচ হয়নি। আমাদের এই ধ্যানধারণা থেকে বের হয়ে আসা উচিত।’ ইসরাইলি রাজনীতিকের সমালোচনা করে বেনেট বলেন, ‘সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে, ইসরাইলের নেতারাই এটা স্পষ্ট করে বলতে চান না যে, ইসরাইল শুধু ইহুদিদেরই।’

বেনেট আরও বলেন, ‘সমস্যার সমাধান চাইলে একটাই সমাধান আছে, আর তা হচ্ছে একসঙ্গে বসবাস করা।’ ফিলিস্তিনে ইসরাইল দখলদারির জলজ্যান্ত বিষয়টিও অস্বীকার করেন বেনেট। তিনি বলেন, ‘কিসের দখলদারি, কেউ কি তার নিজের বাড়িতে-জমিতে দখলদার হতে পারে।’ তার অদ্ভুত যুক্তি, পশ্চিম তীরেও কোনো দখলদারি নেই। কারণ এখানে ফিলিস্তিন বলে কোনো রাষ্ট্র ছিল না।’ তার মতে, ‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত শেষ হওয়ার নয়, এটা চলবেই।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *