রেহানা মরিয়ম নূর: আজ ও আগামীর আলো

বাংলাদেশ সাহিত্য

শাহনেওয়াজ আরেফিন

রেহানা নামের সাথে কোনো গভীর যোগ বোধহয় আছে আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সা’দের। সে রেহানাকে ছাড়বে না, আমাদেরকেও ছাড়তে দেবে না! যদিও নির্মাণের দিক থেকে ‘লাইভ ফ্রম ঢাকা’ এবং ‘রেহানা মরিয়ম নূর’ – দুইটা দুই দিগন্তের …

সিনেমার ডক্টর রেহানা মরিয়ম নূর অত্যন্ত জাজমেন্টাল। তিনি কাজপাগল, প্রাক্টিসিং মুসলিম, প্রবলভাবে নিজেকে শুদ্ধতার প্রতীক ব’লে জ্ঞান করেন। এবং তিনি প্রবলভাবে পানিশমেন্টে বিশ্বাসী। কেবল দেখতে মানুষের বাচ্চা মানুষ ব’লেই তিনি কাউকে ছেড়ে দিতে রাজি নন। যেখানে ভিকটিম বিচার চাইবে কি চাইবে না এই দোলাচলে– সেখানে চলে তার বিপ্লব ঘটানোর প্রস্তুতি। সাইকো হলেও তার আচরণ পুরাই আদর্শবাদী কিসিমের। এমনকি সে যে কথায় কথায় রিয়্যাক্ট করে তার কারণটাও খুব গভীর এবং ইন্টারেস্টিং।

সাইকো কিছিমের মানুষ থাকে বাহ্যত ভাষাহীন; যদি না কেউ তাকে পড়ে নেয় অথবা তার নিজেকে প্রকাশের কোনো শৈল্পিক ধরন থাকে। আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সাদ নিশ্চয়ই এমন কাউকে প’ড়ে ফেলেছিলেন।

রেহানা কোনো ধরনের ভুল, কোনো ধরনের মিথ্যা টলারেট করতে পারেনা। এমনকি স্রোতের বিপরীতে গিয়ে পরিণতির তোয়াক্কা না ক’রে নিজ শিক্ষার্থীর গালে চড় বসিয়ে দেয়। আর হ্যা, সাইকোদের আঘাত কিন্তু জায়গামতই পড়ে!

ভুল অবশ্য রেহানাও করে। আদর্শিক মানুষ মাত্রই ইমোশনাল। বোঝাপড়া যতই ভালো হোক, সে ভুল করবেই করবে। মিস নাই। রেহানা যখন দেখে হাজার চেষ্টা সত্ত্বেও তার সদিচ্ছা, তার প্রচেষ্টা হালে পানি পাচ্ছে না বরং মিথ্যাটাই জয়ী হয়ে যাচ্ছে তখন সে নিজে মিথ্যার আশ্রয় নেয়। সেকচুয়াল হ্যারাসমেন্টের শিকার তার স্টুডেন্ট যখন সবকিছু প্রায় মেনেই নিচ্ছিল তখন সে নিজেকেই ভিকটিম হিসেবে দাবি করে।

আপাতদৃষ্টিতে তাকে কারো মিথ্যাশ্রয়ী মনে হলেও এই চরিত্রের সৃষ্টিকর্তা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ সা’দ আপনাকে দেখাতে চাচ্ছেন রেহানার মতো সো-কল্ড সাইকোরা আসলে মিথ্যা বলে না। বরং ভিকটিমের সাথে একাত্ম হয়ে সত্যিটাই তুলে ধরে, এমনকি খোদ ভিক্টিম সেটাকে স্বীকৃতি না দিলেও! একটা ভুলে ভরা আনএথিকাল সিস্টেমে বিদ্রোহী হলেও সেই-ই সেটাকে সবচেয়ে বেশি ঔন করে।

আমাদের আশেপাশের সাইকোরা যে অস্বাভাবিক আচরণ করে এবং তা যে সিস্টেমের কোনো না কোনো গলদ থেকে করে- সা’দ সেদিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে চান। সমাজের কাছে যেটা খামাখা, অস্বাভাবিক, না করলেই বরং ভালো- তা যে কতটা দরকারি, কতটা গভীর সম্পর্কের জাল থেকে উঠে আসা তিনি সেটা দেখিয়েছেন!

রেহানার বিরুদ্ধে সমাজের কম্প্রোমাইজড চরিত্রগুলোর অভিযোগ- তার ইগো অনেক বেশি এবং যা কিছু মেনে নিলে একটা সিস্টেম কোনোমতে হলেও চলতে পারে তা সে মেনে নেবে না। সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি হলো সে সাইকো ব’লেই কিছু ব্যাপার সাধারণভাবে মেনে নিতে পারছে না, কিন্তু গল্পকার সা’দ বলতে চাচ্ছেন ‘সিস্টেমটা স্বাভাবিক না জন্যই’ রেহানারা সাইকো হয়ে যাচ্ছে। এখানে তার ব্যক্তিগত জীবন প্রতিক্রিয়ার মুখ্য শর্ত হয়ে দাঁড়াচ্ছে না। এবং বলাই বাহুল্য, তার গল্প বলার ধরণ এতটাই অসাধারণ যে তার নির্মাণ এমন অসামান্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।

অবশ্য বিশেষ ঘরানার ঘৃণাজীবী ফেমিনিস্ট হলে ‘নামাজী রেহানার’ ভেতর কেউ নারীজাগরণ দেখবে না এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমরা দেখেছি রেহানা কি এবং নূর কাকে বলে। হ্যা প্র্যাক্টিজিং মুসলিম হয়েও কেন সে তার মেয়ে ইমুর ইচ্ছামতো খেলাধুলার স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, আবার কেনই বা শেষমেশ স্কুলপারফর্মিংয়ে বাগড়া দিয়ে ব’সে – এটা কারো গবেষণার খোরাক হতে পারে। বাট মাইন্ড ইট, রেহানাকে বাতিল করা যাবে না। রেহানাই আগামী, রেহানাই বর্তমান।

রেহানা মরিয়ম নূর হারে না, তার ছোট্ট মেয়ে ইমুকেও হারতে দেয় না। এভাবেই সে নূর, জ্যোতি বা একটা প্রদীপ হয়ে ওঠে।

মুভির অন্যতম চরিত্র এ্যানির আনএথিক্যাল অ্যাডভান্টেজের আনএথিক্যাল অ্যাডভান্টেজ নেন ডক্টর আরেফিন। গল্পের জটিলতা এখান থেকেই। এবং খুব সম্ভবত আপনিও একমত হবেন যে এ্যানির ভুলের জন্য ডক্টর আরেফিনের পাপ লঘু হয়ে যায় না। এবং রেহানার চোখে যে দোষী তাকেই আপনার চোখে দোষী মনে হবে। এথিক্সের চোখ অভিন্নই হয়।

সৃষ্টিশীল কাজ মাত্রই স্ববিরোধী। মুভিতে ধোঁয়াশা রাখা আছে আবার যথেষ্ট ইঙ্গিতও রাখা আছে। আমার দৃষ্টিতে ধোঁয়াশা রাখার উদ্দেশ্য অভিযুক্তের পাল্টা অভিযোগগুলোকে মোকাবিলা করা। যেমন ডক্টর আরেফিন রেহানাকে বলেন- “ভুল সবাই করে, তুমি করো নাই?”

এই তুমিটা সোসাইটির যে কেউ হতে পারে। প্রশ্নটা সবার উদ্দেশ্যেই। এবং সে মুহূর্তে রেহানার মুখটাও উহ্য রাখেন পরিচালক।

সিনেমার প্রতিটা দৃশ্যই অত্যন্ত ভাষামুখর। বিশেষ ক’রে শেষ দৃশ্যটা তো ভয়ঙ্কর সুন্দর। আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে। সেটা এতটাই প্রশ্নবোধক এবং উত্তরমুখর যে তার মুখ আপনার নিজে থেকে দেখে নেয়া চাই।

শাহনেওয়াজ আরেফিন, লেকক ও সাহিত্য সমালোচক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।