ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রে অগ্রগতির কথা স্বীকার করলেন মার্কিন জেনারেল

আমেরিকা মধ্যপ্রাচ্য লিড নিউজ

ক্ষেপণাস্ত্রে ইরানের বিরাট অগ্রগতির কথা স্বীকার করলেন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টকম’র প্রধান জেনারেল কেনেথ ম্যাকেঞ্জি। তিনি বলেছেন, ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত নিখুঁতভাবে হামলা চালাতে পারে তার প্রমাণ হচ্ছে ইরাকের মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আইন আল-আসাদ ঘাঁটিতে ইরানি সেনাদের হামলা। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, ইরান খুব দ্রুত পরমাণু অস্ত্রের মালিকানা অর্জন করতে যাচ্ছে।

লন্ডনের টাইম ম্যাগাজিনকে বুধবার জেনারেল ম্যাকেঞ্জি বলেন, গত তিন থেকে পাঁচ বছরে ইরান সক্ষম ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। গত বছর জানুয়ারি মাসে ইরানের ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি মার্কিন ঘাঁটিতে ওই হামলা চালায়। আইআরজিসি’র কুদস ফোর্সের সাবেক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে ইরান মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক বহুদিন ধরেই তিক্ত। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রধান মিত্র ইসরাইলের হুমকির মধ্যেই বিভিন্ন পাল্লার শত শত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে ইরান। সম্প্রতি মাটির নিচের একটি ‘ক্ষেপণাস্ত্র শহর’ সারা বিশ্বের সামনে উন্মোচন করেছে তারা। ওই শহরের অবস্থান স্পষ্ট না করলেও সেখানে হাজারো শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র মজুতের বিষয়টি এখন সবার জানা। ইরানের এই পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির নতুন সংঘাতের আশঙ্কা সৃষ্টি করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শহরের একটি ভিডিও চিত্র অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। তাতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড করপোরেশনের (আইআরসিজি) ভূগর্ভস্থ ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। ভিডিওতে ক্ষেপণাস্ত্র শহরে ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সমারোহ দেখা যায়।

ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধে ২০১৫ সালে ছয় বিশ্বশক্তির সঙ্গে একটি মাইলফলক চুক্তি সই হয়। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায়। কারণ হিসেবে তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, ওই চুক্তিতে ফাঁক রয়ে গেছে। সেখানে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন বন্ধের কোনো কথা নেই।

এরপরই ট্রাম্প ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা তার অন্যতম প্রধান লক্ষ্যে পরিণত করেন। এ জন্য নতুন অবরোধসহ যুক্তরাষ্ট্রের অব্যাহত কূটনৈতিক চাপে ইরান বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। তবে ট্রাম্পের ওই চাপে ইরান তাদের দৃঢ়তা দেখায়। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র দেশটি নতুন নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের জানান দিয়ে বুঝিয়ে দেয় তারা যুক্তরাষ্ট্রের চোখরাঙানি উপেক্ষা করতে জানে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের তিক্ত সম্পর্কের মধ্যেই ঘটে যায় দুটি বড় ঘটনা। গত বছরের ৩ জানুয়ারি ইরাকের বাগদাদ বিমানবন্দরের বাইরে হামলা চালিয়ে ইরানের প্রভাবশালী সামরিক কমান্ডার জেনারেল কাশেম সোলাইমানিকে হত্যা করে যুক্তরাষ্ট্র। ইরানি সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীকে হত্যার পর ফুঁসে ওঠে ইরানসহ পশ্চিমাবিরোধী দেশগুলো।

এরপর দেশের অন্যতম শীর্ষ পরমাণুবিজ্ঞানী মোহসেন ফাখরিজাদেহকে হত্যার ঘটনাও ঘটে। এ ঘটনায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলে দেশটি। প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকিও দেয়। ইরানের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর আঘাতের বিপরীতে ইরান তাদের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে।

ইরানের সামরিক বাহিনী বলেছে, তাদের এই স্থাপনা ইলেকট্রনিক যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাদের সুরক্ষা দেবে। মার্চের শুরুতেই ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেকার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়। ইরানের মদদপুষ্ট মিলিশিয়া গ্রুপ দাবি করে, তারা ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে প্রতিরক্ষা কোষ সক্রিয় করেছে। মিডল ইস্ট মিডিয়া রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী ইরানের প্রতিরক্ষা সেল যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যেও সক্রিয় হয়েছে।

ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, ইরানের বিশেষ বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডসের উপসাগরীয় অঞ্চলে ভূগর্ভে যে ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি উদ্বোধন করেছে, তার সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিশ্চিত করা হয়নি।

রেভল্যুশনারি গার্ডসের প্রধান মেজর জেনারেল হোসেইন সালামি বলেন, নৌবাহিনীর কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণের ঘাঁটিগুলোর মধ্যে এটি একটি। সেখানে রাখা ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শত শত কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম এবং এর ধ্বংসক্ষমতা অনেক বেশি। শত্রুপক্ষের অত্যাধুনিক যুদ্ধসরঞ্জামকে এড়িয়ে আঘাত হানতে পারে এটি।

গত বছরই রেভল্যুশনারি গার্ডসের পক্ষ থেকে তাদের এই ঘাঁটির তথ্য সামনে আনা হয়। তখনই বলা হয়, ইরান উপসাগরীয় উপকূল বরাবর ভূগর্ভে এটি গড়ে তোলা হয়েছে। এ ঘাঁটি নিয়ে ইরানের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটি শত্রুদের জন্য ‘দুঃস্বপ্ন’।

রাষ্ট্রীয় টিভিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে ক্ষেপণাস্ত্র শহরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, সিমেন্টের দেয়ালসহ একটি ডিপোতে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সাজানো রয়েছে। এ ছাড়া রাডার, মনিটরিং, সিমুলেশন এবং অত্যাধুনিক নানা যুদ্ধাস্ত্র সেখানে রয়েছে।

গার্ডস কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেইন সালামির ভাষ্য, ‘আমরা আজ যা দেখছি, তা বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর দুর্দান্ত এবং বিস্তৃত ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতার ক্ষুদ্র একটি অংশ।’নিরাপত্তা বিশ্লেষক থিওডোর কারাসিক আরব নিউজকে বলেছেন, ইরান কীভাবে তার ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি শক্তিশালী করে তুলেছে এবং ক্ষেপণাস্ত্রের নতুন বৈকল্পিক পরীক্ষা ও নির্মাণও করছে, তা এ শহর দেখিয়ে দিয়েছে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।